মেয়েদের স্বপ্নদোষ ও সাদা স্রাবের মধ্যে পার্থক্য, গোসল ফরজ হওয়ার শর্ত।

Taharah Purity · Hanafi

Question No: 3546
Questioner: Mariam
Question Asked: 05 Aug 2026, 10:49 PM
Reviewed & Published: 05 Aug 2026, 11:05 PM
Views: 14
Tokens: 4,677
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারকাতুহ

আমি মেয়েদের স্বপ্নদোষ সম্পর্কে জানতে চাই

আমি যখন ঘুমাই তখন কি স্বপ্ন দেখি তার কিছুই মনে থাকে না তবে ভয়ঙ্কর স্বপ্ন হলে মনে থাকে। যখন ঘুম থেকে উঠি তখন প্রায়ই আমার গোপনাঙ্গে স্রাবের মতো কিছু থাকে। এটা দিনের বেলা ঘুমালেও হয় তো এটা সাদাস্রাব না কি স্বপ্নদোষ তা কিভাবে বোঝা যাবে? নাকি গোপনাঙ্গ ভেজা থাকলে তা স্বপ্ন দোষ বলেই গণ্য হবে?

স্বপ্ন দোষ আর সাদা স্রাব এর মধ্যে পার্থক্য কী?

Answer

উত্তর: وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম

প্রিয় প্রশ্নকারিণী, আপনার প্রশ্নের জন্য ধন্যবাদ। মেয়েদের স্বপ্নদোষ (ইহতিলাম) এবং সাদা স্রাব (রুতুবাতুল ফরজ) সম্পর্কে ইসলামি বিধান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিচে বিস্তারিতভাবে উত্তর দেওয়া হলো:


১. স্বপ্নদোষ (ইহতিলাম) কী?

স্বপ্নদোষ হলো ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন দেখে বীর্য (মনি) নির্গত হওয়া। এটি পুরুষ ও নারী উভয়েরই হতে পারে। নারীদের ক্ষেত্রে স্বপ্নদোষের মাধ্যমে যে তরল নির্গত হয়, তা বীর্য হিসেবে গণ্য হয়।

কুরআন ও হাদিসের আলোকে:

  • আল্লাহ তাআলা বলেন: "আর যে ব্যক্তি স্বপ্নদোষের কারণে অপবিত্র হয়..." (সূরা আন-নিসা: ৪৩)।
  • রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর যুগে নারীরা স্বপ্নদোষ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন: "যদি সে (নারী) পানি (বীর্য) দেখতে পায়, তবে সে গোসল করবে।" (সহিহ বুখারি: ২৮২; সহিহ মুসলিম: ৩১৩)।

২. সাদা স্রাব (রুতুবাতুল ফরজ) কী?

সাদা স্রাব হলো নারীদের যোনি থেকে নির্গত সাধারণ আর্দ্রতা বা সাদা তরল, যা স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়ার অংশ। এটি পবিত্র এবং এর কারণে গোসল ফরজ হয় না, শুধু অজু নষ্ট হয়।

হানাফি ফিকহের মত:

  • ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, নারীদের যোনি থেকে নির্গত সাধারণ স্রাব (রুতুবাতুল ফরজ) পবিত্র। এটি নাপাক নয়, তবে অজু নষ্ট করে। (বাদায়েউস সানায়ি: ১/৪৩; রদ্দুল মুহতার: ১/৩০৯)।

৩. স্বপ্নদোষ এবং সাদা স্রাবের মধ্যে পার্থক্য কীভাবে বুঝবেন?

নিম্নলিখিত বিষয়গুলো লক্ষ্য করুন:

| বিষয় | স্বপ্নদোষ (ইহতিলাম) | সাদা স্রাব (রুতুবাতুল ফরজ) | |------------|------------------------|-------------------------------| | ঘটনার সময় | সাধারণত ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন দেখে হয় | দিনে বা রাতে যেকোনো সময় হতে পারে | | স্বপ্নের সম্পর্ক | সাধারণত উত্তেজনাপূর্ণ বা ভয়ঙ্কর স্বপ্ন দেখে হয় | স্বপ্নের সাথে সম্পর্ক নেই | | তরলের প্রকৃতি | ঘন, আঠালো, সাদাটে বা হলদেটে | পাতলা, সাদা বা স্বচ্ছ | | শারীরিক অনুভূতি | ঘুম থেকে উঠার পর শরীরে আলস্য বা ক্লান্তি অনুভূত হয় | সাধারণত এমন অনুভূতি হয় না | | গন্ধ | বীর্যের মতো বিশেষ গন্ধ থাকে | সাধারণত গন্ধহীন বা হালকা গন্ধ |

গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম:

  • যদি ঘুম থেকে উঠে দেখেন যে, আপনার গোপনাঙ্গ ভেজা এবং সেই ভেজা অবস্থা স্বপ্নদোষের কারণে হয়েছে বলে নিশ্চিত হন (যেমন: উত্তেজনাপূর্ণ স্বপ্ন দেখেছেন বা বীর্যের গন্ধ/প্রকৃতি আছে), তবে তা স্বপ্নদোষ হিসেবে গণ্য হবে এবং গোসল ফরজ হবে।
  • যদি নিশ্চিত না হন যে, এটি স্বপ্নদোষ নাকি সাধারণ স্রাব, তবে মূলনীতি হলো: যা সন্দেহজনক, তা পবিত্র হিসেবে গণ্য হবে। অর্থাৎ, সাধারণ স্রাব হিসেবে ধরবেন এবং শুধু অজু করবেন, গোসল ফরজ হবে না।

হানাফি ফিকহের মূলনীতি:

  • ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) বলেন: "যতক্ষণ না নিশ্চিত হওয়া যায় যে, নির্গত তরল বীর্য, ততক্ষণ তা বীর্য হিসেবে গণ্য হবে না।" (রদ্দুল মুহতার: ১/৩৪৫)।
  • ফাতাওয়া হিন্দিয়ায় বলা হয়েছে: "যদি নারী ঘুম থেকে উঠে ভেজা অবস্থা পায়, কিন্তু মনে না থাকে যে স্বপ্নদোষ হয়েছে, তবে তার উপর গোসল ওয়াজিব নয়।" (ফাতাওয়া হিন্দিয়া: ১/১৪)।

৪. দিনের বেলা ঘুমালে স্বপ্নদোষ হলে কী হবে?

দিনের বেলা ঘুমালেও যদি স্বপ্নদোষ হয় এবং বীর্য নির্গত হয়, তবে তা স্বপ্নদোষ হিসেবে গণ্য হবে এবং গোসল ফরজ হবে। ঘুমের সময় দিন বা রাত হওয়ার কারণে বিধানের কোনো পার্থক্য নেই।


৫. গোপনাঙ্গ ভেজা থাকলেই কি স্বপ্নদোষ গণ্য হবে?

না, গোপনাঙ্গ ভেজা থাকলেই স্বপ্নদোষ গণ্য হবে না। কারণ:

  • সাধারণ স্রাবের কারণেও গোপনাঙ্গ ভেজা থাকতে পারে।
  • স্বপ্নদোষ প্রমাণের জন্য বীর্য নির্গত হওয়ার নিশ্চিততা প্রয়োজন।
  • যদি নিশ্চিত না হন, তবে তা সাধারণ স্রাব হিসেবে গণ্য হবে এবং গোসল ফরজ হবে না।

হাদিসের আলোকে:

  • উম্মে সালামা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: "উম্মে সালামা (রা.)-এর কাছে এক নারী এসে বললেন, আমি ঘুমের মধ্যে ভেজা অবস্থা পাই। তিনি বললেন, তুমি কি পানি (বীর্য) দেখতে পাও? তিনি বললেন, না। তখন তিনি বললেন, তবে গোসল করতে হবে না।" (সুনানে আবু দাউদ: ২৩৬)।

৬. স্বপ্নদোষের পর করণীয়:

যদি নিশ্চিত হন যে স্বপ্নদোষ হয়েছে, তবে:

  1. গোসল ফরজ হবে।
  2. গোসলের পর নামাজ, কুরআন স্পর্শ ইত্যাদি বৈধ হবে।
  3. যদি গোসলের আগে নামাজ পড়ে ফেলেন, তবে তা আদায় হবে না এবং পুনরায় পড়তে হবে।

৭. সাদা স্রাবের পর করণীয়:

যদি সাধারণ স্রাব হয়, তবে:

  1. অজু নষ্ট হবে।
  2. শুধু অজু করলেই হবে, গোসল ফরজ নয়।
  3. কাপড়ে যদি স্রাব লাগে, তবে তা পবিত্র, তবে নামাজের জন্য কাপড় পবিত্র থাকা শর্ত। স্রাবের পরিমাণ যদি এক দিরহামের বেশি হয়, তবে ধুয়ে ফেলা উত্তম।

৮. অতিরিক্ত সতর্কতা:

  • ঘুম থেকে উঠে যদি সন্দেহ হয়, তবে ইস্তিঞ্জা (পবিত্রতা অর্জন) করে অজু করুন এবং নামাজ পড়ুন।
  • যদি নিয়মিত এমন সমস্যা হয়, তবে ইস্তিহাজা (অবিরত স্রাব) এর বিধান প্রযোজ্য হতে পারে। সেক্ষেত্রে প্রত্যেক নামাজের সময় অজু করে নামাজ পড়বেন।

৯. মানসিক প্রশান্তির জন্য দোয়া:

  • ঘুমানোর আগে আয়াতুল কুরসি এবং সূরা ইখলাস, ফালাক, নাস পড়ে ঘুমান।
  • ভয়ঙ্কর স্বপ্ন দেখলে ঘুম থেকে উঠে বাম দিকে থুথু ফেলে এবং আউযুবিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজিম পড়ুন। (সহিহ মুসলিম: ২২৬৩)।

উপসংহার:

  • স্বপ্নদোষ এবং সাদা স্রাবের মধ্যে মূল পার্থক্য হলো: স্বপ্নদোষের মাধ্যমে বীর্য নির্গত হয় (যা গোসল ফরজ করে), আর সাদা স্রাব সাধারণ আর্দ্রতা (যা শুধু অজু নষ্ট করে)।
  • গোপনাঙ্গ ভেজা থাকলেই স্বপ্নদোষ গণ্য হবে না; বীর্য নির্গত হওয়ার নিশ্চিততা প্রয়োজন।
  • সন্দেহের ক্ষেত্রে মূলনীতি হলো: পবিত্রতা গণ্য করা এবং গোসল ফরজ না করা।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে সঠিক বুঝ দান করুন। আমিন।


দলিলসমূহ:

  1. সূরা আন-নিসা: ৪৩ - স্বপ্নদোষের কারণে অপবিত্রতার উল্লেখ।
  2. সহিহ বুখারি: ২৮২ - নারীর স্বপ্নদোষে গোসলের বিধান।
  3. সুনানে আবু দাউদ: ২৩৬ - ভেজা অবস্থা পেলে বীর্য না দেখলে গোসল ওয়াজিব নয়।
  4. রদ্দুল মুহতার: ১/৩৪৫ - বীর্য প্রমাণের জন্য নিশ্চিততা প্রয়োজন।
  5. ফাতাওয়া হিন্দিয়া: ১/১৪ - স্বপ্নদোষের স্মৃতি না থাকলে গোসল ওয়াজিব নয়।
  6. বাদায়েউস সানায়ি: ১/৪৩ - নারীর স্রাব পবিত্র।

This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.