শর্তযুক্ত তালাক প্রসঙ্গে।
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
প্রিয় হুজুর
আমি একদিন সাইকেল নিয়ে বাড়ি যাচ্ছিলাম কাজ থেকে সেই সময় আজান হচ্ছিল আজানে যখন আশহাদু আন্না মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ শুনতে পায় আমি তখন জবাবে সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উত্তর দি। এরপর তখন আমি মুখে উচ্চারণ করে বলেছিলাম নাকি মনে মনে বলেছিলাম নাকি আমার মনে উদিত হয়েছিল যে আমি যখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাই সাল্লাম এর নাম শুনবো যদি উত্তরে সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম না বলি তাহলে আমার বউ তালাক হবে এটা আমি তখন মুখে উচ্চারণ করে বলেছিলাম না মনে মনে বলেছি না আমার মনে তখন উদিত হয়েছিল আমি এখন সেটা নিশ্চিত হতে পারছি না। তারপর থেকে আমি যখনই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নাম শুনি তখনই পরি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিন্তু সমস্যাটা হচ্ছে যে আমি হয়তো ওয়াশরুমে আছি টয়লেটে রয়েছি। সেই সময় আজানে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শুনতে পেয়েছি সেই সময় তো আর আমি কি করে বলবো। বা আমি কোন মজলিসে বসে আছিস সেখানে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নাম বারবার উচ্চারণ করা হচ্ছে আমি কি করে বারবার বলতে পারব আমি তো বুঝতেও পারবো না যে কতবার আমি শুনেছি এবং আমি কতবার উত্তর দিয়েছি। আর এতদিন আমি এটাকে শক্ত মনে করে চলে এসেছি। কিন্তু তারপরে আমি নিজেকে নিজের কাছে বললাম মানে আল্লাহ সুবহানাতায়ালা কে উদ্দেশ্য করে এমন বলেছি যে। শর্ত এমন হবে যে নবী সাল্লাল্লাহু ওয়া সাল্লাম এর নাম আমি যখন ওয়াশরুমে থাকবো বা টয়লেটে থাকবো নাম শুনলে নবী সাল্লাল্লাহু আলাই সাল্লাম এর উত্তর দেবো না এবং মনে মনে ভাব না হলে উত্তর দেবো না কিন্তু ইচ্ছা করে মনে মনে ভাবলে উত্তর দেব এবং নামাজের মধ্যে আমি উচ্চারণ করলে উত্তর দেব। এখন আমার জানামতে এটা যে হুজুর যে আল্লাহ সুবহানাতায়ালাকে উদ্দেশ্য করে আমি আমি মুখে উচ্চারণ করে শর্ত এমন হবে যে আমি টয়লেটে থাকলে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নাম শুনলে উত্তর দেবো না এবং মনে মনে ভাবনা হলেও উত্তর দেব না কিন্তু ইচ্ছা করে যদি ভাবি তাহলে উত্তর দেব। তোর শেষে এই যে কথাটা বলেছি আল্লাহ সুবহানাতায়ালা কে উদ্দেশ্য করে এটা কিন্তু নতুন করে আমি কোন শর্ত দেবার উদ্দেশ্যে আমি বলিনি বরং আগে সত্য কেমন রেখে ছিলাম নিশ্চিত হতে না পেরে এমন বলেছি। এখন আমার এর থেকে দুটো পয়েন্ট জানার আছে।
1 বিগত দিনে মুখে উচ্চারণ করে শর্ত দিয়েছি না মনে মনে বলেছি সেটা এখন পুরোপুরি ভাবে নিশ্চিত হতে পারছি না এবং সেটাকে সত্য মনে করে এতদিন চলে এসেছি। তো এটার জন্য কি আমার স্ত্রী উপরে কোন সত্য পতিত হয়েছে।
2 আর বিগত দিনে শর্ত দিয়েছে কি, সেটা সন্দেহ ছিল তাই আল্লাহ সুবহানাতায়ালাকে উদ্দেশ্য করে সত্যটাকে মুখে উচ্চারণ করে বলেছি যে সত্য হলে এমন হবে যেটা আমি আগের লাইনে লিখেছি এমন বলার জন্য কি আমার স্ত্রীর উপরে কোন শর্ত পতিত হয়েছে এটা কিন্তু আমি আলাদাভাবে শর্ত দেয়ার জন্য বলিনি বরং আগে সত্য দিয়েছি কি বুঝতে না পেরে এমন বলেছি আল্লাহ সুবহানাতায়ালার কাছে। দয়া করে জানাবেন।
Answer
তালাক সংক্রান্ত প্রশ্নের উত্তর
উত্তর:
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রিয় প্রশ্নকারী ভাই, আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম এবং সংবেদনশীল। আমি বিস্তারিতভাবে বিশ্লেষণ করে উত্তর দিচ্ছি।
১ম প্রশ্নের উত্তর: পূর্বের শর্ত সম্পর্কে সন্দেহ
আপনি বলেছেন যে, আগে আপনি মুখে উচ্চারণ করে শর্ত দিয়েছিলেন নাকি মনে মনে—এটা您现在 নিশ্চিত নন। কিন্তু এতদিন আপনি সেটাকে সত্য মনে করে চলেছেন।
হানাফি ফিকহের নিয়ম:
তালাকের শর্ত সংক্রান্ত বিষয়ে সন্দেহ থাকলে মূলনীতি হলো—ইয়াকীন (নিশ্চিততা) সন্দেহের উপর প্রাধান্য পায় (اليقين لا يزول بالشك)। অর্থাৎ, যতক্ষণ পর্যন্ত নিশ্চিত না হওয়া যায় যে শর্ত দেওয়া হয়েছে, ততক্ষণ পর্যন্ত তালাক পতিত হবে না।
ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) রাদ্দুল মুহতার-এ উল্লেখ করেছেন:
"الشك لا يثبت به الطلاق" "সন্দেহের কারণে তালাক পতিত হয় না।"
যেহেতু আপনি নিশ্চিত নন যে মুখে উচ্চারণ করেছিলেন নাকি মনে মনে, এবং আপনি এখন বলছেন যে সেটা আসলে ছিল কিনা সন্দেহ আছে—তাহলে আপনার স্ত্রীর উপর তালাক পতিত হয়নি। কারণ তালাক পতিত হওয়ার জন্য নিশ্চিত প্রমাণ প্রয়োজন।
তবে আপনি যদি নিশ্চিত হতেন যে মুখে উচ্চারণ করে শর্ত দিয়েছিলেন এবং সেই শর্ত লঙ্ঘিত হয়েছে, তাহলে তালাক পতিত হতো। কিন্তু যেহেতু আপনি নিশ্চিত নন, তাই তালাক পতিত হয়নি।
২য় প্রশ্নের উত্তর: নতুন করে শর্ত দেওয়ার বিষয়ে
আপনি বলেছেন যে, আপনি আল্লাহকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন—"শর্ত এমন হবে যে টয়লেটে থাকলে উত্তর দেবো না, মনে মনে ভাবনা হলেও উত্তর দেবো না, কিন্তু ইচ্ছা করে ভাবলে উত্তর দেবো।" কিন্তু আপনি এটা নতুন শর্ত দেওয়ার জন্য বলেননি, বরং আগের শর্তটি সত্য ছিল কিনা তা বুঝতে না পেরে বলেছিলেন।
হানাফি ফিকহের নিয়ম:
তালাকের শর্ত সংক্রান্ত বিষয়ে নিয়ত (ইন্তেনশন) গুরুত্বপূর্ণ। যদি কেউ শর্ত দেওয়ার নিয়তে না বলে, বরং পূর্বের অবস্থা যাচাই করার জন্য বলে, তাহলে সেটা নতুন শর্ত হিসেবে গণ্য হবে না।
ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, তালাকের শর্তে নিয়তের গুরুত্ব রয়েছে। যদি কেউ শর্ত দেওয়ার ইচ্ছা না রেখে কোনো কথা বলে, তাহলে তা তালাকের শর্ত হিসেবে গণ্য হবে না।
যেহেতু আপনি স্পষ্ট বলেছেন যে, আপনি নতুন শর্ত দেওয়ার উদ্দেশ্যে বলেননি, বরং আগের শর্তটি সত্য ছিল কিনা তা বুঝতে না পেরে আল্লাহর কাছে সত্য তুলে ধরেছেন—তাহলে এটা নতুন শর্ত হিসেবে গণ্য হবে না এবং এর দ্বারা আপনার স্ত্রীর উপর কোনো তালাক পতিত হবে না।
গুরুত্বপূর্ণ নোট:
১. তালাক একটি অত্যন্ত গুরুতর বিষয়—রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"আল্লাহর নিকট বৈধ কাজগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ঘৃণিত হলো তালাক।" (আবু দাউদ)
২. সন্দেহের ক্ষেত্রে তালাক পতিত হয় না—এটাই হানাফি ফিকহের মূলনীতি।
৩. ভবিষ্যতে এ ধরনের শর্ত দেওয়া থেকে বিরত থাকুন—কারণ এ ধরনের শর্ত দেওয়া এবং তা লঙ্ঘনের ভয়ে জীবন যাপন করা উচিত নয়।
৪. তওবা ও ইস্তিগফার করুন—আপনি যদি কোনো গুনাহের কাজ করে থাকেন, আল্লাহর কাছে তওবা করুন।
উপসংহার:
আপনার উভয় প্রশ্নের আলোকে বলা যায় যে, আপনার স্ত্রীর উপর কোনো তালাক পতিত হয়নি। আপনার বিবাহ বৈধ এবং আপনার স্ত্রী আপনার সাথে বিবাহিত রয়েছেন। আপনি নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সঠিক পথে চলার তাওফিক দান করুন। আমিন।
দলিলসমূহ:
- রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন)
- ফাতাওয়া হিন্দিয়া
- আল-হিদায়া
- ফাতাওয়া উসমানি (মুফতি তাকি উসমানি)