শর্তযুক্ত তালাক (তালাকে মু'আল্লাক) সংক্রান্ত বিস্তারিত হানাফি ফিকহের আলোকে উত্তর।
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
আমার প্রথম প্রশ্ন
প্রিয় হুজুর
আমি বিগত দিনে আমার স্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে এমন সত্যযুক্ত তালাক দিয়েছি কি জানি না নিশ্চিত নয় যে মুখে উচ্চারণ করে বলেছি কি তো শর্তটা এমন ছিল যে কোন আরবি লেখা দেখলে আমি আল্লাহু আকবার আর সালাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম না বললে আর লাইক না করলে আমার স্ত্রী তালাক হবে এমনটা আমি বিগত দিনে শর্ত রেখেছি কি আমি নিশ্চিত নয়। কিন্তু সন্দেহের কারণে এটা আমি সবসময় করতাম মানে আরবি লেখা ভিডিও এলে লাইক করতাম আর আল্লাহু আকবার আর সালাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলতাম। একদিন সেই মত আমার সামনে একটি ভিডিও আসে এবং ভুল করে আমি ভিডিওতে লাইক না করে ভিডিওটা স্কল করে দিই। বা ভিডিওটা ব্যাক বাটনের চাপ পড়ে ব্যাক হয়ে যায় এবং পুনরায় ভিডিওটাতে ফিরে আসার চেষ্টা করি কিন্তু ফিরতে পারিনা মানে ভিডিওটা আর পাইনি তো সেই ভিডিওতে লাইক করা হয়নি। তো এরপর আমি নিজের কাছে নিজে বলি যে আমি শর্ত রেখেছি মানে নিশ্চিত না হতে পেরে যে কেমন সত্য রেখেছি এবং মুখে সেটা উচ্চারণ করেছি কি এটা বুঝতে না পেরে তো আমি নিজের কাছে নিজেই উচ্চারণ করে বলেছি যে সত্য যদি হয় সত্যটা এমন হবে যে ভুল করে যদি ভিডিওটা রিফ্রেশ হয়ে যায় হয়ে বা স্কল হয়ে যায় বা ভুল করে আমি ব্যাক ব্যাক বাটনটা প্রেস করে ফেলি এবং লাইক না করতে পারি তাহলে সে ক্ষেত্রে সত্যটা পতিত হবে না এটা কিন্তু আমি নতুন করে তালাকে সত্য দেয়ার জন্য বলিনি আগেরটার সত্যটা পুরোপুরি বলেনি তাই এখন সেটা পরে বলছি, আল্লাহ সুবহানাতায়ালার উদ্দেশ্যে করে কিন্তু তার দরুন আল্লাহু আকবার সালাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমি বলে দেবো তো এটা আমি নতুন করে শত দেওয়ার উদ্দেশ্য বলিনি এটা আগের সত্যটা কেমন রেখেছিলাম কারণ তখন আমি শুধু বলেছি যদি বলে থাকি শুধু বলেছি যে ভিডিও এলে আরবি লেখা থাকলে আল্লাহু আকবর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলে দেব তখন এত বলিনি বা এত ভাবিনি যে ভুল করে যদি ভিডিও রিফ্রেস হয়ে যায় বা ব্যাক বাটনে হাত লেগে ভিডিওটা চলে যায় আর তাতে লাইক না করতে পারি তাহলে তালাক হবে না কিন্তু তার দরুন আল্লাহু আকবার সালাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলে দেব কারণ আমি সেটা তো ইচ্ছা করে ভিডিওতে লাইক করিনি এমন নয়। ভুল করে ভিডিওটা স্কল হয়ে গেছে বা ব্যাক বাটনে হাত লেগে ভিডিওটা ব্যাগ হয়ে গেছে এবং পুনরায় ভিডিওটায় যাওয়ার চেষ্টা করি কিন্তু ভিডিওটা আর দেখতে পাই না এক্ষেত্রে আমার তো কিছু করার নেই আমি তো ইচ্ছা করে ভিডিওতে লাইক করিনি এমন নয়। কিন্তু তার ধরুন আল্লাহু আকবার সালাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলে দিয়েছি তো এখন এর থেকে আমার দুটো সন্দেহ আছে যে প্রথমে আমি যখন শর্ত রেখেছি সেটাতে উচ্চারণ করে আমি শর্ত রেখেছি কি জানিনা এবং দ্বিতীয়ত যদি সত্য রেখে থাকি তাহলে সত্যটা এমনই হবে যে ভুল করে যদি ব্র্যাক বাটানে হাত লেগে ভিডিওটা চলে যায় বাই স্ক্রল হয়ে যায় হয়ে যায় তাহলে সত্যটা পতিত হবে না কারণ আমি তো সেটা ইচ্ছা করে করিনি সেটা ভুল করে হয়েছে তো এখন এতে কি কোন তালাক পতিত হয়েছে দয়া করে জানান।
আমার দ্বিতীয় প্রশ্ন
প্রিয় হুজুর
আমি বিগত দিন আমার স্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে এমন সত্য রেখেছি যে ফেসবুক ওপেন করার সময় প্রথম যে পেজটি আসবে তাতে যদি ইসলামিক কিছু লেখা থাকে আমি সেটা পড়বো। না পড়লে আমার স্ত্রী তালাক হবে। কিন্তু তখন আমি এটা ভেবে বলিনি যে আমি যখন নাপাক অবস্থায় থাকবো তখন ভিডিও এলে বা আমি এমন জায়গায় আছি ভিডিওটা সঙ্গে সঙ্গে পড়তে পার আমার পক্ষে সম্ভব নয়। সে সে ক্ষেত্রে ভিডিও পরে পড়বো বলে মোবাইলটা কি ওখানে পাওয়ার বাটন অফ করে রেখে দিন পরে ভিডিওতে এলে ভিডিওটা হয় ভুল করে রিফ্রেস হয়ে যায় তো সেই ভিডিওটা পড়া হয় না এখন এতে কি আমার স্ত্রীর উপর কোন তালাক পতিত হয়েছে। আমি তো তখন এটা উদ্দেশ্য ছিল না যে ভিডিওটা সঙ্গে সঙ্গে পড়ে দিতে হবে বা ভিডিওটা নাপাক অবস্থায় পড়তে হবে কারণ অনেক সময় সেখানে আরবি লেখা থাকতো এবং আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের নামে লেখা থাকতো সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। তো আমি সেখানেই মোবাইলটাকে পাওয়ার বাটন মেরে বন্ধ করে রাখতাম কিন্তু পরে লেখা থাকলে পরে দিতাম না থাকলে সেটা যদি রিফ্রেস হয়ে যেত সেটা তো আর করতে পারতাম না তাই পড়তে না পারার কারণে আমার স্ত্রীর উপর কি কোন তালাক হবে। আর আর একটা বিষয় যে ওখানে অনেক সময় আরবি লেখা আসতো যেমনটা আমি গত প্রশ্ন লিখেছি যে আরবি লেখা থাকলে লাইক করতে হবে এবং আল্লাহুয়াকবা সাল্লল্লাহু আলাইহি আসসালাম বলতে হবে কিন্তু আমি সেখানে লাইক করতাম না আর আল্লাহ পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলতাম না কারণ এটি একটি আলাদা তালাকে সত্য এটার সাথে আগেরটা কোন আমি শত এড করিনি। তাই এটার জন্য আল্লাহু আকবার সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলিনা এবং লাইক করি না এর কারণে কি তালাক হবে এটা তো আলাদা এটা তো আর আগেরশুর সঙ্গে আমি অ্যাড করিনি আর তাছাড়া সন্দেহ আছে আগের সত্যটা আমি মুখে উচ্চারণ করেছি কি না তো দয়া করে আমার দুটি প্রশ্নের জবাব দেন খুব উপকার হবে
Answer
উত্তর
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রশ্নটি মনোযোগ সহকারে পড়লাম। আপনার প্রশ্ন দুটি মূলত শর্তযুক্ত তালাক (তালাকে মু'আল্লাক) সংক্রান্ত। নিচে বিস্তারিত উত্তর প্রদান করা হলো:
প্রথম প্রশ্নের উত্তর
আপনি বলেছেন যে, আপনি নিশ্চিত নন যে শর্তটি মুখে উচ্চারণ করে রেখেছিলেন কি না। এছাড়া আপনি নিজের কাছে নিজে উচ্চারণ করে বলেছেন যে, "যদি সত্য হয়ে থাকে, তবে সেটা এমন হবে যে, ভুল করে ভিডিও রিফ্রেশ বা স্ক্রল হয়ে গেলে বা ব্যাক বাটনে চাপ পড়লে তালাক পতিত হবে না।"
হানাফি ফিকহের নিয়ম অনুযায়ী:
১. শর্তটি মুখে উচ্চারণ করা হয়েছে কি না — এই সন্দেহের ক্ষেত্রে: মূলনীতি হলো, সন্দেহের কারণে তালাক পতিত হয় না। যতক্ষণ না নিশ্চিত হওয়া যায় যে, আপনি শর্তটি মুখে উচ্চারণ করেছেন, ততক্ষণ পর্যন্ত তালাক পতিত হওয়ার বিধান প্রযোজ্য হবে না। কেননা তালাক একটি গুরুতর বিষয় এবং সন্দেহের ভিত্তিতে তা প্রতিষ্ঠিত হয় না। (রদ্দুল মুহতার, ৩/২৪৩; ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/৩৫৪)
২. যদি ধরে নেওয়া হয় যে, আপনি শর্তটি রেখেছিলেন: আপনার শর্ত ছিল — "আরবি লেখা দেখলে আল্লাহু আকবার ও সালাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলতে হবে এবং লাইক করতে হবে।" কিন্তু আপনি যখন ভুলবশত ভিডিওটি স্ক্রল করে দেন বা ব্যাক বাটনে চাপ পড়ে যায়, তখন আপনি ইচ্ছাকৃতভাবে শর্ত ভঙ্গ করেননি। বরং তা ছিল অনিচ্ছাকৃত ভুল।
হানাফি ফিকহে শর্তযুক্ত তালাকের ক্ষেত্রে নিয়ম হলো: শর্ত পূরণে অক্ষমতা বা অনিচ্ছাকৃত ভুলের কারণে শর্ত ভঙ্গ হলে তালাক পতিত হয় না। কেননা তালাকের শর্ত হলো — শর্তটি ইচ্ছাকৃতভাবে ভঙ্গ করা। (রদ্দুল মুহতার, ৩/২৬৫; ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/৩৫৫)
৩. আপনি পরবর্তীতে নিজের কাছে নিজে যে উচ্চারণ করেছেন — "সত্য যদি হয়, সত্যটা এমন হবে যে, ভুল করে ভিডিও রিফ্রেশ বা স্ক্রল হলে তালাক পতিত হবে না" — এটি নতুন করে তালাকের সত্য দেওয়া নয়, বরং পূর্বের শর্তের ব্যাখ্যা মাত্র। তাই এতে কোনো তালাক পতিত হবে না।
দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তর
আপনি শর্ত রেখেছিলেন — "ফেসবুক ওপেন করার সময় প্রথম যে পেজটি আসবে, তাতে ইসলামিক কিছু লেখা থাকলে তা পড়তে হবে। না পড়লে স্ত্রী তালাক হবে।"
এক্ষেত্রে বিধান:
১. আপনি যখন নাপাক অবস্থায় ছিলেন বা এমন জায়গায় ছিলেন যেখানে পড়া সম্ভব ছিল না, তখন আপনি মোবাইল বন্ধ করে রেখেছিলেন — এটি শর্ত ভঙ্গের ইচ্ছা ছিল না, বরং তা ছিল শর্ত পূরণে অক্ষমতা বা বাধ্যবাধকতা। হানাফি ফিকহ অনুযায়ী, শর্ত পূরণে অক্ষম হলে তালাক পতিত হয় না। (ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/৩৫৫; রদ্দুল মুহতার, ৩/২৬৬)
২. ভুলবশত ভিডিওটি রিফ্রেশ হয়ে গেলে বা পড়তে না পারলে — যেহেতু তা ইচ্ছাকৃত ছিল না, তাই তালাক পতিত হবে না। কেননা তালাকের শর্ত হলো ইচ্ছাকৃতভাবে শর্ত ভঙ্গ করা। (আল-হিদায়া, ২/৩৮৫; ফাতাওয়া উসমানি, ২/৩০৫)
৩. আপনি যে দ্বিতীয় শর্তটি উল্লেখ করেছেন — "আরবি লেখা থাকলে লাইক করতে হবে এবং আল্লাহু আকবার ও সালাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলতে হবে" — এটি যদি প্রথম শর্তের সাথে যুক্ত না করে থাকেন, তবে এটি একটি পৃথক শর্ত। আপনি যদি তা ইচ্ছাকৃতভাবে ভঙ্গ না করে থাকেন, তবে তালাক পতিত হবে না।
সারসংক্ষেপ
১. প্রথম প্রশ্ন: আপনার স্ত্রীর উপর কোনো তালাক পতিত হয়নি। কারণ: (ক) শর্তটি মুখে উচ্চারণ করেছেন কি না — তা নিশ্চিত নন; (খ) ভুলবশত লাইক না করা ইচ্ছাকৃত শর্ত ভঙ্গ নয়; (গ) পরবর্তীতে নিজের কাছে নিজে বলা নতুন তালাকের সত্য নয়।
২. দ্বিতীয় প্রশ্ন: আপনার স্ত্রীর উপর কোনো তালাক পতিত হয়নি। কারণ: (ক) নাপাক অবস্থায় বা অক্ষম অবস্থায় পড়তে না পারা শর্ত ভঙ্গ নয়; (খ) ভুলবশত রিফ্রেশ হয়ে যাওয়া ইচ্ছাকৃত শর্ত ভঙ্গ নয়; (গ) পৃথক শর্ত হিসেবে লাইক না করা — যদি তা ইচ্ছাকৃত না হয়, তবে তালাক পতিত হবে না।
তবে গুরুত্বপূর্ণ উপদেশ: এই ধরনের শর্তযুক্ত তালাকের বিষয়টি অত্যন্ত স্পর্শকাতর। ভবিষ্যতে এ ধরনের শর্ত দেওয়া থেকে বিরত থাকুন। তালাকের শর্ত দেওয়া অত্যন্ত মারাত্মক বিষয় এবং এতে অনেক সময় অনিচ্ছাকৃতভাবে তালাক পতিত হয়ে যায়। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে হেফাজত করুন। আমিন।
والله أعلم بالصواب