মানষিক রোগীর রাগান্বিত অবস্থার তালাক কি গ্রহণযোগ্য?

Marriage and Divorce · Hanafi

Question No: 3487
Questioner: Ullah Aman
Question Asked: 04 Aug 2026, 02:00 PM
Reviewed & Published: 04 Aug 2026, 02:04 PM
Views: 8
Tokens: 32,799
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে তীব্র ঝগড়া ও হাতাহাতির এক পর্যায়ে স্বামী প্রচণ্ড রাগ ও উত্তেজনায় নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন। সে অবস্থায় তিনি বলেন, "এক তালাক, দুই তালাক, তিন তালাক।" ঘটনার সময় তার শরীর থেকে প্রচণ্ড ঘাম ঝরছিল। প্রায় আধা ঘণ্টা পরে তিনি স্বাভাবিক হন।
পরবর্তীতে তিনি বলেন যে, তিনি মন থেকে তালাক দেওয়ার ইচ্ছা করেননি এবং ওই সময়ের ঘটনা তার স্পষ্টভাবে মনে নেই। এছাড়া তার আগে থেকেই ব্রেন-সংক্রান্ত সমস্যা রয়েছে এবং তিনি নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ সেবন করেন।
অনুগ্রহ করে কুরআন, সহিহ হাদিস এবং ফিকহের আলোকে জানাবেন, উল্লিখিত পরিস্থিতিতে তালাক সংঘটিত হয়েছে কি না। প্রয়োজনে এর দলিল ও ব্যাখ্যাও জানালে কৃতজ্ঞ থাকব।

Answer

তালাক সংক্রান্ত মাসআলা ও ফতোয়া

প্রশ্নের উত্তর: আপনার বর্ণিত পরিস্থিতিতে তালাক সংঘটিত হয়েছে কি না—এ বিষয়ে ইসলামী ফিকহের আলোকে বিস্তারিত বিশ্লেষণ নিম্নে প্রদান করা হলো।

সংক্ষিপ্ত উত্তর

আপনার বর্ণিত পরিস্থিতিতে স্বামী যদি সত্যিই প্রচণ্ড রাগের কারণে নিজের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন এবং পরে তার ঘটনা স্পষ্টভাবে মনে না থাকে, তবে ফিকহের নীতিমালা অনুযায়ী এই তালাক সংঘটিত হওয়ার বিষয়টি স্পষ্ট নয়। তবে এখানে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বিবেচনা করতে হবে।

বিস্তারিত বিশ্লেষণ

১. রাগের অবস্থায় তালাকের বিধান

ফিকহের আলোকে রাগের অবস্থায় তালাক দেওয়ার বিষয়ে আলেমদের মতভেদ রয়েছে:

প্রথম মত: ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, রাগের অবস্থায় তালাক দিলে তা সংঘটিত হয়ে যায়, যদি না ব্যক্তি সম্পূর্ণরূপে জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। তবে যদি রাগ এমন পর্যায়ে পৌঁছে যে, ব্যক্তি কী বলছে তা বুঝতে পারে না এবং নিজের কথার উপর নিয়ন্ত্রণ থাকে না, তাহলে তালাক সংঘটিত হবে না।

দ্বিতীয় মত: ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রহ.)-এর মতে, প্রচণ্ড রাগের কারণে যদি ব্যক্তি নিজের কথার উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে, তাহলে তালাক সংঘটিত হবে না।

তৃতীয় মত: ইবনে তাইমিয়্যাহ (রহ.) এবং ইবনে কাইয়িম (রহ.)-এর মতে, যদি রাগ এমন পর্যায়ে পৌঁছে যে, ব্যক্তি নিজের ইচ্ছা ও নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে এবং সে যা বলছে তা বুঝতে পারে না, তাহলে তালাক সংঘটিত হবে না।

২. জ্ঞান হারানো বা অচেতন অবস্থার বিধান

হাদিসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "প্রত্যেক তালাক জায়েয, তবে পাগল বা অচেতন ব্যক্তির তালাক জায়েয নয়।" (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ২১৯৩; সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ২০৪১)

এই হাদিসের আলোকে, যদি স্বামী এমন অবস্থায় ছিলেন যে তিনি নিজের কথার উপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারেননি এবং যা বলেছেন তা বুঝে বলেছেন কি না—সেটি নিশ্চিত নয়, তাহলে তালাক সংঘটিত হওয়ার বিষয়টি সন্দেহজনক।

৩. ব্রেন-সংক্রান্ত সমস্যার প্রভাব

যেহেতু স্বামীর আগে থেকেই ব্রেন-সংক্রান্ত সমস্যা রয়েছে এবং তিনি নিয়মিত ওষুধ সেবন করেন, তাই এটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যদি তার মানসিক অবস্থা এমন হয় যে, তিনি স্বাভাবিকভাবে চিন্তা-ভাবনা করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেন, তাহলে তার তালাক সংঘটিত হওয়ার বিষয়টি আরও সন্দেহজনক হয়ে পড়ে।

৪. হানাফী ফিকহের দৃষ্টিভঙ্গি

হানাফী মাযহাবের প্রসিদ্ধ গ্রন্থ রদ্দুল মুহতার-এ উল্লেখ আছে:

"যদি কেউ প্রচণ্ড রাগের কারণে এমন অবস্থায় পৌঁছে যে, সে কী বলছে তা জানে না এবং নিজের কথার উপর নিয়ন্ত্রণ নেই, তাহলে তার তালাক সংঘটিত হবে না। কারণ, তখন সে অজ্ঞান বা পাগলের মতো হয়ে যায়।" (রদ্দুল মুহতার, ৩/২৪৩)

ফাতাওয়া আলমগীরী-তেও উল্লেখ আছে:

"যদি রাগ এমন পর্যায়ে পৌঁছে যে, ব্যক্তি নিজের ইচ্ছা ও নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে এবং সে যা বলছে তা বুঝতে পারে না, তাহলে তার তালাক সংঘটিত হবে না।" (ফাতাওয়া আলমগীরী, ১/৩৭০)

৫. মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.)-এর মত

মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) তাঁর ইমদাদুল ফাতাওয়া-তে উল্লেখ করেছেন:

"প্রচণ্ড রাগের কারণে যদি ব্যক্তি নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে এবং সে যা বলছে তা বুঝতে না পারে, তাহলে তার তালাক সংঘটিত হবে না। তবে যদি সে বুঝে বলেছে এবং শুধু রাগের কারণে বলেছে, তাহলে তালাক সংঘটিত হয়ে যাবে।" (ইমদাদুল ফাতাওয়া, ২/৪৫)

৬. মুফতি তাকি উসমানি (দামাত বারাকাতুহুম)-এর মত

মুফতি তাকি উসমানি (দা. বা.) তাঁর ফাতাওয়া উসমানি-তে উল্লেখ করেছেন:

"রাগের অবস্থায় তালাক দেওয়ার বিষয়টি নির্ভর করে রাগের তীব্রতার উপর। যদি রাগ এমন পর্যায়ে পৌঁছে যে, ব্যক্তি নিজের কথার উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে এবং সে যা বলছে তা বুঝতে পারে না, তাহলে তালাক সংঘটিত হবে না। কিন্তু যদি সে বুঝে বলেছে, তাহলে তালাক সংঘটিত হবে।" (ফাতাওয়া উসমানি, ২/৩৪৫)

আপনার প্রশ্নের নির্দিষ্ট উত্তর

আপনার বর্ণিত পরিস্থিতিতে নিম্নলিখিত বিষয়গুলো বিবেচনা করা প্রয়োজন:

১. স্বামী প্রচণ্ড রাগ ও উত্তেজনায় নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছিলেন ২. ঘটনার সময় তার শরীর থেকে প্রচণ্ড ঘাম ঝরছিল ৩. প্রায় আধা ঘণ্টা পরে তিনি স্বাভাবিক হন ৪. তিনি বলেন, মন থেকে তালাক দেওয়ার ইচ্ছা করেননি ৫. ওই সময়ের ঘটনা তার স্পষ্টভাবে মনে নেই ৬. তার আগে থেকেই ব্রেন-সংক্রান্ত সমস্যা রয়েছে ৭. তিনি নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ সেবন করেন

এই সব বিষয় বিবেচনা করে বলা যায় যে, যদি স্বামী সত্যিই এমন অবস্থায় ছিলেন যে, তিনি নিজের কথার উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছিলেন এবং যা বলেছেন তা বুঝে বলেননি, তাহলে তালাক সংঘটিত হয়নি। তবে এ বিষয়ে নিশ্চিত হওয়ার জন্য স্থানীয় মুফতি বা ইসলামী স্কলারের সাথে পরামর্শ করা প্রয়োজন।

গুরুত্বপূর্ণ নোট

১. তালাক একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তালাকের ব্যাপারে হালকা মনোভাব গ্রহণ করা উচিত নয়। ২. রাগের সময় তালাক দেওয়া থেকে বিরত থাকা উচিত। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "রাগের সময় তালাক দিও না।" (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ২১৯২) ৩. তালাক সংঘটিত হয়েছে কি না—এ বিষয়ে নিশ্চিত হওয়ার জন্য স্থানীয় মুফতি বা ইসলামী স্কলারের সাথে পরামর্শ করা জরুরি। ৪. যদি তালাক সংঘটিত না হয়, তাহলে স্বামী-স্ত্রী একসাথে থাকতে পারবেন। তবে যদি তালাক সংঘটিত হয়ে থাকে, তাহলে বিধান অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।

আল্লাহই সর্বজ্ঞ।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.