মুসাফির হবো কি, নাশিদে নবীর নামে দুরুদ পাঠ করা কি ওয়াজিব? দুয়ায়ে মাছুরাতে ঠোট নাড়াতে হবে কি?
Salah-Prayer · Hanafi
Question
২.নামাযে সিজদা দেয়ার সময় হাতের আঙ্গুলগুলোর সব অংশ যদি জমিনে না লাগে তাহলে কি নামায হবে
৩.নাশিদ বা বয়ান শোনার সময় রসুলল্লাহ স. এর নাম শুনলে যতবার শুনবো ততবারই কি দরূদ পড়তে হবে?
৪.মাসনূন দুয়া গুলো কি মনে মনে পড়লে হবে নাকি মুখে উচ্চারণ করতে হবে?
Answer
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম
প্রশ্ন ১:
আমার মা ও বোন কক্সবাজারে থাকে। আমি সেখানে গেলে মুসাফির নাকি মুকিম হব? আর আমার আব্বুর (পিতা) ক্ষেত্রে বিধান কী?
উত্তর:
আপনার স্থায়ী বা মূল বসবাসস্থল যদি কক্সবাজার না হয়, তাহলে আপনি সেখানে মুসাফির হিসেবে গণ্য হবেন, যদি সফরের দূরত্ব (প্রায় ৭৮ কিমি বা ৪৮ মাইল) হয় এবং আপনি ১৫ দিনের কম থাকার ইচ্ছা করেন। ১৫ দিন বা তার বেশি থাকার ইচ্ছা করলে আপনি মুকিম (মুসাফির নন) হবেন।
আপনার আব্বু (পিতা) যদি আপনার মায়ের সাথে কক্সবাজারে স্থায়ীভাবে থাকেন, তাহলে তিনি সেখানে মুকিম। আর যদি তিনিও আপনাদের মতো অন্য জায়গা থেকে যান এবং সেখানে ১৫ দিনের কম থাকবেন, তাহলে তিনি মুসাফির।
হানাফি কিতাবের দলিল:
- ফাতাওয়া আলমগীরী (১/১৩৯): “مَنْ سَافَرَ مِنْ بَلَدِهِ قَاصِدًا مَكَانًا عَلَى مَسَافَةِ ثَلَاثَةِ أَيَّامٍ وَثَلَاثِ لَيَالٍ... فَهُوَ مُسَافِرٌ...” (যে ব্যক্তি নিজ শহর থেকে তিন দিন তিন রাতের দূরত্বের স্থানে সফর করে... সে মুসাফির।)
- রদ্দুল মুহতার (২/১২২): إِذَا أَقَامَ فِي مَكَانٍ خَمْسَةَ عَشَرَ يَوْمًا... فَهُوَ مُقِيمٌ (যদি কোনো স্থানে ১৫ দিন ইকামতের নিয়ত করে... সে মুকিম।)
সারসংক্ষেপ:
- আপনার মা ও বোন সেখানে স্থায়ী থাকলে তারা মুকিম।
- আপনি এবং আপনার আব্বু (যদি তিনি স্থায়ী না হন) মুসাফির হবেন, যদি ১৫ দিনের কম থাকেন এবং দূরত্ব শর্ত পূর্ণ হয়।
প্রশ্ন ২:
নামাজে সিজদা দেয়ার সময় হাতের আঙ্গুলগুলোর সব অংশ যদি জমিনে না লাগে, তাহলে কি নামাজ হবে?
উত্তর:
হ্যাঁ, নামাজ হবে। হানাফি মতে সিজদায় কপাল জমিনে লাগানো ফরজ, আর হাত রাখা সুন্নাত। আঙ্গুলের সব অংশ না লাগলেও কোনো সমস্যা নেই। তবে হাতের তালু ও আঙ্গুলগুলো মিলিতভাবে জমিনে রাখা সুন্নাত। যদি কোনো কারণে আঙ্গুলের কিছু অংশ না লাগে, তবুও সিজদা আদায় হবে।
হানাফি কিতাবের দলিল:
- আল-হিদায়া (১/২২২): “وَفَرْضُ السَّجْدَةِ... وَضْعُ الْجَبْهَةِ عَلَى الْأَرْضِ... وَأَمَّا الْيَدَانِ فَسُنَّةٌ” (সিজদার ফরজ হলো... কপাল জমিনে রাখা... আর হাত দুটো সুন্নাত।)
- রদ্দুল মুহতার (২/৩০২): “لَوْ وَضَعَ بَعْضَ أَصَابِعِهِ جَازَ... كَمَا فِي الْبَزَّازِيَّةِ” (যদি আঙ্গুলের কিছু অংশ রাখে, তবুও জায়েজ... যেমন বাজ্জাজিয়ায় আছে।)
সারসংক্ষেপ:
- সিজদার ফরজ কপাল জমিনে লাগানো। হাতের আঙ্গুলের সব অংশ না লাগলেও নামাজ সহিহ। তবে সুন্নাত অনুযায়ী পূর্ণাঙ্গভাবে রাখা উত্তম।
প্রশ্ন ৩:
নাশিদ বা বয়ান শোনার সময় রসুলুল্লাহ (সা.)-এর নাম শুনলে যতবার শুনব, ততবারই কি দরূদ পড়তে হবে?
উত্তর:
হাদিসে এসেছে, রাসুল (সা.)-এর নাম উচ্চারিত হলে দরূদ পাঠ করা মুস্তাহাব। তবে একই মজলিসে বারবার নাম এলে একবার দরূদ পড়লেও আদায় হয়। কিন্তু অধিক সওয়াবের জন্য প্রতিবার পড়া উত্তম। বিশেষ করে নাশিদ বা বয়ানে যদি ধারাবাহিকভাবে নাম আসে, তাহলে প্রথমবার পড়া এবং বাকি বার মনে মনে নিয়ত করে দেওয়া যায়। তবে কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।
হানাফি কিতাবের দলিল:
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (১/২১৮): “نبی پاک صلی اللہ علیہ وسلم کا نام مبارک سن کر درود پڑھنا سنت ہے... ایک مجلس میں بار بار سننے پر ہر بار پڑھنا افضل ہے...”
- মুসলিম শরিফ (হাদিস নং ৩৮৪): “رَغِمَ أَنْفُ رَجُلٍ ذُكِرْتُ عِنْدَهُ فَلَمْ يُصَلِّ عَلَيَّ” (ধ্বংস হোক সেই ব্যক্তি, যার কাছে আমার নাম উল্লেখ করা হলো, অথচ সে আমার ওপর দরূদ পড়ল না।)
সারসংক্ষেপ:
- যতবার নাম শুনবেন, প্রতিবার দরূদ পড়া মুস্তাহাব। কিন্তু একবার পড়লে ও কাজ হয়ে যায়। উত্তম হলো প্রতিবার পড়া।
প্রশ্ন ৪:
মাসনূন দু‘আগুলো কি মনে মনে পড়লে হবে, নাকি মুখে উচ্চারণ করতে হবে?
উত্তর:
মাসনূন দু‘আ মুখে উচ্চারণ করা জরুরি। শুধু মনে মনে পড়লে তা কুরআন তিলাওয়াত বা যিকিরের মতো গণ্য হবে না। তবে উচ্চারণ এতটুকু হতে হবে যে নিজে শুনতে পান। অন্যের শোনার প্রয়োজন নেই।
হানাফি কিতাবের দলিল:
- বেহেশতি জেওর (২/২২৪): “দু‘আ পড়বেন এমনভাবে যে নিজের কানে শোনা যায়... জিহবা না নড়ালে দু‘আ হবে না।”
- উসুলুশ শাশী (পৃ. ৯২): “الذِّكْرُ بِاللِّسَانِ شَرْطٌ...” (যিকিরের জন্য জিহবা দ্বারা উচ্চারণ শর্ত।)
সারসংক্ষেপ:
- দু‘আ মুখে উচ্চারণ করা জরুরি, অন্তত নিজের কানে শোনার মতো। শুধু মনে মনে পড়লে তা আদায় হবে না।