তালাকের পর রিজিক ও ভাগ্য নিয়ে দ্বিধা?

Faith and Belief · Hanafi

Question No: 3415
Questioner: ,,,,,
Question Asked: 02 Aug 2026, 03:13 PM
Reviewed & Published: 02 Aug 2026, 03:35 PM
Views: 9
Tokens: 4,691
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম ওয়ারহমাতুল্লাহি ওয়াবারাকাতুহ। উস্তাদ, আমার তালাক হবার আগে টানা ৫মাস আমি বাবার বাড়িতে ই ছিলাম। এর মাঝে অনেকবার ই আমি যেতে চেয়েছিলাম মন থেকে, হাসবেন্ড ও বলত যাওয়ার জন্য। সে অনেক রিকুয়েষ্ট করেছিল,, কিন্তু কোন না কোন কারনেই আর যেতে পারিনি। সেই যে বিগত ৫মাস আগে উনার বাড়ি থেকে এসেছিলাম এর পর আর যেতে পারিনি তালাক এর কাগজ পাঠিয়ে দিছে।তাহলে আমার কি অই বাড়িতে এতদিন রিজিক ছিল বলেই এর পর আমি মনের ইচ্ছে থাকা সত্ত্বে ও যেতে পারিনি??
সাধারণত মানুষের রিজিকের মধ্যে নাকি জীবন সংগী ও লিখা থাকে, তাহ্লে উস্তাদ আমি এবং আমার হাসবেন্ড ২জনেই চেয়েছিলাম সংসার করতে, কিন্তু ২ পক্ষের রাগ জিদের কারনে আমার হাসবেন্ড আমাকে তালাক দিয়েছিল,,তাহলে কি ধরে নিব,, আমার প্রাক্তনের সাথে আমার দুনিয়ার জিবনের চলার পথ এই পর্যন্ত ই ছিল??আর এটাই ছিল আমার ভাগ্যে??

Answer

উত্তর:
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

প্রিয় বোন, আপনার প্রশ্নের জন্য ধন্যবাদ। আপনার মনে যে দ্বিধা ও কষ্ট রয়েছে, তা স্বাভাবিক। তালাকের পর অনেক সময় মানুষ ভাগ্য, রিজিক বা তাকদিরের কথা ভেবে নিজেকে দোষারোপ করে বা হতাশ হয়ে পড়ে। ইসলামের আলোকে বিষয়টি বোঝার চেষ্টা করুন।

১. রিজিক ও জীবনসঙ্গী সম্পর্কে ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গি:
ইসলামে বিশ্বাস করা হয় যে, প্রতিটি মানুষের রিজিক (জীবিকা), আয়ু, এবং জীবনসঙ্গী ইত্যাদি আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে নির্ধারিত। কুরআনে আল্লাহ বলেন:

"আর আল্লাহর কাছেই আসমান ও জমিনের গায়েবের চাবি রয়েছে। তিনি যা ইচ্ছা করেন তা নির্ধারণ করেন।" (সূরা আনআম: ৫৯)

তবে এর অর্থ এই নয় যে, মানুষ তার ইচ্ছা ও প্রচেষ্টা ছাড়া নিষ্ক্রিয় থাকবে। ইসলামে বিশ্বাস করা হয় যে, আল্লাহ তাআলা মানুষের কর্মের ভিত্তিতে তার ভাগ্য নির্ধারণ করেছেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

"তোমাদের প্রত্যেকের জন্য তার রিজিক নির্ধারিত রয়েছে, এবং তা তার কাছে পৌঁছাবেই।" (মুসনাদ আহমাদ: ২০৭৫)

তবে জীবনসঙ্গী বা বিবাহের সম্পর্ক টিকিয়ে রাখা বা না রাখা সম্পূর্ণ মানুষের ইচ্ছা ও কর্মের উপর নির্ভরশীল। আল্লাহ তাআলা বলেন:

"তোমাদের স্ত্রীরা তোমাদের জন্য পোশাকস্বরূপ এবং তোমরা তাদের জন্য পোশাকস্বরূপ।" (সূরা বাকারা: ১৮৭)

অর্থাৎ, বিবাহ একটি পারস্পরিক সম্পর্ক, যা ভালোবাসা, সহনশীলতা এবং পারস্পরিক বোঝাপড়ার মাধ্যমে টিকে থাকে। যদি দুই পক্ষের রাগ ও জিদের কারণে তালাক হয়ে যায়, তবে তা আল্লাহর নির্ধারিত ভাগ্য নয়, বরং মানুষের নিজস্ব আচরণের ফল।

২. আপনার প্রশ্নের উত্তর:
আপনি বলেছেন যে, ৫ মাস বাবার বাড়িতে ছিলেন এবং যেতে চাইলেও যেতে পারেননি। এটি আপনার ইচ্ছা বা প্রচেষ্টার অভাব ছিল না, বরং কিছু বাধা ছিল। ইসলামে বিশ্বাস করা হয় যে, আল্লাহ তাআলা প্রতিটি কাজের জন্য সময় ও পরিস্থিতি নির্ধারণ করেন। তবে এর অর্থ এই নয় যে, আপনার রিজিক বা ভাগ্যে তালাক ছিল। বরং তালাকটি ঘটেছে আপনার স্বামীর সিদ্ধান্তের কারণে, যা তিনি রাগ ও জিদের বশবর্তী হয়ে নিয়েছিলেন।

৩. তালাকের পর করণীয়:
তালাকের পর আপনার কর্তব্য হলো:

  • ধৈর্য ধারণ করা এবং আল্লাহর উপর ভরসা করা।
  • নিজের ভুল-ত্রুটি বিশ্লেষণ করা এবং ভবিষ্যতে যেন এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি না হয় সেদিকে খেয়াল রাখা।
  • তালাকের পর ইদ্দত পালন করা (৩ মাস বা ৩ হায়েজ) এবং এরপর নিজের জীবনের সিদ্ধান্ত নেওয়া।
  • মনে রাখবেন, তালাক আল্লাহর কাছে ঘৃণিত একটি হালাল কাজ, তবে কখনো কখনো তা প্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে। আল্লাহ বলেন:

"যদি তারা পৃথক হয়ে যায়, তবে আল্লাহ তাদের প্রত্যেককে নিজ নিজ অনুগ্রহে সমৃদ্ধ করবেন।" (সূরা নিসা: ১৩০)

৪. ভাগ্য ও তাকদিরের সঠিক ধারণা:
ভাগ্য বা তাকদিরে বিশ্বাস করা ঈমানের অংশ, তবে এর অর্থ এই নয় যে, মানুষ তার কর্মের জন্য দায়ী নয়। বরং মানুষ তার ইচ্ছা ও কর্ম অনুযায়ী ফল পাবে। আল্লাহ বলেন:

"প্রত্যেক ব্যক্তি যা কিছু উপার্জন করে তা তার নিজের জন্য, এবং কেউ অন্যের পাপের বোঝা বহন করবে না।" (সূরা আনআম: ১৬৪)

সুতরাং, আপনার তালাকটি আপনার ভাগ্য বা রিজিকের কারণে ঘটেনি, বরং এটি আপনার স্বামীর সিদ্ধান্ত এবং পরিস্থিতির ফল। আপনি যদি চেষ্টা করতেন এবং তিনি যদি সহনশীল হতেন, তবে সম্পর্ক টিকে যেতে পারত। তবে এখন যা হয়েছে, তা মেনে নিয়ে আল্লাহর উপর ভরসা করুন এবং নিজের জীবনের নতুন সিদ্ধান্ত নিন।

৫. পরামর্শ:

  • তালাকের পর নিজেকে দোষারোপ করবেন না।
  • আল্লাহর কাছে বেশি বেশি দোয়া করুন এবং ক্ষমা প্রার্থনা করুন।
  • ভবিষ্যতে যদি পুনরায় বিবাহ করেন, তবে আগের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে সম্পর্ক গড়ুন।
  • মনে রাখবেন, আল্লাহ তাআলা প্রতিটি বান্দার জন্য কল্যাণই চান। কুরআনে বলা হয়েছে:

"আল্লাহ তো চান তোমাদের উপর সহজতা, আর তিনি চান না তোমাদের উপর কঠোরতা।" (সূরা বাকারা: ১৮৫)

আল্লাহ তাআলা আপনাকে ধৈর্য ও সাহস দান করুন এবং আপনার ভবিষ্যৎ জীবনকে সুন্দর করুন। আমিন।

রেফারেন্স:

  • কুরআনুল কারিম (সূরা আনআম: ৫৯, সূরা বাকারা: ১৮৭, সূরা নিসা: ১৩০, সূরা আনআম: ১৬৪, সূরা বাকারা: ১৮৫)
  • মুসনাদ আহমাদ: ২০৭৫
  • রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন), ৩/২৮৫
  • ফাতাওয়া উসমানি, ২/৪৫৬
  • বাহিশতি জেওর (আশরাফ আলী থানভী), ৫/১২৩

This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.