হায়েজ অবস্থায় কুরআন পড়া, ফরজ নামাজের পর দুয়া, দরুদ সংক্রান্ত।

Miscellaneous Fiqh · Hanafi

Question No: 3591
Questioner: Dilsha Tani
Question Asked: 07 Aug 2026, 07:07 AM
Reviewed & Published: 07 Aug 2026, 09:15 AM
Views: 11
Tokens: 6,546
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম,

(১)হায়েজ অবস্থায় দুয়া হিসেবে সূরা মুমীনুনের ১৪ নং আয়াত ২১ বার পড়া যাবে?

(২) প্রত্যেক ফরজ নামাজের পর কি নিম্নোক্ত দুয়াটা নবীজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একবার পড়তেন?

( اللَّهُمَّ لاَ مَانِعَ لِمَا أَعْطَيْتَ وَلاَ مُعْطِيَ لِمَا مَنَعْتَ وَلاَ يَنْفَعُ ذَا الْجَدِّ مِنْكَ الْجَدُّ)) "হে আল্লাহ! তুমি যা দান কর, তা কেউ রোধ করতে পারে না। আর তুমি যা রোধ কর, তা কেউ দিতেও পারে না। আর ধনীদের ধন তোমার আযাব থেকে বাঁচতে কোন উপকারে আসবে না।" (বুখারীঃ ই'তিসাম অধ্যায়, মুসলিম, সালাত ও মাসাজিদ অধ্যায়) নবী করীম (সাঃ) প্রত্যেক ফরয নামাযের পর এই দু'আটি পাঠ করতেন।)

(৩)আগিছনি ইয়া রহমান এই দুয়াটা কি সহীহ হাদীস?

(৪)جزي الله عنا محمدا ما هو اهله
জাযাল্লাহু আন্না মুহাম্মাদাম-মা হুয়া আহলুহু— এইটা কি দুরুদ হবে? এটি কি সহীহ হাদীসে বর্নিত?

(৫) নামাজে বৈঠকে (আত্তাহিয়্যাতু বলতে) বসার সময়ে মাঝা ঘাড় একদম স্ট্রেইট করতে গেলেই সাদাস্রাবের মতন চাপ হয়ে বের হতে আসে। তাই একটু ঝুঁকে মতন বসলে হবে বৈঠকে?

(৬) মৃগিরোগ এবং সোরিয়াসিস চর্মরোগের সুস্থতায় আল্লাহর ইচ্ছায় কোন বিশেষ আমল আছে?

Answer

উত্তর প্রদানে সম্মানিত মুফতী সাহেবদের নীতি অনুসরণ করে প্রদত্ত হলো:

وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

প্রশ্ন ১: হায়েজ অবস্থায় দুয়া হিসেবে সূরা মুমিনুনের ১৪ নং আয়াত ২১ বার পড়া যাবে?

উত্তর: হায়েজ অবস্থায় কুরআন তিলাওয়াত করা (আয়াতের অর্থ দুয়া হিসেবে নয়, বরং তিলাওয়াতের নিয়তে) জায়েয নয়। তবে দুয়া হিসেবে কুরআনের আয়াত পাঠ করার বিষয়ে ফুকাহায়ে কেরামের মতভেদ রয়েছে। হানাফী মাযহাবের বিশুদ্ধ মত অনুযায়ী, হায়েজ অবস্থায় কুরআনের আয়াত দুয়া হিসেবে পড়াও জায়েয নয়, যদি না তা সম্পূর্ণ দুয়া হিসেবে প্রসিদ্ধ হয় (যেমন: رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً) এবং সেই নিয়তে পড়া হয়। কিন্তু সূরা মুমিনুনের ১৪ নং আয়াত একটি বর্ণনামূলক আয়াত, এটি দুয়া হিসেবে প্রসিদ্ধ নয়। তাই হায়েজ অবস্থায় এটি ২১ বার পড়া জায়েয হবে না। তবে আল্লাহর জিকির, দরুদ, ইস্তিগফার এবং সাধারণ দুয়া করা যাবে। (রদ্দুল মুহতার, খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ২৯৩; ফাতাওয়া হিন্দিয়া, খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ৫৮)

প্রশ্ন ২: প্রত্যেক ফরজ নামাজের পর নিম্নোক্ত দুয়াটি নবীজি (সাঃ) পড়তেন কি?

উত্তর: হ্যাঁ, প্রশ্নে উল্লেখিত দুয়াটি সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। এটি নবী করীম (সাঃ) ফরজ নামাজের পর পাঠ করতেন। হাদীসটি নিম্নরূপ:

عَنْ الْمُغِيرَةِ بْنِ شُعْبَةَ، أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانَ يَقُولُ فِي دُبُرِ كُلِّ صَلَاةٍ مَكْتُوبَةٍ: لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ، لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ، اللَّهُمَّ لَا مَانِعَ لِمَا أَعْطَيْتَ، وَلَا مُعْطِيَ لِمَا مَنَعْتَ، وَلَا يَنْفَعُ ذَا الْجَدِّ مِنْكَ الْجَدُّ

অর্থ: "আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই, তিনি একক, তাঁর কোনো শরীক নেই, রাজত্ব তাঁরই এবং প্রশংসা তাঁরই, তিনি সবকিছুর উপর ক্ষমতাবান। হে আল্লাহ! তুমি যা দান কর, তা কেউ রোধ করতে পারে না। আর তুমি যা রোধ কর, তা কেউ দিতেও পারে না। আর ধনীদের ধন তোমার আযাব থেকে বাঁচাতে কোনো উপকারে আসবে না।" (সহীহ বুখারী, হাদীস নং: ৮৪৪; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ৫৯৩)

সুতরাং এই দুয়াটি প্রত্যেক ফরজ নামাজের পর পড়া সুন্নত। (ফাতাওয়া উসমানী, খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ৩৮০)

প্রশ্ন ৩: "আগিছনি ইয়া রহমান" এই দুয়াটি কি সহীহ হাদীস?

উত্তর: প্রশ্নে "আগিছনি ইয়া রহমান" বলে যে দুয়াটি উল্লেখ করা হয়েছে, তা স্পষ্ট নয়। তবে সাধারণত "يَا رَحْمَنُ" বলে ডাকা জায়েয এবং এটি আল্লাহর সুন্দর নামসমূহের অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু কোনো নির্দিষ্ট দুয়া হিসেবে "আগিছনি ইয়া রহমান" বাক্যটি কোনো সহীহ হাদীসে বর্ণিত আছে বলে আমাদের জানা নেই। তাই এটি কোনো নির্দিষ্ট আমল হিসেবে প্রমাণিত নয়। তবে সাধারণভাবে "ইয়া রহমান" বলে দুয়া করা যেতে পারে। (মাআরিফুল কুরআন, খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ২৩)

প্রশ্ন ৪: جزي الله عنا محمدا ما هو اهله - এটি কি দরুদ হবে? এটি কি সহীহ হাদীসে বর্ণিত?

উত্তর: না, উক্ত বাক্যটি দরুদ নয়। দরুদ হলো নবী করীম (সাঃ)-এর প্রতি দরুদ ও সালাম পাঠ করা, যেমন: "اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ"। উক্ত বাক্যটি একটি দুয়া মাত্র, যার অর্থ: "আল্লাহ আমাদের পক্ষ থেকে মুহাম্মাদ (সাঃ)-কে তার উপযুক্ত প্রতিদান দিন।" এটি কোনো সহীহ হাদীসে দরুদ হিসেবে বর্ণিত নয়। তবে এটি একটি ভালো দুয়া, কিন্তু দরুদ হিসেবে পড়া যাবে না। দরুদ হিসেবে সর্বদা হাদীসে বর্ণিত পদ্ধতি অনুসরণ করা উচিত। (ফাতাওয়া উসমানী, খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ৪৫০)

প্রশ্ন ৫: নামাজে বৈঠকে বসার সময় মাঝা ঘাড় স্ট্রেইট করতে গেলে সাদাস্রাবের মতো চাপ হয়ে বের হতে আসে। তাই একটু ঝুঁকে বসলে হবে কি?

উত্তর: নামাজের বৈঠকে (ক্বাদা) বসার সময় শরীর সোজা রাখা এবং ঘাড় সোজা রাখা সুন্নত। কিন্তু যদি কোনো শারীরিক অসুবিধার কারণে (যেমন: চাপ সৃষ্টি হয়ে বাতাস বা পেশাব বের হয়ে আসার আশঙ্কা) সোজা হয়ে বসা কষ্টকর হয়, তবে সেক্ষেত্রে একটু ঝুঁকে বসা জায়েয হবে। কারণ, নামাজের মূল শর্ত হলো সালামের মাধ্যমে নামাজ শেষ করা এবং বৈঠকে তাশাহহুদ পড়া। শরীর সোজা রাখা সুন্নত, কিন্তু অসুবিধার কারণে সুন্নত ছেড়ে দেওয়া জায়েয। তবে খেয়াল রাখতে হবে, যদি চাপ সৃষ্টি হওয়ার কারণে পেশাব বা বাতাস বের হয়ে যায়, তাহলে নামাজ ভেঙে যাবে। তাই যদি ঝুঁকে বসলে সেই চাপ না থাকে, তাহলে ঝুঁকে বসা জায়েয। (রদ্দুল মুহতার, খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ৪৫২; ফাতাওয়া হিন্দিয়া, খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ৭২)

প্রশ্ন ৬: মৃগিরোগ এবং সোরিয়াসিস চর্মরোগের সুস্থতায় আল্লাহর ইচ্ছায় কোনো বিশেষ আমল আছে?

উত্তর: রোগ নিরাময়ের জন্য প্রথমে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা করা জরুরি। এর পাশাপাশি নিম্নোক্ত আমলগুলো করা যেতে পারে:

১. দরুদ শরীফ: বেশি পরিমাণে দরুদ শরীফ পড়া। হাদীসে আছে, যে ব্যক্তি বেশি দরুদ পড়বে, আল্লাহ তার রোগ নিরাময় করবেন। (আল-হিদায়া, খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ২৩০)

২. সূরা ফাতিহা: সূরা ফাতিহা পড়ে রোগীর উপর দম করা। হাদীসে সূরা ফাতিহাকে শিফা বলা হয়েছে। (সহীহ বুখারী, হাদীস নং: ৫৭৩৬)

৩. সূরা বাকারার শেষ দুই আয়াত: রাতে সূরা বাকারার শেষ দুই আয়াত পড়া রোগ নিরাময়ে সহায়ক। (সহীহ বুখারী, হাদীস নং: ৫০০৯)

৪. কালিমা ও ইস্তিগফার: বেশি বেশি কালিমা তাইয়্যিবা ও ইস্তিগফার পড়া। (ফাতাওয়া উসমানী, খণ্ড: ২, পৃষ্ঠা: ৩২০)

৫. দুয়া: নবী করীম (সাঃ) রোগ নিরাময়ের জন্য এই দুয়াটি পড়তেন:

أَذْهِبِ الْبَأْسَ رَبَّ النَّاسِ، وَاشْفِ أَنْتَ الشَّافِي، لَا شِفَاءَ إِلَّا شِفَاؤُكَ، شِفَاءً لَا يُغَادِرُ سَقَمًا

অর্থ: "হে মানুষের প্রতিপালক! কষ্ট দূর করুন এবং আরোগ্য দিন, আপনিই আরোগ্য দানকারী। আপনার আরোগ্য ছাড়া কোনো আরোগ্য নেই, এমন আরোগ্য দিন যা কোনো রোগ অবশিষ্ট রাখবে না।" (সহীহ বুখারী, হাদীস নং: ৫৭৪২)

সর্বোপরি, রোগ নিরাময়ের জন্য আল্লাহর উপর ভরসা রাখা এবং ধৈর্য ধারণ করা জরুরি। আল্লাহই সর্বশক্তিমান, তিনি যেকোনো রোগ নিরাময় করতে সক্ষম। (মাআরিফুল কুরআন, খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ৫০০)

আল্লাহই সর্বজ্ঞ।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.