বিয়ের আগের গুনাহ নিয়ে স্বামী প্রশ্ন করলে কী করণীয়?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
কেউ যদি হারাম সম্পর্কে থাকে এবং তওবা করে ফিরে এসে নিজেকে শুধরে নিয়ে অন্যএ বিয়ে করে তখন যদি সেই স্বামী তাকে জিজ্ঞেস করে যে," বিয়ের পূর্বে কোন হারাম সম্পর্কে জড়িয়ে ছিলা কিনা" তখন কি উওর দেওয়া উচিত??
সত্য কথা বললে তো গুনাহ প্রকাশ করা হলো এবং তখন স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কটাও খারাপ হতে পারে। আবার মিথ্যা বলাও তো জায়েজ নয়। এক্ষেত্রে করণীয় কী??
Answer
ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।
আপনার প্রশ্নের জন্য জাযাকাল্লাহ। এটি একটি অত্যন্ত বাস্তবসম্মত ও সূক্ষ্ম ফিকহি সমস্যা। সংক্ষেপে বললে, সরাসরি সত্য বলা জায়েজ নয়, আবার সরাসরি মিথ্যা বলাও উত্তম নয়। বরং করণীয় হলো প্রশ্নটি এড়িয়ে যাওয়া বা এমন উত্তর দেওয়া যাতে সত্য গোপন থাকে কিন্তু মিথ্যাও বলা হয় না (তওরিয়া)।
১. গুনাহ প্রকাশ করা হারাম
আপনি ঠিকই মনে করছেন যে, অতীতের গুনাহ অন্য কাউকে বললে তা “প্রকাশ করা” হয়ে যায়, যা কুরআন-হাদিসে নিষিদ্ধ।
-
কুরআন: আল্লাহ তাআলা বলেন,
“নিশ্চয়ই যারা পছন্দ করে যে, ঈমানদারদের মধ্যে অশ্লীলতা প্রসিদ্ধ হোক, তাদের জন্য পৃথিবী ও আখিরাতে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি রয়েছে।” (সূরা আন-নূর: ১৯) -
হাদিস: রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,
“আমার উম্মতের প্রত্যেককেই ক্ষমা করা হবে, তবে গুনাহ প্রকাশকারী ব্যতীত। আর গুনাহ প্রকাশ হলো—কেউ রাতে গুনাহ করে, আল্লাহ তা গোপন রাখেন, কিন্তু সকালে সে নিজেই বলে, ‘হে অমুক! আমি আজ রাতে এমন কাজ করেছি।’ অথচ তার রব সারা রাত তার গুনাহ গোপন রেখেছিলেন, কিন্তু সে সকালে আল্লাহর পর্দাই উন্মোচন করে দিল।” (সহিহ বুখারি: ৬০৬৯; সহিহ মুসলিম: ২৯৯০)
অর্থাৎ, সত্য বলার মাধ্যমে নিজের গুনাহ স্বামীর কাছে প্রকাশ করা—এটি নিজেই একটি বড় গুনাহ এবং হারাম। তাই কখনোই স্পষ্টভাবে বলা উচিত নয়।
২. মিথ্যা বলা থেকে বাঁচার উপায়: ‘তওরিয়া’
মিথ্যা বলা হারাম, তবে ইসলামে “তওরিয়া” বৈধ। অর্থাৎ, এমন অস্পষ্ট কথা বলা বা এমন উত্তর দেওয়া যার জাহিরি অর্থ ভিন্ন, কিন্তু আসল অর্থ সত্য—তাতে মিথ্যা বলা হয় না।
হাদিসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, “যুদ্ধ, সন্ধি স্থাপন এবং স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সম্প্রীতি স্থাপন করা ব্যতীত অন্য কোথাও মিথ্যা বলা জায়েজ নয়।” (সুনানে আবু দাউদ: ৪৯২১; সুনানে তিরমিজি: ১৯৩৯)
তবে স্বামীর প্রশ্নের ক্ষেত্রে সরাসরি মিথ্যা না বলে তওরিয়া করাই উত্তম। যেমন স্বামী যদি প্রশ্ন করেন, “তুমি কি বিয়ের আগে কোনো হারাম সম্পর্কে ছিলে?” তখন বলবেন:
- “আমি আল্লাহর কাছে তওবা করেছি। আল্লাহ তওবাকারীকে ভালোবাসেন। যা হয়েছে তা আল্লাহ মুছে দিয়েছেন। এখন আমি নতুন জীবন শুরু করেছি।”
- অথবা বলুন, **“অতীত নিয়ে আমার কাছে প্রশ্ন করবেন না। কারোর অতীত নিয়ে প্রশ্ন করতে নেই।
- অথবা চুপ থেকে প্রসঙ্গ পরিবর্তন করুন অথবা বলুন, “এমন কথা বলার প্রয়োজন নেই/এ নিয়ে কিছু বলব না।”
এভাবে আপনি সত্য কথাটাই বলছেন—যে আপনি তওবা করেছেন এবং আল্লাহ আপনাকে পবিত্র করেছেন—অথচ কোনো গুনাহ প্রকাশ হলো না, মিথ্যাও বলা হলো না। এটি শরিয়তের সবচেয়ে মার্জিত সমাধান।
৩. হানাফি ফিকহের নির্দেশনা
হানাফি ফিকহের প্রসিদ্ধ গ্রন্থ রদ্দুল মুহতার এবং ফতোয়া আলমগিরিতে এই মূলনীতি বর্ণিত আছে যে, যদি সত্য বলার কারণে ফাসাদ বা ক্ষতি হয়, আর মিথ্যা না বলে উপায় থাকে, তবে তওরিয়া করা জায়েজ। আর গুনাহ প্রকাশ করা যে হারাম, তা স্পষ্টভাবে বর্ণিত।
আমাদের প্রিয় মুফতীয়ানে কেরাম (যেমন: মুফতি মুহাম্মদ শফি, মুফতি তাকি উসমানি) বলেছেন, তওবার পর গুনাহ নিয়ে আলোচনা করা—তা স্বামীর সাথে হোক বা অন্য কারো সাথে—জায়েজ নয়। একান্ত প্রয়োজন না হলে অতীতের কথা কাউকে জানানো যাবে না। আর একান্ত প্রয়োজন হলে মিথ্যা না বলে তওরিয়া বা অস্পষ্ট উত্তরের আশ্রয় নেওয়া যাবে।
৪. তওবার পর আল্লাহর ক্ষমা — নিশ্চিন্ত থাকুন
আপনি তওবা করে সুন্দরভাবে জীবন শুরু করেছেন। আল্লাহ কুরআনে বলেছেন:
“বলুন, হে আমার বান্দারা! যারা নিজেদের ওপর জুলুম করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয় আল্লাহ সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করে দেন।” (সূরা আয-যুমার: ৫৩)
তওবা করলে আল্লাহ গুনাহকে এমনভাবে মুছে দেন যে যেন তা কখনো ঘটেইনি। তাই অতীত নিয়ে দুশ্চিন্তা না করে ভবিষ্যতের দিকে মন দিন। স্বামী যদি জিজ্ঞেস করেন, তবুও আপনাকে অতীতের কথা বলতে হবে না। মনে রাখবেন, আল্লাহ পর্দা রাখতে পছন্দ করেন—যে নিজে গুনাহ ঢেকে রাখে, আল্লাহও তার গুনাহ ঢেকে রাখবেন।
চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত/ফতোয়া
বিয়ের আগের হারাম সম্পর্কের কথা স্বামীকে বলা হারাম।
প্রশ্নের উত্তরে সরাসরি এড়িয়ে যাওয়া বা অস্পষ্ট উত্তর (তওরিয়া) দেওয়াই সর্বোত্তম।
স্বামীকে উদ্বুদ্ধ করুন যে, অতীত মাফ করেছেন। যা হয়ে গেছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলার দরকার নেই।