নির্দিষ্ট কাউকে জীবন সঙ্গী হিসেবে চাওয়ার দোয়া সংক্রান্ত।
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
কোনো হারামে না জড়িয়ে হালালভাবে নির্দিষ্ট কাউকে জীবনসঙ্গী হিসেবে খয়ের ও আফিয়াতের সাথে চাওয়া কি জায়েয আছে? বা গুনাহ হবে এতে!!
Answer
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
১. দুআ ও ইস্তিখারার বৈধতা
আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَإِذَا سَأَلَكَ عِبَادِي عَنِّي فَإِنِّي قَرِيبٌ ۖ أُجِيبُ دَعْوَةَ الدَّاعِ إِذَا دَعَانِ
"আর যখন আমার বান্দারা আমার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে, তখন আমি তো নিকটেই। আমি আহ্বানকারীর আহ্বানে সাড়া দিই, যখন সে আমাকে আহ্বান করে।"
(সূরা আল-বাকারা, ২:১৮৬)
রাসূলুল্লাহ ﷺ ইস্তিখারার বিশেষ দুআ শিখিয়েছেন। হাদিসে এসেছে:
إِذَا هَمَّ أَحَدُكُمْ بِالأَمْرِ فَلْيَرْكَعْ رَكْعَتَيْنِ مِنْ غَيْرِ الْفَرِيضَةِ ثُمَّ لِيَقُلْ: اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْتَخِيرُكَ بِعِلْمِكَ وَأَسْتَقْدِرُكَ بِقُدْرَتِكَ وَأَسْأَلُكَ مِنْ فَضْلِكَ الْعَظِيمِ...
"তোমাদের কেউ কোনো কাজের সংকল্প করলে সে যেন ফরজ ছাড়া দুই রাকাত নামাজ পড়ে তারপর এই দুআ করে—'হে আল্লাহ! আমি您的知识的吉庆中祈求善,我以您的大能祈求能力,并向您伟大的恩典祈求...'"
(সহিহ বুখারি, হাদিস: ১১৬২; সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ১৫৩৩)
অতএব, কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে জীবনসঙ্গী হিসেবে পছন্দ করলে আল্লাহর কাছে খায়ের ও আফিয়াতের সাথে চাওয়া সম্পূর্ণ জায়েয এবং ইস্তিখারা করা সুন্নত।
২. "হারামে না জড়িয়ে" — এটি মূল শর্ত
আপনি যে শর্তটি উল্লেখ করেছেন ("কোনো হারামে না জড়িয়ে") এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইসলামে পাত্র-পাত্রীর সম্পর্ক সবসময় শরীয়তের সীমার মধ্যে থাকতে হবে:
-
দৃষ্টি অবনত রাখা:
قُل لِّلْمُؤْمِنِينَ يَغُضُّوا مِنْ أَبْصَارِهِمْ
"মুমিনদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি অবনত রাখে।"
(সূরা আন-নূর, ২৪:৩০) -
পর্দা রক্ষা করা:
يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ قُل لِّأَزْوَاجِكَ وَبَنَاتِكَ وَنِسَاءِ الْمُؤْمِنِينَ يُدْنِينَ عَلَيْهِنَّ مِن جَلَابِيبِهِنَّ
"হে নবী! আপনার স্ত্রীগণ, কন্যাগণ ও মুমিনদের নারীগণকে বলুন, তারা যেন তাদের চাদরের অংশ নিজেদের উপর টেনে দেয়।"
(সূরা আল-আহযাব, ৩৩:৫৯) -
বিয়ে করার উদ্দেশ্যে পাত্রী দেখা জায়েয:
জাবির রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:إِذَا خَطَبَ أَحَدُكُمُ الْمَرْأَةَ فَإِنِ اسْتَطَاعَ أَنْ يَنْظُرَ إِلَى مَا يَدْعُوهُ إِلَى نِكَاحِهَا فَلْيَفْعَلْ
"তোমাদের কেউ কোনো নারীর কাছে বিয়ের প্রস্তাব দিলে, যদি সে এমন কিছু দেখতে পারে যা তাকে বিয়ে করতে উদ্বুদ্ধ করবে, তবে সে তা দেখে নেবে।"
(সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ২০৮২; মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ১৪৪৩৫)তবে এই অনুমতি শুধুমাত্র বিয়ের প্রস্তাবের উদ্দেশ্যে, গোপন প্রেম বা অবৈধ সম্পর্কের জন্য নয়।
৩. "খায়ের ও আফিয়াতের সাথে চাওয়া" — এর অর্থ
"খায়ের" অর্থ কল্যাণ, "আফিয়াত" অর্থ নিরাপত্তা ও সুস্থতা। আপনি যখন আল্লাহর কাছে দুআ করেন—"হে আল্লাহ! আমাকে অমুক ব্যক্তিকে জীবনসঙ্গী হিসেবে দান করুন, যদি তাতে আমার জন্য কল্যাণ থাকে"—এটি সম্পূর্ণ জায়েয।
কিন্তু মনে রাখতে হবে: ইস্তিখারার পর আল্লাহর সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট থাকা জরুরি। হাদিসে এসেছে:
عَجَبًا لأَمْرِ الْمُؤْمِنِ إِنَّ أَمْرَهُ كُلَّهُ خَيْرٌ
"মুমিনের ব্যাপারটা বিস্ময়কর! তার সকল অবস্থাই কল্যাণকর।"
(সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৯৯৯)
অর্থাৎ, যদি আল্লাহর পক্ষ থেকে পছন্দমতো না-ও হয়, তবুও এতে আপনার জন্য কল্যাণ আছে—যদিও সেটা আপনি বুঝতে না-ও পারেন।
৪. হানাফি ফিকহের দলিল
ইমাম ইবনে আবিদীন রহ. তার বিখ্যাত গ্রন্থ রদ্দুল মুহতার-এ বলেন:
"ইস্তিখারা যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজের আগে মুস্তাহাব। আর বিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ।"
(রদ্দুল মুহতার, ২/৪৭৩)
ইমাম কাসানী রহ. 'বাদায়েউস সানায়ে'-তে বলেন:
"প্রস্তাবকারী পাত্রের জন্য শরীয়তসম্মতভাবে পাত্রী দেখা জায়েয, তবে তা শরীয়তের সীমার মধ্যে হতে হবে।"
(বাদায়েউস সানায়ে, ২/৩০৫)
৫. করণীয় আমল
যদি আপনি কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে জীবনসঙ্গী হিসেবে চান, তাহলে নিম্নোক্ত কাজগুলো করুন:
- ইস্তিখারা করুন — দুই রাকাত নফল নামাজ পড়ে নবী ﷺ এর শেখানো দুআ পড়ুন।
- নিজের ভাষায় দুআ করুন — আল্লাহর কাছে চাইতে পারেন।
- শরীয়তসম্মত উপায়ে প্রস্তাব পাঠান — পরিবারের মাধ্যমে বা মাহরামের মাধ্যমে পাত্র-পক্ষের কাছে বিয়ের প্রস্তাব দিন।
- সরাসরি যোগাযোগ বা গোপন সম্পর্ক থেকে বিরত থাকুন — বিয়ের প্রস্তাবের আগে হালাল উপায় ছাড়া কোনো সম্পর্ক গড়ে তোলা জায়েয নয়।
- ফলাফলে সন্তুষ্ট থাকুন — ইস্তিখারার পর প্রশান্তি যেদিকে আসবে, সেটাই গ্রহণ করুন।
৬. সংক্ষিপ্ত ফতোয়া
**কোনো হারামে না জড়িয়ে হালাল উপায়ে নির্দিষ্ট কাউকে জীবনসঙ্গী হিসেবে আল্লাহর কাছে চাওয়া জায়েয আছে।
এভাবে দোয়া করা যে, "হে আল্লাহ! আমাকে অমুক ব্যক্তিকে জীবনসঙ্গী হিসেবে দান করুন, যদি তাতে আমার জন্য কল্যাণ থাকে"—এটি জায়েয।
বিয়ের আগে ইস্তিখারা করা এবং আল্লাহর কাছে খায়ের ও আফিয়াত কামনা করা উত্তম।
আল্লাহ তাআলা আপনার নেক ইচ্ছা পূরণ করুন এবং আপনাকে সৎ জীবনসঙ্গী দান করুন। আমীন।
প্রধান দলিলসমূহ:
- সূরা আল-বাকারা ২:১৮৬
- সূরা আন-নূর ২৪:৩০
- সূরা আল-আহযাব ৩৩:৫৯
- সহিহ বুখারি ১১৬২ (ইস্তিখারার দুআ)
- সহিহ বুখারি ৫০৬৫, সহিহ মুসলিম ১৪০০ (বিয়ের উৎসাহ)
- সুনানে আবু দাউদ ২০৮২ (পাত্রী দেখার অনুমতি)
- রদ্দুল মুহতার ২/৪৭৩
- বাদায়েউস সানায়ে ২/৩০৫