স্বামী যদি বলে "যদি আমার কথা না শোনো সংসার করার দরকার নেই" তাহলে তালাক হবে

Family Life · Hanafi

Question No: 3419
Questioner: Amatullah US
Question Asked: 02 Aug 2026, 05:17 PM
Reviewed & Published: 02 Aug 2026, 05:20 PM
Views: 8
Tokens: 3,254
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আরেকটা প্রশ্ন,, স্বামী যদি সিম্পল কথায় রেগে গিয়ে বলে,,, যদি আমার কথা না শোনো সংসার করার দরকার নেই,,, পরক্ষণেই বলেছে আমি শাসনের জন্য তোমাকে বলি,,
সে বলে যে,, আমার যেমন ভালোবাসার অধিকার আছে তেমন আমার শাসন করার ও অধিকার আছে,,, আমি তোমাকে বলি যেন তুমি পারফেক্ট সংসারী একজন হও,,
তাহলে এই কথায় কি কোন সমস্যা হবে,,
বিস্তারিতভাবে জানতে চাচ্ছি

Answer

উত্তরের সারসংক্ষেপ

আপনার প্রশ্নের উত্তরে বলা যায় যে, স্বামীর উক্ত বাক্যগুলো দ্বারা তালাক পতিত হয়নি। তবে ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে স্বামীর এই ধরনের কথাবার্তা ও আচরণের কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে যা বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।


১. তালাক সংক্রান্ত বিধান

স্বামী যদি রাগের মাথায় বলে, "যদি আমার কথা না শোনো সংসার করার দরকার নেই" — এই বাক্যটি দ্বারা তালাক পতিত হয় না। কারণ:

  • এটি শর্তসাপেক্ষ বাক্য (conditional statement), যা ভবিষ্যতের কোনো ঘটনার সাথে যুক্ত।
  • এখানে স্পষ্টভাবে "তালাক" শব্দটি উচ্চারিত হয়নি।
  • এটি শাসন বা সতর্কবার্তার উদ্দেশ্যে বলা হয়েছে, যা পরবর্তী বাক্য "আমি শাসনের জন্য তোমাকে বলি" দ্বারা স্পষ্ট হয়।

কিতাবের দলিল:

রদ্দুল মুহতার (শামী) এ উল্লেখ আছে:

"তালাক শুধুমাত্র স্পষ্ট শব্দে (তালাক, ত্বলাক) অথবা এমন শব্দে পতিত হয় যা দ্বারা তালাকের অর্থ স্পষ্টভাবে উদ্দেশ্য হয়। শর্তসাপেক্ষ বাক্য দ্বারা তালাক পতিত হওয়ার জন্য শর্ত পূরণ হওয়া আবশ্যক এবং তালাকের নিয়ত থাকতে হবে।"

(রদ্দুল মুহতার, ৩/২৩০)


২. স্বামীর শাসন করার অধিকার

ইসলামে স্বামীকে পরিবারের প্রধান ও দায়িত্বশীল হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন:

الرِّجَالُ قَوَّامُونَ عَلَى النِّسَاءِ "পুরুষরা নারীদের উপর শাসক (দায়িত্বশীল)।" (সূরা আন-নিসা: ৩৪)

তাফসীরে মা'আরিফুল কুরআনে (২/১০৫) ইমাম মুহাম্মদ শফী (রহ.) উল্লেখ করেছেন যে, এই আয়াতে "কাওয়ামুন" শব্দের অর্থ হলো—স্বামী স্ত্রীর রক্ষণাবেক্ষণ, প্রতিপালন ও শাসনের দায়িত্বে নিয়োজিত। তবে এই শাসন ক্ষমতা সীমাবদ্ধ—শুধুমাত্র ইসলামী বিধান অনুযায়ী এবং স্ত্রীর কল্যাণের জন্য।


৩. ভালোবাসা ও শাসনের ভারসাম্য

স্বামীর উক্তি "আমার যেমন ভালোবাসার অধিকার আছে, তেমন শাসন করারও অধিকার আছে" — এটি ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে সঠিক। তবে শর্ত হলো:

১. শাসন হতে হবে কুরআন-সুন্নাহর আলোকে ২. হতে হবে নম্রতা ও সহানুভূতির সাথে ৩. হতে হবে স্ত্রীর কল্যাণের জন্য, অপমান বা কষ্ট দেওয়ার জন্য নয়

রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

خَيْرُكُمْ خَيْرُكُمْ لِأَهْلِهِ وَأَنَا خَيْرُكُمْ لِأَهْلِي "তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম ব্যক্তি সেই, যে তার পরিবারের জন্য সর্বোত্তম। আর আমি আমার পরিবারের জন্য তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম।" (তিরমিযী: ৩৮৯৫)


৪. "পারফেক্ট সংসারী হওয়ার" উপদেশ

স্বামীর এই উপদেশটি ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে গ্রহণযোগ্য। তবে "পারফেক্ট সংসারী" হওয়ার অর্থ হলো:

  • আল্লাহর বিধান মেনে চলা
  • স্বামীর বৈধ আদেশ মানা
  • সন্তানদের সঠিকভাবে লালন-পালন করা
  • স্বামীর সাথে সদাচরণ করা

কুরআনে আল্লাহ বলেন:

فَالصَّالِحَاتُ قَانِتَاتٌ حَافِظَاتٌ لِّلْغَيْبِ بِمَا حَفِظَ اللَّهُ "সুতরাং সৎকর্মপরায়ণা স্ত্রীগণ অনুগতা এবং আল্লাহ যা হিফাযত করেছেন তার অভাবে (স্বামীর অনুপস্থিতিতে) তা হিফাযতকারিণী।" (সূরা আন-নিসা: ৩৪)


৫. স্ত্রীর কর্তব্য

স্ত্রীর উপর স্বামীর বৈধ আদেশ মানা ফরজ (ওয়াজিব)। তবে যদি স্বামীর আদেশ শরীয়তসম্মত না হয়, তাহলে তা মানা জায়েয নেই। হাদীসে এসেছে:

لَا طَاعَةَ لِمَخْلُوقٍ فِي مَعْصِيَةِ الْخَالِقِ "সৃষ্টিকর্তার নাফরমানীর ব্যাপারে সৃষ্টির আনুগত্য নেই।" (মুসনাদ আহমাদ: ১০৯৮)


৬. স্বামীর কর্তব্য

স্বামীর উচিত স্ত্রীর সাথে নম্রভাবে কথা বলা এবং রাগের সময় সতর্ক থাকা। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

أَكْمَلُ الْمُؤْمِنِينَ إِيمَانًا أَحْسَنُهُمْ خُلُقًا "ঈমানদারদের মধ্যে পরিপূর্ণ ঈমানদার সেই, যার চরিত্র সবচেয়ে উত্তম।" (তিরমিযী: ১১৬২)


৭. ব্যবহারিক পরামর্শ

১. স্বামীর সাথে শান্তিপূর্ণ আলোচনা করুন — আপনার অনুভূতি প্রকাশ করুন যে, এই ধরনের কথায় আপনি কষ্ট পান। ২. স্বামীর বৈধ আদেশ মানার চেষ্টা করুন — তবে শরীয়তবিরোধী হলে বিনয়ের সাথে বুঝিয়ে বলুন। ৩. দোয়া করুন — আল্লাহর কাছে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক সুন্দর করার জন্য প্রার্থনা করুন। ৪. আত্মীয় বা বিজ্ঞ আলেমের মাধ্যমে মীমাংসা করুন — প্রয়োজনে পরিবারের বড়দের মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করুন।


৮. চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত

আপনার বর্ণিত ঘটনায় তালাক পতিত হয়নি এবং স্বামীর কথাগুলো ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে সমস্যাযুক্ত নয়, তবে স্বামীর উচিত রাগের সময় সাবধান থাকা এবং স্ত্রীর সাথে নম্র আচরণ করা। স্ত্রীর উচিত স্বামীর বৈধ আদেশ মানা এবং সংসারে শান্তি বজায় রাখা।


আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সুন্দরভাবে সংসার পরিচালনার তাওফীক দান করুন। আমীন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.