কোরআন এর আয়াত নিয়ে ব্যঙ্গ করা নিয়ে

Faith and Belief · Hanafi

Question No: 3365
Questioner: MHMA
Question Asked: 01 Aug 2026, 02:39 PM
Reviewed & Published: 01 Aug 2026, 02:43 PM
Views: 21
Tokens: 4,761
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আমি একটা পোস্ট এ ইংরেজি তে একটা লেখা দেখছিলাম,লেখাটা বুঝতে পারছিলাম না তাই কোনো লেখা না বুঝলে মানুষ যে রকম অঙ্গ ভঙ্গি করে আমি সেইরকম মুখের অঙ্গভঙ্গি করেছিলাম।একটু চোখ,মুখ ভাঁজ করেচিলাম।পরে দেখি এটা কেরআনের আয়াত।তখন আমার ভয় লাগে, আমি কোরআনের আয়াত নিয়ে ব্যঙ্গ করলাম কি না।

Answer

কোরআনের আয়াত নিয়ে ব্যঙ্গ করা নিয়ে বিস্তারিত উত্তর

প্রশ্নের সারমর্ম

আপনি একটি ইংরেজি পোস্ট দেখে বুঝতে না পারায় স্বাভাবিকভাবেই মুখের অঙ্গভঙ্গি (চোখ-মুখ ভাঁজ) করেছিলেন। পরে জানতে পারেন সেটি ছিল কোরআনের আয়াত। এখন আপনার ভয় হচ্ছে—আপনি কি কোরআনের আয়াত নিয়ে ব্যঙ্গ করেছেন?

সরাসরি উত্তর

না, আপনার কাজটি কুরআনের আয়াত নিয়ে ব্যঙ্গ করা হয়নি। কেননা ব্যঙ্গ করার জন্য দুটি শর্ত প্রয়োজন: (১) জানা যে এটি আল্লাহর বাণী, এবং (২) সেটাকে হেয় বা তুচ্ছ করার নিয়ত। আপনার ক্ষেত্রে দুটোই ছিল না—আপনি জানতেন না এটি কুরআনের আয়াত, এবং আপনার উদ্দেশ্য ছিল না-বোঝার কারণে স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করা, কোনো অপমান করা নয়।

দলিল ও ফিকহি বিশ্লেষণ

১. নিয়তের গুরুত্ব

হাদিসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

إِنَّمَا الْأَعْمَالُ بِالنِّيَّاتِ وَإِنَّمَا لِكُلِّ امْرِئٍ مَا نَوَى "নিশ্চয়ই সকল কাজ নিয়তের ওপর নির্ভরশীল, এবং প্রত্যেক ব্যক্তি যা নিয়ত করে তার প্রতিদান পাবে।" (সহিহ বুখারী: ১; সহিহ মুসলিম: ১৯০৭)

এই নীতি অনুযায়ী, কোনো কাজের বিধান নির্ধারিত হয় নিয়তের ভিত্তিতে। আপনার নিয়ত ছিল না-বোঝার কারণে স্বাভাবিক মুখের ভাব তৈরি করা, কুরআনকে অপমান করা নয়। তাই আপনি অপরাধী হবেন না।

২. কুরআন নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রুপের শাস্তি

যারা জেনে-বুঝে কুরআনের আয়াত নিয়ে ঠাট্টা করে, তাদের সম্পর্কে আল্লাহ বলেন:

وَلَئِنْ سَأَلْتَهُمْ لَيَقُولُنَّ إِنَّمَا كُنَّا نَخُوضُ وَنَلْعَبُ ۚ قُلْ أَبِاللَّهِ وَآيَاتِهِ وَرَسُولِهِ كُنْتُمْ تَسْتَهْزِئُونَ "আর যদি আপনি তাদের জিজ্ঞেস করেন, তারা অবশ্যই বলবে, 'আমরা তো শুধু কথোপকথন ও খেলাধুলা করছিলাম।' আপনি বলুন, 'তোমরা কি আল্লাহ, তাঁর আয়াতসমূহ এবং তাঁর রাসূলকে নিয়ে ঠাট্টা করছিলে?'" (সূরা আত-তাওবা: ৬৫)

তবে এখানে মূল শর্ত হলো—যারা জানত যে এটি আল্লাহর আয়াত, তবুও ঠাট্টা করেছে। আর আপনি জানতেন না।

৩. অজ্ঞতা ও ভুলের ক্ষেত্রে ক্ষমা

আল্লাহ বলেন:

رَبَّنَا لَا تُؤَاخِذْنَا إِنْ نَسِينَا أَوْ أَخْطَأْنَا "হে আমাদের রব! আমরা ভুলে গেলে বা ভুল করলে আমাদেরকে পাকড়াও করবেন না।" (সূরা আল-বাকারা: ২৮৬)

হাদিসে আছে, আল্লাহ বলেছেন:

"আমি তা (ভুল ও ভুলে যাওয়ার অপরাধ) মাফ করে দিয়েছি।" (সহিহ মুসলিম: ১২৬)

৪. হানাফি ফিকহের উসুল

উসুল আল-ফিকহের মূলনীতি হলো:

العبرة في العقود والمقاصد لا بالألفاظ والمباني "চুক্তি ও কাজের ক্ষেত্রে প্রকৃত বিবেচ্য বিষয় হলো উদ্দেশ্য (নিয়ত), শুধু শব্দ বা বাহ্যিক রূপ নয়।" (উসুল আশ-শাশি, আল-হিদায়া)

ইবনে আবিদিন (রহ.) রদ্দুল মুহতারে লিখেছেন—কোনো শব্দ বা কাজ কুফরি হিসেবে গণ্য হবে কি না, তা নির্ভর করে সালিকের (কাজ সম্পাদনকারীর) বিশ্বাস ও নিয়তের ওপর। যদি কেউ অজ্ঞতাবশত বা না-জেনে এমন কিছু করে ফেলে যা দেখতে কুফরি মনে হয়, কিন্তু তার অন্তরে ঈমান ও সম্মান রয়েছে, তবে সে কাফির হবে না। (রদ্দুল মুহতার: ৫/৪৬৪)

৫. ফতোয়ায়ে উসমানি ও সমসাময়িক আলেমদের মত

মুফতি মুহাম্মদ তাকি উসমানি (দা.বা.) ফতোয়ায়ে উসমানিতে লিখেছেন—যে ব্যক্তি কুরআনের আয়াত বা ইসলামি বিধান নিয়ে বিদ্রূপ করে, সে যদি মুসলিম হয় এবং জেনে-শুনে তা করে, তবে তা কুফরি। কিন্তু যদি সে না জেনে বা ভুলে এমন কিছু করে থাকে, তাহলে তা কুফরি গণ্য হবে না; বরং তার তওবা করা উচিত। (ফতোয়ায়ে উসমানি: ১/১২৩)

৬. ইমদাদুল ফতোয়া

আশরাফ আলী থানভী (রহ.) ইমদাদুল ফতোয়ায় উল্লেখ করেছেন—কুফরি শব্দ বা কাজের বিচারে শুধু বাহ্যিক কাজ নয়, ভেতরের আকিদা ও নিয়তও দেখতে হবে। যার অন্তরে কুরআনের প্রতি সম্মান আছে, কিন্তু কখনো ভুলে বা না-জেনে এমন কিছু হয়ে গেছে, তাকে কাফির বলা যাবে না। (ইমদাদুল ফতোয়া: ৫/৩৭)

পণ্ডিতদের মতামত

ইমাম আবু হানিফা (রহ.) বলেছেন:

"আমি জানি না, এমন কোনো ব্যক্তি সম্পর্কে যে আল্লাহকে চেনে এবং তাঁর প্রতি ঈমান রাখে, সে কুফরি করবে—যতক্ষণ না সে জেনে-বুঝে এবং ইচ্ছাকৃতভাবে কুফরি করে।" (ফিকহুল আকবার, আল-ফিকহুল আবসাত)

শায়খ বাহাউদ্দিন যাকারিয়্যা (রহ.) বলেছেন:

"ভুল ও অজ্ঞতাবশত কোনো কাজ হয়ে গেলে আল্লাহ ক্ষমা করেন, যদি অন্তরে ঈমান বিদ্যমান থাকে।"

করণীয়

১. তওবা করুন — আপনাকে গুনাহগার বলা যাবে না, তবে কুরআনের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের জন্য তওবা করা ভালো। ২. কুরআনের আয়াত না বুঝলে সম্মানের সাথে আচরণ করুন — ভবিষ্যতে কোনো আরবি বা ইংরেজি লেখা বুঝতে না পারলে মুখে অবজ্ঞার ভাব প্রকাশ না করাই উত্তম। ৩. দোয়া করুন — আল্লাহর কাছে ক্ষমা চান এবং কুরআনের প্রতি আরও সম্মান প্রদর্শনের দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করুন।

সারসংক্ষেপ

আপনি কুরআনের আয়াত নিয়ে ব্যঙ্গ করেননি। কারণ আপনার নিয়ত ছিল না-বোঝার কারণে স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া দেখানো, এবং সেটি যে কুরআনের আয়াত তা আপনি তখন জানতেন না। ইসলামে বিচার করা হয় নিয়তের ভিত্তিতে। তাই আপনার ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই; তবে উত্তম হলো তওবা করা এবং ভবিষ্যতে সতর্ক থাকা।

নিশ্চয়ই আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। (সূরা আয-যুমার: ৫৩)


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.