ভেটেরিনারি কোর্সে প্রাণীর ছবি এঁকে বডি পার্টস চিহ্নিত করা জায়েজ কি?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
Answer
উত্তর
আলহামদুলিল্লাহি ওয়াসসালাতু ওয়াসসালামু ‘আলা রাসূলিল্লাহ।
আপনার প্রশ্ন: ভেটেরিনারি কোর্সে গরু, ছাগল, মুরগির ছবি এঁকে বডি পার্টস চিহ্নিত করতে হবে — পড়াশোনার প্রয়োজনে এভাবে প্রাণীর ছবি আঁকা জায়েজ কি?
সংক্ষিপ্ত উত্তর: শর্তসাপেক্ষে জায়েজ। অর্থাৎ, এটি যদি ভেটেরিনারি শিক্ষা ও পেশাগত প্রশিক্ষণের বাস্তব প্রয়োজন হয়, তাহলে হানাফি ফিকহের মূলনীতি অনুযায়ী এতটুকু ছবি আঁকা বা ব্যবহার করা জায়েজ আছে। তবে শুধু শখ, সৌন্দর্য, প্রদর্শনী বা অহেতুক কাজে প্রাণীর ছবি আঁকা নাজায়েজ।
১. মূল বিধান: প্রাণীর ছবি আঁকা নাজায়েজ
ইসলামে আত্মাযুক্ত প্রাণী এবং মানুষের ছবি আঁকা মৌলিকভাবে হারাম। হাদিসে ছবি নির্মাতাদের জন্য কঠোর শাস্তির কথা এসেছে।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: “যারা এই সব ছবি তৈরি করে, কিয়ামতের দিন তাদেরকে শাস্তি দেওয়া হবে এবং তাদের বলা হবে — তোমরা যা সৃষ্টি করেছ, তাতে প্রাণ দাও।”
(সহিহ বুখারি: ৫৯৬১; সহিহ মুসলিম: ২১০৮)
অন্য হাদিসে আছে:
“আল্লাহর সৃষ্টির সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারীর চেয়ে বড় যালিম আর কে?”
(সহিহ বুখারি: ৫৯৫৩)
হানাফি ফিকহের প্রামাণ্য গ্রন্থগুলোতেও আত্মাযুক্ত প্রাণীর ছবি আঁকাকে হারাম বলা হয়েছে। তবে ফুকাহায়ে কেরাম শিক্ষা, চিকিৎসা, নিরাপত্তা ইত্যাদি বাস্তব প্রয়োজনের ক্ষেত্রে সীমিত অনুমতি দিয়েছেন।
২. শিক্ষা ও চিকিৎসার প্রয়োজন দারুরার ন্যায়
কোরআন ও ফিকহের মূলনীতি হলো:
“তিনি তোমাদের উপর দ্বীনের ব্যাপারে কোনো সংকীর্ণতা রাখেননি।”
(সূরা হজ: ৭৮)
“আল্লাহ যা হারাম করেছেন, তা বিশদভাবে বর্ণনা করেছেন, তবে সে অবস্থা ছাড়া যাতে তোমরা বাধ্য হও।”
(সূরা আন‘আম: ১১৯)
ফিকহের বিখ্যাত কায়দা:
الضرورات تبيح المحظورات
“প্রয়োজন-অনিবার্যতা নিষিদ্ধ বিষয়কে জায়েজ করে দেয়।”
ভেটেরিনারি শিক্ষায় প্রাণীর শারীরস্থান (Anatomy), অস্ত্রোপচার প্রশিক্ষণ এবং বডি পার্টস চিহ্নিতকরণ এতটাই প্রয়োজনীয় যে, ছবি বা ডায়াগ্রাম ছাড়া তা শেখা প্রায় অসম্ভব। তাই এক্ষেত্রে এটিকে শরয়ী প্রয়োজন (হাজাত) বা দারুরা ধরা হবে। তবে এ অনুমতি কেবল পড়াশোনা ও রোগ নিরাময়ের সীমার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে।
৩. আধুনিক হানাফি ফকিহগণের মত
আধুনিক যুগে ফিকহের এই মূলনীতি প্রয়োগ করে অনেক হানাফি মুফতি বলেছেন:
- শুধু শখ বা নান্দনিক শিল্পকলার জন্য প্রাণীর ছবি আঁকা নাজায়েজ।
- কিন্তু মেডিকেল, ভেটেরিনারি, শারীরস্থান শিক্ষা, অস্ত্রোপচার প্রশিক্ষণ ইত্যাদির জন্য প্রাণীর ছবি আঁকা, ডায়াগ্রাম তৈরি করা এবং ব্যবহার করা জায়েজ।
ইমাম ইবনে আবিদীন রহ., ফাতাওয়ায়ে হিন্দিয়া বা আলমগিরি এবং পরবর্তী হানাফি ফকিহগণের আলোচনায় “প্রয়োজন সাপেক্ষে চিত্রের অনুমতি”র নীতিটি রয়েছে।
হজরত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী রহ., মুফতি মুহাম্মদ শফি রহ. এবং মুফতি তাকি উসমানি দামাত বারাকাতুহুম—সকলেই প্রয়োজনের ক্ষেত্রে সীমিত অনুমতির কথা বলেছেন।
মুফতি তাকি উসমানি হাফিজাহুল্লাহ কর্তৃক রচিত “আহকামুত তাসভীর” ও অন্যান্য ফতোয়ায় এসেছে—পড়াশোনা, চিকিৎসা ও প্রশিক্ষণের মতো প্রয়োজনে ছবি ব্যবহার করা নিষিদ্ধ নয়।
৪. করণীয় কিছু শর্ত
১. শুধু পড়াশোনা ও পরীক্ষার কাজে ছবি আঁকতে হবে।
২. ছবিগুলো প্রদর্শনী, শখ বা সৌন্দর্যের উদ্দেশ্যে দেওয়া যাবে না।
৩. ছবি আঁকার পর তা যেন অহেতুক ঘরে টানিয়ে রাখা বা সম্মান প্রদর্শনের বস্তু না হয়।
৪. বইয়ের ছবি ও ডায়াগ্রাম ব্যবহার করা সম্ভব হলে নিজে ছবি আঁকার দরকার নেই; তবে কোর্সে নিজে আঁকতে বাধ্য হলে বাস্তব প্রয়োজনে এতটুকু অনুমতি আছে।
৫. প্রয়োজনটি সততার সাথে হওয়া চাই; আল্লাহর সৃষ্টিকৌশলের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতার মনোভাব থেকে মন সম্পূর্ণ পবিত্র রাখতে হবে।
৫. বাস্তব সিদ্ধান্ত
যেহেতু আপনার কাজটি ভেটেরিনারি কোর্সের প্র্যাকটিক্যাল পরীক্ষার অংশ, এবং এ ছাড়া শিক্ষা সম্পন্ন করা কঠিন, তাই এটি জায়েজ। ইনশাআল্লাহ এতে কোনো গুনাহ নেই। তবে এতটুকুই যথেষ্ট; প্রয়োজন শেষ হলে অতিরিক্ত ছবি আঁকা যাবে না।
আল্লাহই সর্বজ্ঞ।
দলিল-প্রামাণ্য সূত্র:
- সহিহ বুখারি: ৫৯৫৩, ৫৯৬১
- সহিহ মুসলিম: ২১০৮, ২১১০
- সূরা হজ: ৭৮; সূরা আন‘আম: ১১৯
- ফাতাওয়ায়ে হিন্দিয়া/আলমগিরি
- রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন রহ.)
- ফাতাওয়া উসমানি (মুফতি তাকি উসমানি)
- জাওয়াহিরুল ফিকহ (মুফতি মুহাম্মদ শফি রহ.)
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (আশরাফ আলী থানভী রহ.)