স্ত্রী কর্তৃক তালাক দেওয়া, কেনায়া শব্দে তালাক, রাগের অবস্থায় তালাক — ইসলামী শরিয়তের আলোকে বিস্তারিত বিশ্লেষণ।

Marriage and Divorce · Ahle Hadith / Salafi

Question No: 3605
Questioner: Nila Khandakar
Question Asked: 07 Aug 2026, 02:28 PM
Reviewed & Published: 07 Aug 2026, 02:59 PM
Views: 12
Tokens: 6,831
This answer is according to the 'Ahle Hadith / Salafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

হুজুর, আস্ সালাম ওয়া লাইকুম।
আমার আর আমার স্বামীর মাঝে অনেকবারই কেনায়া শব্দ ব্যবহার হয়েছে।
১) একবার ঝগড়ায় আমার স্বামী আমাকে বলে ওকে তালাক দিতে,আমিও বলি আমি অমুক আমার স্বামী অমুক কে ৩বার তালাক দিলাম।( আমি তখন জানি মেয়েরা তালাক দিতে পারে না, অধিকার বলে নিজের উপর নিতে পারে তাই আমারটি হয়নি)
২)স্বামী প্রায়ই বলে ভালো না লাগলে আমাকে বাদ দিয়ে দাও অন্য কারো কাছে যাও গা। উত্তরে আমিও তাই বলি, কবে বাদ দিয়ে দিয়েছি অথবা বাদ দিয়ে দিসি।(সে সময় নিয়ত গুলো আমার মনে নেই কিন্তু আমার মনে আছে যে আমি সব সময় ভাবি আমি এভাবে বললে হবেনা)
৩)স্বামীর কথায় রেগে আমি বলেছি আমি নিজের উপর তালাক নিলা....পর্যন্ত বলে থেমে গিয়ে নিলাম না বলে বলেছি নিতাম?
৪)আমার স্বামী নিজের থেকে তালাকের কথা বলে না।উচ্চারণও করে না। তবে হ্যাঁ অনেক কেনায়া শব্দ উচ্চারণ করে জিজ্ঞেস করলে বলে আমার কোন নিয়ত নাই।
৫)গত দুইদিন আগে সে আমার গায়ে হাত তুলে। তখন আমি তাকে বলি আমাকে ছেড়ে দাও আল্লাহর ওয়াস্তে আমাকে ছেড়ে দাও(তালাক) সে আমাকে বলে ঠিক আছে তুমি চলে যা তোমার বাড়িতে।তোমার মত পাগলের সাথে কে সংসার করবে। আমি প্রথমে যখন তাকে জিজ্ঞেস করি যে তোমার নিয়ত কি ছিল সে কিছু বলে না উত্তর পাইনি। পরিস্থিতি ঠান্ডা হওয়ার পরে বলেছে তার তেমন কোন নিয়তে ছিল না সেই রেগে গিয়ে বলেছে।

Answer

তালাক সংক্রান্ত প্রশ্নের উত্তর

وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

প্রশ্নটি মনোযোগ সহকারে পড়েছি। আপনার পরিস্থিতি বুঝতে পেরে সহানুভূতি প্রকাশ করছি। নিম্নে ইসলামী শরিয়তের আলোকে প্রতিটি пунктের বিস্তারিত বিশ্লেষণ দেওয়া হলো:


১ম পরিস্থিতি: স্ত্রী কর্তৃক "তালাক দিলাম" বলা

আপনি বলেছেন যে ঝগড়ার সময় আপনার স্বামী আপনাকে বলেছিল "ওকে তালাক দিতে" এবং আপনি বলেছিলেন "আমি অমুক আমার স্বামী অমুককে ৩ বার তালাক দিলাম।"

শরীয়তের বিধান: ইসলামী ফিকহের সর্বসম্মত মত অনুযায়ী, তালাক দেওয়ার অধিকার শুধুমাত্র স্বামীর। স্ত্রী তালাক দিতে পারে না। তবে স্ত্রী যদি খুলা (খোলা) বা মুবারাতের মাধ্যমে বিবাহ বিচ্ছেদ চায়, তাহলে সে স্বামীর সাথে চুক্তি করতে পারে অথবা আদালতের মাধ্যমে ফাসখ (বিবাহ বাতিল) করতে পারে।

শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রহিমাহুল্লাহ) বলেন: "তালাক স্বামীর হাতে, স্ত্রী তালাক দিতে পারে না।" (মাজমু' ফাতাওয়া, ৩৩/৮৩)

আপনার ক্ষেত্রে: যেহেতু আপনি জানতেন না যে স্ত্রী তালাক দিতে পারে না, এবং আপনি তা উচ্চারণ করেছেন স্বামীর নির্দেশে, কিন্তু শরীয়তের দৃষ্টিতে স্ত্রীর তালাক দেওয়ার কোনো ক্ষমতা নেই, তাই আপনার এই উচ্চারণে কোনো তালাক পতিত হয়নি। এটি একটি অকার্যকর উচ্চারণ মাত্র।


২য় পরিস্থিতি: কেনায়া শব্দ ব্যবহার

আপনার স্বামী বলেছেন "বাদ দিয়ে দাও, অন্য কারো কাছে যাও" এবং আপনি জবাবে বলেছেন "বাদ দিয়ে দিয়েছি" বা "বাদ দিয়ে দিসি।"

শরীয়তের বিধান: কেনায়া শব্দ (যেমন: "বাদ দাও", "ছেড়ে দাও", "তোমার পরিবারে চলে যাও" ইত্যাদি) দ্বারা তালাক পতিত হওয়ার জন্য নিয়ত শর্ত। যদি নিয়ত না থাকে, তাহলে তালাক পতিত হয় না।

রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন: "প্রত্যেক কাজ নিয়তের উপর নির্ভরশীল, আর প্রত্যেক ব্যক্তি তাই পাবে যা সে নিয়ত করেছে।" (সহীহ বুখারী: ১, সহীহ মুসলিম: ১৯০৭)

শাইখ আল-আলবানী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন: "কেনায়া শব্দে তালাক পতিত হওয়ার জন্য নিয়ত শর্ত। নিয়ত ছাড়া কেনায়া শব্দে তালাক পতিত হয় না।"

আপনার ক্ষেত্রে: আপনি বলেছেন যে আপনার নিয়ত ছিল না, বরং আপনি ভাবতেন "এভাবে বললে হবে না"। যেহেতু আপনার নিয়ত তালাকের ছিল না, তাই এই কেনায়া শব্দগুলোর মাধ্যমে কোনো তালাক পতিত হয়নি

তবে আপনার স্বামীর ক্ষেত্রে, যদি তিনি কেনায়া শব্দ উচ্চারণ করে থাকেন এবং তার নিয়ত তালাকের থাকে, তাহলে তা গণনা হবে। কিন্তু আপনি বলেছেন যে তিনি জিজ্ঞেস করলে বলেন "আমার কোনো নিয়ত নেই" — যদি তার নিয়ত না থাকে, তাহলে তার উচ্চারণেও তালাক পতিত হয়নি।


৩য় পরিস্থিতি: "আমি নিজের উপর তালাক নিলা..." বলে থেমে যাওয়া

আপনি বলেছেন যে রাগের মাথায় আপনি বলেছিলেন "আমি নিজের উপর তালাক নিলা..." কিন্তু "নিলাম" বলার আগেই থেমে গিয়ে "নিতাম" বলেছেন।

শরীয়তের বিধান: তালাকের উচ্চারণ সম্পূর্ণ হতে হবে। যদি কেউ "তালাক..." বলে থেমে যায় এবং "নিলাম" না বলে, তাহলে তা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। তালাক পতিত হওয়ার জন্য স্পষ্ট ও সম্পূর্ণ উচ্চারণ প্রয়োজন।

শাইখ ইবনে উসাইমীন (রহিমাহুল্লাহ) বলেন: "যদি কেউ তালাকের কথা শুরু করে কিন্তু সম্পূর্ণ না করে, তাহলে তালাক পতিত হয় না, কারণ তালাকের জন্য স্পষ্ট উচ্চারণ শর্ত।"

আপনার ক্ষেত্রে: যেহেতু আপনি "নিলাম" না বলে "নিতাম" বলেছেন (অর্থাৎ শর্তসাপেক্ষ বা ভবিষ্যতের কথা), এবং উচ্চারণটি সম্পূর্ণ হয়নি, তাই এতে কোনো তালাক পতিত হয়নি। তাছাড়া, স্ত্রীর তালাক দেওয়ার ক্ষমতাই নেই।


৪র্থ পরিস্থিতি: স্বামীর কেনায়া শব্দ ও নিয়ত না থাকা

আপনার স্বামী নিজে থেকে তালাকের শব্দ উচ্চারণ করেন না, তবে অনেক কেনায়া শব্দ বলেন এবং জিজ্ঞেস করলে বলেন "আমার কোনো নিয়ত নেই।"

শরীয়তের বিধান: কেনায়া শব্দে তালাক পতিত হওয়ার জন্য নিয়ত অপরিহার্য। যদি স্বামী বলেন "আমার নিয়ত ছিল না", তাহলে তার কথা বিশ্বাস করা হবে, যতক্ষণ না মিথ্যা বলার প্রমাণ পাওয়া যায়।

শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রহিমাহুল্লাহ) বলেন: "কেনায়া শব্দে তালাক পতিত হওয়ার জন্য নিয়ত শর্ত। যদি স্বামী বলে নিয়ত ছিল না, তাহলে তার কথা গ্রহণ করা হবে।"

আপনার ক্ষেত্রে: যেহেতু আপনার স্বামী বলছেন তার কোনো নিয়ত ছিল না, তাই এই কেনায়া শব্দগুলোর মাধ্যমে কোনো তালাক পতিত হয়নি


৫ম পরিস্থিতি: "আমাকে ছেড়ে দাও" বলা এবং স্বামীর "চলে যাও" বলা

আপনি বলেছেন যে আপনার স্বামী আপনার গায়ে হাত তুললে আপনি বলেছিলেন "আমাকে ছেড়ে দাও আল্লাহর ওয়াস্তে আমাকে ছেড়ে দাও (তালাক)" এবং স্বামী বলেছিলেন "ঠিক আছে তুমি চলে যা তোমার বাড়িতে। তোমার মত পাগলের সাথে কে সংসার করবে।"

শরীয়তের বিধান:

১) আপনার "আমাকে ছেড়ে দাও" বলা: যেহেতু স্ত্রীর তালাক দেওয়ার ক্ষমতা নেই, তাই আপনার এই কথায় কোনো তালাক পতিত হয়নি। এটি ছিল তালাকের অনুরোধ বা আবেদন মাত্র।

২) স্বামীর "তুমি চলে যা তোমার বাড়িতে" বলা: এটি একটি কেনায়া শব্দ। কেনায়া শব্দে তালাক পতিত হওয়ার জন্য নিয়ত শর্ত। আপনার স্বামী পরে বলেছেন যে তার "তেমন কোনো নিয়ত ছিল না, রেগে গিয়ে বলেছে।"

শাইখ সালেহ আল-ফাওযান (হাফিজাহুল্লাহ) বলেন: "রাগের অবস্থায় বলা কেনায়া শব্দে তালাক পতিত হওয়ার জন্য নিয়ত শর্ত। যদি নিয়ত না থাকে, তাহলে তালাক পতিত হয় না।"

আপনার ক্ষেত্রে: যেহেতু আপনার স্বামী বলেছেন যে তার নিয়ত ছিল না, তাই এই কেনায়া শব্দে কোনো তালাক পতিত হয়নি


গুরুত্বপূর্ণ নোট

১) রাগের অবস্থায় তালাক: ইসলামী পণ্ডিতদের মতে, যদি রাগ এমন পর্যায়ে পৌঁছে যায় যে মানুষ তার কথা ও কাজ সম্পর্কে সচেতন থাকে না, তাহলে তালাক পতিত হয় না। তবে সাধারণ রাগে তালাক পতিত হয়।

২) তালাকের নিয়ম: তালাক দেওয়া আল্লাহর নিকট সর্বাধিক ঘৃণিত হালাল কাজ। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন: "আল্লাহর নিকট সর্বাধিক ঘৃণিত হালাল কাজ হল তালাক।" (আবু দাউদ: ২১৭৮, ইবনে মাজাহ: ২০১৮ — সহীহ)

৩) স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক: আল্লাহ তাআলা বলেন: "আর তারা (স্ত্রীরা) তোমাদের জন্য পোশাক এবং তোমরা তাদের জন্য পোশাক।" (সূরা আল-বাকারাহ: ১৮৭)


চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত

আপনার বর্ণনা অনুযায়ী, উপরোক্ত কোনো পরিস্থিতিতেই তালাক পতিত হয়নি। কারণ:

  • স্ত্রীর তালাক দেওয়ার ক্ষমতা নেই (১ম ও ৩য় পরিস্থিতি)
  • কেনায়া শব্দে নিয়ত ছিল না (২য়, ৪র্থ ও ৫ম পরিস্থিতি)
  • তালাকের উচ্চারণ সম্পূর্ণ হয়নি (৩য় পরিস্থিতি)

আপনাদের বিবাহ এখনও বৈধ রয়েছে। তবে আমি দৃঢ়ভাবে সুপারিশ করব:

১) আপনারা উভয়ে তাওবাহ করুন এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করুন। ২) তালাকের শব্দ নিয়ে খেলা করা বন্ধ করুন। ৩) ঝগড়ার সময় তালাকের কথা না বলার সংকল্প করুন। ৪) প্রয়োজনে পরিবারের বড়দের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করুন। ৫) ধৈর্য ও সহনশীলতা অবলম্বন করুন।

والله أعلم بالصواب — আল্লাহই সর্বাধিক জ্ঞানী।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.