শরীরের সব জায়গার লোম কি ফেলে দেয়া হালাল আছে?

Miscellaneous Fiqh · Hanafi

Question No: 3292
Questioner: Suraiya Akter
Question Asked: 31 Jul 2026, 11:27 AM
Reviewed & Published: 31 Jul 2026, 01:40 PM
Views: 7
Tokens: 5,879
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম। শরীরের সব জায়গার লোম কি ফেলে দেয়া হালাল আছে?

Answer

উত্তর: وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته।

শরীরের সব জায়গার লোম ফেলে দেওয়া হালাল কি না—এর উত্তরে প্রথমে মূলনীতি হলো: ইসলামের দৃষ্টিতে শরীরের লোম অপসারণের ব্যাপারে বিস্তারিত হুকুম রয়েছে। সব জায়গার লোম ফেলা যাবে এমনটি সাধারণভাবে বলা ঠিক নয়; আবার সব লোম ফেলা নাজায়েজও নয়। বরং কিছু লোম ফেলা সুন্নত/মুস্তাহাব, কিছু লোম ফেলা হারাম বা মাকরূহে তাহরিমি, আর বাকিগুলো জায়েয


১. যে লোম ফেলা সুন্নত বা মুস্তাহাব (উৎসাহিত করা হয়েছে)

এই লোমগুলো ফেলা সুন্নত এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার অংশ। এগুলো ৪০ দিনের বেশি রাখা মাকরূহ।

  • নাভির নিচের লোম (শেয়ার/নাভির নিচ হতে চারপাশের লোম) — অর্থাৎ শারীরিক গোপনাঙ্গের চারপাশের লোম।
  • বগলের লোম

দলিল: হজরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন:

«وَقْتُ لَنَا فِي قَصِّ الشَّارِبِ وَتَقْلِيمِ الأَظْفَارِ وَحَلْقِ الْعَانَةِ وَنَتْفِ الإِبْطِ أَنْ لَا نَتْرُكَ أَكْثَرَ مِنْ أَرْبَعِينَ لَيْلَةً» "আমাদের জন্য নির্ধারিত করা হয়েছে—গোঁফ কাটা, নখ কাটা, নাভির নিচের লোম কামানো এবং বগলের লোম উপড়ে ফেলা—যেন তা ৪০ রাতের বেশি না রাখা হয়।" (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৫১৮; সুনানে নাসাঈ; মুসনাদে আহমাদ)

এছাড়া হাদিসে পাঁচটি স্বভাবগত সুন্নতের কথা এসেছে—খাতনা, নাভির নিচের লোম কামানো, গোঁফ ছোট করা, বগলের লোম তুলে ফেলা এবং নখ কাটা।
(সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৮৯১; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৫১৮)

হানাফি ফিকহের নির্ভরযোগ্য কিতাব:

  • আল-হিদায়াহফাতাওয়া আলমগিরি-তে আছে, «الاستحداد» (নাভির নিচের লোম কামানো) এবং «نتف الإبط» (বগলের লোম তোলা) সুন্নত।
  • রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন): ৪০ দিনের বেশি চুল/লোম রাখা মাকরূহ।
    (রদ্দুল মুহতার, ১/৩৩৯; ফাতাওয়া আলমগিরি, ৫/৩৫৮)

২. যে লোম ফেলা হারাম বা নাজায়েয

ক. পুরুষের দাড়ি মুণ্ডন করা / সম্পূর্ণ কামানো — হারাম

  • পুরুষের জন্য দাড়ি রাখা ওয়াজিব এবং দাড়ি মুণ্ডন করা হারাম ও কবিরা গুনাহ
  • রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন:

«أَعْفُوا اللِّحَى وَأَحْفُوا الشَّوَارِبَ» "তোমরা দাড়ি লম্বা কর এবং গোঁফ ছোট কর।" (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৮৯২; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৫৫৯)

  • দাড়ি মুণ্ডনকারীর প্রতি হাদিসে লানতের কথা এসেছে। যারা দাড়ি মুণ্ডন করে কিংবা নারীর সাদৃশ্য অবলম্বন করে তাদের প্রতি অভিসম্পাত করা হয়েছে।
  • হানাফি ফিকহ: দাড়ি মুণ্ডন করা (কামানো) হারাম, আর উপড়ে ফেলা আরও কঠিন গুনাহ।
    (ফাতাওয়া আলমগিরি, ৫/৩৫৮; রদ্দুল মুহতার, ২/৪১৮; ইমদাদুল ফাতাওয়া, ৪/১৭৫)

খ. ভ্রু চেঁছে ফেলা বা পাতলা করার জন্য উপড়ানো (নামাস/নমস) — হারাম

  • নারী-পুরুষ নির্বিশেষে ভ্রুর লোম উপড়ে ফেলা বা এতটুকু চেঁছে ফেলা হারাম, যদি তা সৌন্দর্যের জন্য হয়।
  • হাদিসে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন:

«لَعَنَ اللَّهُ الْوَاصِلَةَ وَالْمُسْتَوْصِلَةَ وَالْوَاشِمَةَ وَالْمُسْتَوْشِمَةَ وَالنَّامِصَةَ وَالْمُتَنَمِّصَةَ» "আল্লাহ তাআলা লানত করেছেন—পরচুলা সংযোগকারী ও করণীয়, উল্কি অঙ্কনকারী ও করণীয় এবং ভ্রু উপড়ানোকারী ও করণীয় নারীকে।" (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২১২৫; আবু দাউদ, হাদিস: ৪১৬৯)

  • ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) বলেছেন: ভ্রু উপড়ানো এবং এমন স্থানের লোম তোলা যা সাধারণত থাকে না—তা হারাম। তবে যদি কোনো নারীর ভ্রু এত বেশি হয় যে দেখতে কুৎসিত লাগে এবং স্বামী বা নারী নিজে অস্বস্তিতে থাকে, তাহলে সীমিত পরিমাণে অপসারণের অনুমতি নিয়ে হানাফি ফিকহে মত রয়েছে। কিন্তু সাধারণ সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য ভ্রু তোলা হারাম
    (রদ্দুল মুহতার, ৬/৩৭৩; ফাতাওয়া উসমানি, ২/৫৯৪)

গ. চেহারার লোম (নারীর ক্ষেত্রে) — বিস্তারিত হুকুম

  • নারীর জন্য চেহারার লোম ফেলা: যদি স্বামী অনুমতি দেয় বা নারী সাজসজ্জার জন্য চেহারার সূক্ষ্ম লোম ফেলে, তবে হানাফি মতে তা জায়েয আছে; তবে ভ্রু এবং পলকের লোম তোলা হারাম (উপরের হাদিসের আলোকে)।
  • ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ (রহ.) এর মতে চেহারার লোম ফেলাতে দোষ নেই যদি তা সাজসজ্জার জন্য হয়।
  • ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) নিজের ফতোয়ায় লিখেছেন: নারীর জন্য চেহারার লোম তোলা যাবে যদি স্বামী খুশি হয়।
    (রদ্দুল মুহতার, ১/৪০৬; ফাতাওয়া উসমানি, ২/৫৮১)

৩. শরীরের বাকি লোম (হাত-পা, বুক, পেট, পিঠ, কাঁধ ইত্যাদি) ফেলা — জায়েয

  • শরীরের অন্যান্য লোম, যেমন—হাতের লোম, পায়ের লোম, বুকের লোম, পেটের লোম, পিঠের লোম, কাঁধের লোম—ফেলা জায়েয, তাতে কোনো গুনাহ নেই।
  • তবে এই লোমগুলো ফেলা জরুরি/ওয়াজিব নয়। এটি সাধারনত পরিচ্ছন্নতা ও সৌন্দর্যের জন্য করা হয়। ইসলাম এতে বাধা দেয়নি, উত্তম পদ্ধতিতে করার নির্দেশ দিয়েছে।
  • আল-হিদায়াহফাতাওয়া আলমগিরি-তে বলা হয়েছে: শরীরের যেকোনো জায়গার লোম ফেলা জায়েয, তবে প্রশ্নবিদ্ধ স্থান (ভ্রু, দাড়ি) ছাড়া।
    (ফাতাওয়া আলমগিরি, ৫/৩৫৯)

মোটকথা: শরীরের সব লোম ফেলা হালাল বলা যাবে না; বরং কিছু ফেলা সুন্নত, কিছু ফেলা হারাম, বাকি লোম ফেলা জায়েয


সংক্ষিপ্ত সারসংক্ষেপ (টেবিল আকারে):

| শরীরের জায়গা | হুকুম | |---|---| | নাভির নিচে (শেয়ার) ও বগলের লোম | সুন্নত/মুস্তাহাব—ফেলতে হবে, ৪০ দিনের বেশি রাখা মাকরূহ | | পুরুষের দাড়ি মুণ্ডন করা | হারাম | | ভ্রু উপড়ানো (নামাস) | হারাম (স্বামীর খুশির জন্য নারীর ভ্রু না তোলা; প্রয়ােজনে সীমিত তোলা নিয়ে মতভেদ আছে) | | চেহারার সূক্ষ্ম লোম (নারীর) | জায়েয যদি স্বামী খুশি হয় (ভ্রু ছাড়া) | | হাত-পা, বুক, পেট, পিঠের লোম | জায়েয (ফেলা যাবে) | | পা ও হাতের লোম ফেলা | জায়েয |


দলিল-ভিত্তিক হানাফি কিতাবের উল্লেখ:

  • সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম — দাড়ি, গোঁফ, নখ, নাভির নিচের লোম, বগলের লোম সংক্রান্ত হাদিস।
  • আল-হিদায়াহ, ১/৩০ (তাহারাত অধ্যায়) — ফিতরাহ সংক্রান্ত।
  • ফাতাওয়া আলমগিরি (ফাতাওয়া হিন্দিয়্যাহ), ৫/৩৫৮-৩৫৯ — লোম অপসারণের হুকুম।
  • রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন), ১/৩৩৯, ২/৪১৮, ৬/৩৭৩ — লোম অপসারণের বিস্তারিত মাসআলা।
  • ইমদাদুল ফাতাওয়া (মুফতি রশিদ আহমাদ গাঙ্গুহি) — দাড়ি মুণ্ডন হারাম; শরীরের লোম জায়েয।
  • ফাতাওয়া উসমানি (মুফতি তাকি উসমানি) — ২/৫৮১-৫৯৪ — নারী-পুরুষের লোম ফেলার মাসআলা।
  • মা'আরিফুল কুরআন (মুফতি মুহাম্মদ শফি) — দাড়ি ও নামাস সংক্রান্ত ব্যাখ্যা।
  • বাহিশ্তি জেওর (মাওলানা আশরাফ আলী থানভি) — পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও লোম অপসারণের মাসআলা।

উপরোক্ত আলোচনা থেকে স্পষ্ট: সাধারণভাবে শরীরের সব লোম ফেলে দেওয়া গুনাহ নয়, বরং কিছু নির্দিষ্ট স্থানের লোম ফেলা সুন্নত (যেমন—বগল, নাভির নিচে), কিছু স্থানের লোম ফেলা হারাম (পুরুষের দাড়ি, ভ্রু), এবং বাকিগুলো ফেলা জায়েয। তবে ভদ্রতা ও পরিচ্ছন্নতা রক্ষার পাশাপাশি শরিয়তের সীমারেখা মেনে চলা প্রত্যেক মুসলিমের কর্তব্য।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সঠিক বুঝ দান করুন। (আমীন)



This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.