ডিভোর্সড পেপারে মাধ্যমে তালাক প্রদান সংক্রান্ত
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
বেয়াদবি ক্ষমা করবেন। আমি একটা বিপদের মধ্যে আছি। না বুঝে একটা ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিলাম। এখন সেটার সঠিক সমাধান পাচ্ছি না বলে আপনার দারস্থ হয়েছি। দয়া করে আপনি আমাকে এর একটা সঠিক সমাধান বলে দিন।
*স্বামীর বক্তব্য ছিল*
এই কাগজটা রেডি করে পাঠাই নাই, যখন রেডি করি তখন কাজী সাবকে বলছিলাম যে আমি না বলার আগ পর্যন্ত এটা পাঠাবেন না। কারণ যদি সে ঠিক হয়ে চলে আসে তাহলে তা বাতিল। কারণ আমার বাড়ি ছিল দুরে তাই এখানে এটা রেডি করে রেখে গেছিলাম এবং কাজী সাহেবকে বলছি যে যদি সে ঠিক হয়ে যায় তাহলে এটা বাতিল হবে, যদি সে ফিরে না আসে তাহলে তা পতিত হবে এটা আমি কাজীকে বলে তার পর সাইন করি, এবং তাকে বললাম তিন মাসের ভিতর যদি এটা সমাধান হয়ে যায় তাহলে তা বাতিল হবে তো? তখন কাজী বলছে যে হ্যাঁ তা বাতিল হবে। তো সে নিচের লেখাটা পড়ে শুনালেন যে মিলে গেলে বা সমাধান হলে বাতিল হবে এবং নিচে লিখা দেখলাম যে উক্ত তালাক ৯০ দিন পর কার্যকর হবে আর আমি তাই ভাবি যে আচ্ছা তাহলে সমস্যা নেই ৯০ পর যদি কার্যকর হয় আর তার ভিতর ফিরে আসে তাহলে সমস্যা নেই এবং আমি তাই মনে করে সাইন করি, যে সে যদি তিন মাসের ভিতর ফিরে আসে তাহলে আমার এটা পতিত হবে না। এরপর আমরা মিলে যাই এবং সে ফিরে আসে।
*স্ত্রীর বক্তব্য ছিল*
আমার স্বামী প্রথমে একটা নোটিশ লিখে কিন্তু ওটা নাকি এমনিতেই করছিল। নোটিশ আমার কাছে পৌছায়নি, তারপর দেড়মাস হলো পারিবারিকভাবে সবাই বসে কাগজপত্রে বিষয়টা মীমাংসা করে কিন্তু তার আর আমার মধ্যে কিছু অভিমান এমন ছিল যে সে যদি আমাকে বলে চলে যেতে তাহলে আমি চলে যাবো অথবা যদি আমি ক্ষমা চাই তাহলে সে আবার সব ঠিক করে নিবে। কিন্তু কেউ এটা করি নাই, পরে নির্দিষ্ট তারিখে সবাই বসে আমার কাবিনের টাকা শোধ করে কাগজে সাইন করি, সাইন করার সময় তার লেখা ছিল তিন মাসের মধ্যে মিল হলে বিবাহ হলে তালাক বাতিল, আর মুখে কোন শব্দ উচ্চারণ করে নাই, এমনকি মন থেকে তিন তালাকের নিয়তও ছিল না।
*নোটিশের বক্তব্য হুবহু নিম্মরূপ ছিল:
স্বামী কর্তৃক তালাকের নোটিশ
স্মারক নংঃ
তারিখ: ০৩/০৩/২০২৬
প্রাপক:
মেয়র / চেয়ারম্যান
ভাটিয়া ..... সিটি করপোরেশন/পৌরসভা/ইউনিয়ন পরিষদ।
জাটিয়া
প্রেরক:
থানা: ইশ্বরগঞ্জ
জেলা: ময়মনসিংহ
মোঃ নাঈম মিয়া, পিতাঃ মোঃ হাবিবর রহমান,মাতা, নূর জাহান, গ্রাম/হোল্ডিং/রোডঃ বালাশ্রম, উপজেলা: ইশ্বরগঞ্জ, জেলাঃ ময়মনসিংহ।
বিষয়: স্বামী কর্তৃক তালাকে বাইন প্রদান প্রসঙ্গে।
জনাব,
আপনার সদয় অবগতি ও কার্যার্থে এই মর্মে জানানো যাইতেছে যে, আপনার এলাকার মোছাঃ মারিয়া আক্তার, পিতাঃ রুবেল মিয়া, মাতাঃ নাছিমা আক্তার, গ্রাম/হোল্ডিং/রোড: কুমারুলী, ডাকঘর: ভাটিয়া, উপজেলা: ইশ্বরগঞ্জ, জেলা: ময়মনসিংহ। বর্তমানে সে আমার স্ত্রী তাহার সহিত বিগত ০৬/০৬/২৪ই ইং তারিখে রেজিস্ট্রিকৃত কাবিন নামা/ইসলামী শরিয়ত মোতাবেক/স্থানীয় মৌলভী, ইমাম দ্বারা /নোটারী মূলে মহরানা ১,০০০০০ টাকা ধার্য করিয়া বিবাহ সম্পন্ন হয়। কিন্তু আপনি নিম্নোক্ত শর্তাবলী ভঙ্গ করিয়াছেন, যথাঃ নির্যাতন নিপীড়ন, অজিজ্ঞাসা, স্ত্রী কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ ব্যতীত তিন বছর যাবৎ দাম্পত্য দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে, স্ত্রী দুই বছর ধরে মানসিক পাগল, নেশাগ্রস্থ থাকিলে, মারাত্মক ব্যাধিতে আক্রান্ত হলে, স্ত্রী বিবাহে অস্বীকার করিলে, ১৯৬১ সনের মুসলিম পারিবারিক আইনের বিধান লংঘন (কাবিন নামার ১৮ নং ক্রমিকে বর্ণিত শর্তের ক্ষমতা বলে) বা বিবিধ / বিশেষ যৌক্তিক কারনে তার সাথে সুস্থ্য দাম্পত্য সংসার জীবন পালন করা আমার জন্য নিরাপদ/সম্ভব নহে। তাই আমি স্ব-ইচ্ছায়, সুস্থ স্বজ্ঞানে, অন্যের বিনা প্ররোচনায় বসা-দাঁড়ানো অবস্থায় তালাকের ক্ষমতাবর্তী হইয়া নিম্ন বর্ণিত সনাক্তকারী/ স্বাক্ষীর উপস্থিতিতে নিজ শরীরের উপর ১, ২, ৩ তালাকে বায়েন প্রদান পূর্বক যাহা ১৮৭৬ ইং সালের ১নং আইনের ৬ ধারা ও ১৯৬১ ইং সনের মুসলিম পরিবারিক আইন অর্ডিন্যান্সে (৮ম অর্ডিন্যান্স) এর ৭ম ধারার (১) উপ ধারা অনুযায়ী আপনার জ্ঞাতার্থে অত্র নোটিশ প্রদান করা হইল। তালাক ঘোষণা সংশিষ্ট ব্যক্তিকে নিজ উদ্যোগে নোটিশ মারফত অবহিত করিব এবং গৃহিত তালাক সংশ্লিষ্ট কাজী অফিসে রেজিস্ট্রি করিব।
স্বাক্ষী ও সনাক্ত কারীর স্বাক্ষর
১। আ: ছালিম
২। জামাল
সম্পর্ক
নাইম নোটিশ দাতার স্বাক্ষর/ টিপ সহি।
সাক্ষর: নাঈম
মোবাইল: ০১৯*********
অনুলিপি অবগতি ও কার্যার্থে প্রেরিত হইলঃ
* মেয়র/চেয়ারম্যান
*স্ত্রী/অভিভাবক
* অফিস কপি
মাওনা চৌরাস্তা, শ্রীপুর পৌরসভা, গাজীপুর-কাজী অফিস নোট (মতামত)ঃ
বিধি মোতাবেক নোটিশ প্রাপ্তির ৯০ দিনের মধ্যে স্বামী স্ত্রীর আপোষ মিমাংসার সুযোগ রহিয়াছে। সংশ্লিষ্ট শালিশী পরিষদ (মেয়র/চেয়ারম্যান মহোদয়) আপনার আবেদনের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করিতে পারেন। তালাক দাতা তালাকের ঘোষনা ও কার্যার্থে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে অবহিত করনের জন্য উপরোক্ত আইনের বিধি মোতাবেক অত্র নোটিশ প্রেরণ করিবেন। তাহার আবেদনের ভিত্তিতে ইহা রেজিষ্টি সংক্রান্ত গৃহীত হইল। তাহার এন্ট্রি বই নং ও বালাম নং-.. ०३/२७ १००
কাজী অফিস
কাজী মোঃ ইসলাম
মোবাঃ *******
****
১. এখন উক্ত নোটিশ অনুযায়ী তালাক হবে কিনা? তালাক হলেও কত তালাক হবে?
২. এক পক্ষ থেকে সমাধান এসেছে নোটিশে "নিজের শরীরের উপর....." অংশ দ্বারা স্বামীকে নিজেকে তালাক দিচ্ছে আর স্বামী তালাকের মহল না, তাই কোনপ্রকার তালাক হবে না। এটা সঠিক কিনা?
৩. অপর এক পক্ষ থেকে সমাধান এসেছে, যারা বলে তালাক হবে না - তাদের বক্তব্য ভুল, বাস্তবতা, শরঈ নস এবং আকল তথা যুক্তির বিরোধী। তাদের দলিল হলো, স্বামী তার স্ত্রীকে তালাকের নোটিশ লিখতে বলেছে এটা সুস্পষ্ট, স্ত্রীর নাম-ঠিকানা এবং তালাকের বিষয়ও সুস্পষ্ট এবং স্বামী এটাও এক বক্তব্যে বলেছিল কাজীকে ভীতিপ্রদর্শন করবে আবার বলেছিল ৯০ দিন পর যাতে তালাক কার্যকর হয় সেই ব্যবস্থা যেন থাকে। এ কথার পরে কাজী রাষ্ট্রীয় আইনের ৯০ দিনের বিষয়ও স্বামীকে জানিয়েছেন। সুতরাং এখানে স্বামীর বক্তব্য দ্বারা পরিষ্কার বুঝা যাচ্ছে স্ত্রীকে তালাক প্রদান করা হয়েছে। নিজ শরীরের উপর অংশটুকু হয় লিখার ভুল অথবা এটা দ্বারা স্ত্রীর শরীরের উপর তালাক নির্দেশ করে। কেননা, সেখানেও তালাক প্রদানের কথা লেখা আছে। কাজী স্বামীর কথা মোতাবেক "স্বামী কর্তৃক তালাক" (যা নোটিশের উপরে বড় বড় অক্ষরে লেখা রয়েছে) এর নোটিশ ইস্যু করেন, যে নোটিশে স্পষ্ট করে বিষয়ও লেখা রয়েছে "স্বামী কর্তৃক তালাকে বায়েন প্রদান প্রসঙ্গে" আর “প্রদান” বলতে সাধারণভাবে বোঝায় কোনো কিছু কাউকে দেওয়া, হস্তান্তর করা বা সরবরাহ করা। ফিকহের ভাষায়ও “প্রদান” মানে হলো এক পক্ষ থেকে অন্য পক্ষের কাছে কোনো অধিকার, বস্তু বা দায়িত্ব হস্তান্তর করা। তালাকনামায়ও “প্রদান” বলতে সাধারণত বোঝায় স্ত্রীর উপর তালাক কার্যকর করা বা তালাক দেওয়ার বিষয়টি জারি করা।
এই পক্ষের দলিল হচ্ছে, তালাকের ভয় দেখানোর উদ্দেশ্যে সাক্ষী ছাড়া তালাকনামা প্রস্তুত করলে তালাক হবে। তালাকের বানান ভুল বা বিকৃতি করলেও তালাক হবে। কেউ যদি বলে, আমি ইচ্ছে করে ভুল লিখেছি যেন তালাক না পড়ে, তবুও কাযাআন তালাক হয়ে যাবে। তাদের মতে, এই নোটিশ কিতাবাত মুস্তাবিনার অন্তর্ভুক্ত। অর্থাৎ এটি মুস্তাবিনা মারসুমা (সুস্পষ্ট আনুষ্ঠানিক লেখা)। যেখানে স্ত্রীর নাম, তার পিতামাতার নাম, ঠিকানা এবং বিষয় সুস্পষ্ট লেখা রয়েছে।
এই পক্ষের যুক্তি হলো, স্বামী যদি নিজেকেই তালাক দিবে তাহলে স্ত্রীর নাম-ঠিকানা কেন লিখলো? কেন কাজীকে ৯০ দিনের মাঝে মীমাংসা না হলে তালাক হবে এরকম কথা বললো? অর্থাৎ এসব দলিলের ভিত্তিতে স্ত্রীর উপর তিন তালাকে মুগাল্লাযা পতিত হয়ে গেছে। এটা কতটুকু সঠিক জানাবেন।
অনেক পেরেশানির মধ্যে আছি হুজুর। দয়া করে আমাকে সঠিক সমাধান জানিয়ে উপকৃত করবেন।
Answer
*ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম*
উত্তর:
তালাক দেওয়ার অধিকার শুধু স্বামীর।
হাদীস শরীফে এসেছে-
عَنْ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ أَتَى النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم رَجُلٌ فَقَالَ يَا رَسُولَ اللهِ إِنَّ سَيِّدِي زَوَّجَنِي أَمَتَهُ وَهُوَ يُرِيدُ أَنْ يُفَرِّقَ بَيْنِي وَبَيْنَهَا قَالَ فَصَعِدَ رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم الْمِنْبَرَ فَقَالَ يَا أَيُّهَا النَّاسُ مَا بَالُ أَحَدِكُمْ يُزَوِّجُ عَبْدَهُ أَمَتَهُ ثُمَّ يُرِيدُ أَنْ يُفَرِّقَ بَيْنَهُمَا إِنَّمَا الطَّلَاقُ لِمَنْ أَخَذَ بِالسَّاقِ
ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক ব্যক্তি নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর নিকটে এসে বললো, হে আল্লাহর রসূল! আমার মনিব তাঁর বাদীকে আমার সাথে বিবাহ দিয়েছে। এখন সে আমার আর আমার স্ত্রীর মধ্যে বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটাতে চায়। রাবী বলেন, রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মিম্বারে আরোহণ করলেন, অতঃপর বললেন, হে লোকসকল! তোমাদের কারো এরূপ আচরণ কেন করো যে, সে তার গোলামের সাথে তার বাদীর বিবাহ দেয়, অতঃপর তাদের বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটাতে চায়? নারীর ঊরু স্পর্শ করা যার জন্য বৈধ, তালাকের অধিকার তার। [সুনানে ইবনে মাজাহ ২০৮১]
, হাদীস শরীফে এসেছে-
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم " ثَلاَثٌ جِدُّهُنَّ جِدٌّ وَهَزْلُهُنَّ جِدٌّ النِّكَاحُ وَالطَّلاَقُ وَالرَّجْعَةُ " . قَالَ أَبُو عِيسَى هَذَا حَدِيثٌ حَسَنٌ غَرِيبٌ .
আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তিনটি বিষয় এমন যেগুলির যথার্থ তো যথার্থই এমনকি সেগুলোর কৌতুকের ব্যবহারও যথার্থ: বিবাহ, তালাক, রাজআত। - ইবনু মাজাহ ২০৩৯, তিরমিজী হাদিস নম্বরঃ ১১৮৫ ইমাম আবূ ঈসা (রহঃ) বলেন, এই হাদীসটি হাসান-গারীব।
★শরীয়তের বিধান অনুযায়ী মহিলা নিজের উপর কেবল তখনি তালাক পতিত করতে পারবে, যদি স্বামী তাকে তালাক দেবার অধিকার দিয়ে থাকে। এটি নিকাহ নামার ১৮ নং ধারাতে হ্যাঁ লেখার মাধ্যমেই হোক, বা পরবর্তীতে মৌখিক বা লিখিত ভাবেই হোক। সুতরাং স্বামী যদি স্ত্রীকে তালাকের ক্ষমতা প্রদান করে, আর স্ত্রী স্বামী কর্তৃক তালাকে তাভবিজের ক্ষমতাবলে লিখিত বা মৌখিকভাবে নিজের নফসের উপর তালাক দিয়ে দিলে সেটি পতিত হয়ে যাবে।
★ সু-প্রিয় প্রশ্নকারী দ্বীনী ভাই/বোন!
প্রশ্নোক্ত ক্ষেত্রে তালাক হয়েছে কি না জানতে হলে সরাসরি ডিভোর্সড পেপার দেখার ও স্বামী-স্ত্রীর বিস্তারিত বক্তব্য শোনার প্রয়োজন। ডিভোর্সড পেপারে কি শব্দে তালাক লেখা ছিলো? স্বামী মুখে কী কী শব্দ বলে তালাক দিয়েছেন? ইত্যাদি বিষয়ে অস্পষ্টতা থাকায় বিস্তারিত উত্তর দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। তাই তালাকনামা নিয়ে নিকটস্ত কোনো নির্ভরযোগ্য ইফতা বিভাগে সরাসরি যোগাযোগ করার জন্য অনুরোধ করা হলো।