৩ তালাকের উচ্চারণ কি তালাকের ইচ্ছা ছাড়া পতিত হয়?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
আমার ২টি প্রশ্ন ছিল।
১. আমার স্বামী শরয়ী হালালা সম্পর্কে জানতেন না।তাই উনি অনলাইনে সার্চ করলেন, তালাকের পর বউকে পুনরায় বিয়ে করা যাবে কিভাবে?.
আমি উনার পাশেই বসা ছিলাম আর আমি বললাম, ৩তালাক লিখেন। শুধু তালাক না।তখন উনি ফোন এর স্ক্রিনের দিকে তাকিয়েই ৩তালাক মুখে উচ্চারণ করে প্রশ্ন কেটে ঠিক করেছেন যে, ৩তালাকের পর বউ কে পুনরায় বিয়ে করার বিধান কি।
এতে কি আমাদের তালাক হয়ে গেছে?
২. তালাক নিয়ে একটা অনুচ্ছেদ উনাকে পড়তে দিয়েছিলাম। কিভাবে তালাক হয় এটা জানানোর জন্য। আমি বলেছিলাম মনে মনে পড়তে। কিন্তু উনি শব্দ করেই পড়েন। ওখানে অনুচ্ছেদের শিরোনাম ছিল "তালাক", উনি ওটা আমার সামনে পড়েছেন। এতে কি তালাক হবে? আমি চিন্তায় আছি।
Answer
উত্তর:
ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।
প্রশ্নটি দুটি অংশে বিভক্ত। দুটি ক্ষেত্রেই মূল আলোচ্য হলো—তালাকের নিয়্যত (ইচ্ছা) ছাড়া শুধু শব্দ উচ্চারণ করলে তালাক পতিত হয় কি না?
নীতিগত আলোচনা
হানাফি ফিকহে তালাকের শব্দ দু’প্রকার:
১. সরীহ (স্পষ্ট শব্দ): যেমন—‘তালাক’, ‘তুমি তালাক’। এতে নিয়্যতের প্রয়োজন হয় না, তবে শর্ত হলো শব্দটি তালাকের অর্থেই ব্যবহৃত হতে হবে।
২. কিনায়া (আশয়পূর্ণ শব্দ): যেমন—‘তুমি আমার কাছে ফিরে এসো না’, ‘তোমার পথ মুক্ত’। এতে তালাক পতিত হওয়ার জন্য নিয়্যত বা প্রসঙ্গের দিকনির্দেশনা জরুরি।
কিন্তু যদি ‘তালাক’ শব্দটি তালাক দেওয়ার ইচ্ছা ছাড়া অন্য কোনো উদ্দেশ্যে (যেমন প্রশ্ন করা, লেখা পড়া, অন্যের বক্তব্য উদ্ধৃত করা) বলা হয়, তবে তা তালাক গণ্য হয় না। কেননা তালাকের হুকুম বাস্তবায়নের জন্য মুখে উচ্চারিত শব্দের অর্থানুযায়ী ইচ্ছা অপরিহার্য। যদিও সরীহ শব্দে নিয়্যতের প্রয়োজন নেই, তবে প্রসঙ্গ যদি সুস্পষ্টভাবে তালাকের ইচ্ছার বিপরীত দিকে ইঙ্গিত করে, তাহলে তালাক পতিত হবে না।
ইমাম কাসানী (রহ.) বলেন:
“তালাকের শব্দ যদি কোনো প্রসঙ্গে আসে যা তালাকের জন্য নয়, যেমন—কিতাব পাঠ করা, ফতোয়া জিজ্ঞেস করা, বা অন্য কোনো বক্তব্য উদ্ধৃত করা—তাহলে তালাক পতিত হয় না।”
(বাদায়েউস সানায়ি, ৩/৯৪)
ইবনে আবিদীন (রহ.) তাঁর ‘রদ্দুল মুহতার’-এ উল্লেখ করেন:
“যদি কেউ ‘তালাক’ শব্দটি পাঠ করে শুধু জানার জন্য বা ফতোয়ার জন্য, তাহলে তালাক হয় না।”
(রদ্দুল মুহতার, ৩/২৮৪)
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন:
“নিশ্চয়ই আমলসমূহ নিয়্যতের ওপর নির্ভরশীল।”
(সহীহ বুখারী: ১, সহীহ মুসলিম: ১৯০৭)
১ম প্রশ্নের উত্তর
আপনার স্বামী অনলাইনে তালাকের পর পুনর্বিবাহের বিধান জানার জন্য সার্চ করছিলেন। আপনি তাঁকে বলেছিলেন, “৩ তালাক লিখুন।” তখন তিনি ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে “৩ তালাক” উচ্চারণ করেন, কিন্তু তা তালাক দেওয়ার উদ্দেশ্যে নয়, বরং প্রশ্নটি টাইপ বা সাবমিট করার অংশ হিসেবে উচ্চারণ করেন। এখানে তাঁর ইচ্ছা ছিল ফতোয়া জানা, স্ত্রীকে তালাক দেওয়া নয়।
তাই শুধু এই উচ্চারণে তালাক পতিত হবে না।
হানাফি ফিকহের নীতিমালা অনুযায়ী, প্রশ্নকারী বা জিজ্ঞাসাকারীর তালাকের শব্দ উচ্চারণ তালাকের নিয়্যত ব্যতীত পতন হয় না। ইমাম সারাখসী (রহ.) বলেন:
“যদি কেউ তালাকের বিধান জিজ্ঞাসার উদ্দেশ্যে ‘তালাক’ শব্দটি উচ্চারণ করে, তবে তা তালাক নয়।”
(আল-মাবসুত, ৬/৪)
বিশেষ করে আপনি বলছিলেন “লিখুন”, কিন্তু উনি মুখে বলেছেন। উদ্দেশ্য ছিল লেখা বা টাইপ করা, যা স্পষ্টতই তালাকের ইচ্ছার বিপরীত। তাই এটি তালাক গণ্য হবে না।
২য় প্রশ্নের উত্তর
আপনি স্বামীকে তালাক সংক্রান্ত একটি অনুচ্ছেদ পড়তে দিয়েছিলেন, যেখানে শিরোনাম ছিল “তালাক”। আপনি বলেছিলেন “মনে মনে পড়তে”, কিন্তু উনি সশব্দে পড়েছেন। এতে কোনো তালাক হবে না। কেননা:
- তিনি একটি লেখা বা নিবন্ধ পাঠ করেছেন, নিজের স্ত্রীকে তালাক দেননি।
- সশব্দে পড়া হলেও তা তালাকের ইচ্ছায় নয়।
- শিরোনাম “তালাক” হলেও পাঠকারীর মুখ দিয়ে “তালাক” শব্দটি বের হওয়ার কারণে তালাক পতিত হওয়ার জন্য তালাকের নিয়্যত অপরিহার্য।
আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেছেন:
“তালাক দুইবার... অতঃপর হয় উত্তম পন্থায় রাখা, না হয় সৌজন্যের সাথে বিদায় দেওয়া।”
(সূরা বাকারা: ২২৯)
এখানে তালাক বলতে স্বামীর ইচ্ছাকৃত তালাক বোঝানো হয়েছে। কোনো লেখা পড়া বা শব্দ উচ্চারণ যা তালাকের ইচ্ছায় হয়নি, তা তালাক হিসেবে গণ্য নয়। ইমাম তহাবী (রহ.) বলেন:
“তালাকের হুকুম প্রমাণের জন্য স্ত্রীকে তালাক দেওয়ার ইচ্ছা জরুরি।”
(শারহে মুখতাসারিল উসল, ২/১৫৫)
সতর্কতা
উপরোক্ত বিশ্লেষণ অনুযায়ী আপনাদের তালাক হয়নি। তবে ভবিষ্যতে এ ধরনের পরিস্থিতি এড়িয়ে চলা উচিত। কারণ কথা-বার্তায়, লেখায় বা পড়ায় ‘তালাক’ শব্দটি ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকা নিরাপদ। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ইরশাদ করেছেন:
“আমি যা তোমাদেরকে করেছি, তা ছেড়ে দাও; আর যা করতে নিষেধ করেছি, তা থেকে বিরত থাকো।”
(সুনানে তিরমিযী: ২৬৬৯)
তবে প্রয়োজনে ফতোয়া জানার জন্য বা লেখা পড়ার জন্য ‘তালাক’ শব্দ ব্যবহারে কোনো দোষ নেই, যতক্ষণ না তালাকের নিয়্যত থাকে। আপনারা সুখে-শান্তিতে সংসার করতে পারেন।
রেফারেন্স
১. সূরা বাকারা: ২২৯-২৩০ – তালাকের বিধান ও পুনর্বিবাহের শর্ত।
২. সূরা তালাক: ১ – তালাকের সময়সীমা ও নিয়ম।
৩. সহীহ বুখারী: ১, সহীহ মুসলিম: ১৯০৭ – নিয়্যতের গুরুত্ব।
৪. বাদায়েউস সানায়ি (কাসানী), ৩/৯৪ – তালাকের শব্দের প্রসঙ্গ।
৫. আল-মাবসুত (সারাখসী), ৬/৪ – জিজ্ঞাসার ক্ষেত্রে তালাক না হওয়া।
৬. রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন), ৩/২৮৪ – ফতোয়ার নিয়তে উচ্চারণে তালাক না হওয়া।
৭. শারহে মুখতাসারিল উসল (তহাবী), ২/১৫৫ – তালাকে ইচ্ছার শর্ত।