দোয়ায় বা যিকিরের সময় ধ্যান
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
যে আমি কাবা শরীফে, মসজিদুল হারামে বসে আছি, মাকামে ইব্রাহিমের পেছনে বসে আছি অথবা মসজিদে নববীতে বসে আছি, রিয়াজুল জান্নাতে আছি, আয়েশা খুটির পাশে বসে আছি?
Answer
উত্তর: দোয়া, জিকির বা তেলাওয়াতের সময় স্থান কল্পনা করা
প্রশ্নে উল্লেখিত পদ্ধতিতে দোয়া, জিকির বা কুরআন তেলাওয়াতের সময় নিজেকে কাবা শরীফ, মসজিদুল হারাম, মসজিদে নববী, রিয়াজুল জান্নাত বা আয়েশা (রা.)-এর কক্ষের পাশে কল্পনা করা শরীয়তের দৃষ্টিতে বিদআত ও অনুচিত। নিম্নে এর কারণ ও প্রমাণ উপস্থাপন করা হলো:
১. ইবাদতে কল্পনার স্থান নেই
ইসলামী ইবাদত তাওকিফী (নির্ধারিত পদ্ধতি ও শর্তাধীন)। দোয়া, জিকির ও তেলাওয়াতের জন্য নির্দিষ্ট সময়, স্থান ও পদ্ধতি কুরআন ও সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ও সাহাবায়ে কিরাম এগুলোতে কোনো স্থান কল্পনা করতেন না। ইবনে আবিদীন (রহ.) বলেন:
"ইবাদতে মূলনীতি হলো, যা শরীয়ত নির্ধারণ করেনি তা পরিত্যাগ করাই ওয়াজিব। কারণ ইবাদত বিশুদ্ধ হয় কেবল শরীয়তের নির্দেশিত পদ্ধতি অনুসরণে।" (রদ্দুল মুহতার, ১/১২৫)
২. মনোযোগের জন্য বৈধ উপায়
হ্যাঁ, দোয়া ও জিকিরে খুশু (একাগ্রতা) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু একাগ্রতা আনার জন্য নিজেকে বিশেষ কোনো স্থানে কল্পনা করা সুন্নাহ সম্মত নয়। বরং নিম্নোক্ত পদ্ধতি অবলম্বন করা উচিত:
- আল্লাহর সান্নিধ্য ও দয়ার চিন্তা করা (যেমন: আমি আল্লাহর দরবারে দাঁড়িয়ে আছি)।
- তেলাওয়াতের অর্থ বোঝা ও চিন্তা করা।
- দোয়ার অর্থ বুঝে আন্তরিকভাবে প্রার্থনা করা।
মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) বলেন:
"ইবাদতে মনোযোগী হতে হলে নিজেকে আল্লাহর সামনে দাঁড়ানো কল্পনা করাই যথেষ্ট। নির্দিষ্ট কোনো স্থান কল্পনা করার প্রয়োজন নেই; বরং এতে ইবাদতের সরলতা ও আন্তরিকতা নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা আছে।" (মাআরিফুল কুরআন, ১/৪৫)
৩. বিদআতের শামিল
এই ধরণের কল্পনা ইসলামের প্রথম যুগে বা সাহাবা ও তাবিয়িনদের আমলে ছিল না। ইমাম মালিক (রহ.) বলেন:
"যে ব্যক্তি দ্বীনে নতুন কোনো কাজ উদ্ভাবন করল যা ভালো মনে করে, সে মূলত রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর বিরুদ্ধে কথা বলল।" (শারহু মুসলিম, ৬/১৫৪)
হাদীসে এসেছে:
"যে ব্যক্তি আমাদের এই দ্বীনে নতুন কিছু উদ্ভাবন করে যা তাতে নেই, তা প্রত্যাখ্যাত।" (বুখারী, ২৬৯৭)
৪. শিরকের আশঙ্কা
নিজেকে কাবা বা মসজিদে নববীতে কল্পনা করলে ধীরে ধীরে মনে হতে পারে যে, সেসব স্থানের বরকত দোয়া কবুলের জন্য আবশ্যক। অথচ দোয়া কবুল হওয়া সম্পূর্ণ আল্লাহর ইচ্ছাধীন। ইমাম তাহাবী (রহ.) বলেন:
"বস্তুগত বরকতের আশা করা বা স্থানকে মাধ্যম বানানো শিরকের দিকে নিয়ে যেতে পারে। তাই ইবাদতে শুধু আল্লাহর ওপর নির্ভর করা ওয়াজিব।" (শারহু মাআনিল আছার, ৪/২৫)
৫. শরীয়ত সম্মত উপায়
দোয়া ও জিকিরে মনোযোগী হওয়ার জন্য নিম্নলিখিত উপায়গুলো সুন্নাহ ও হানাফী ফিকহের কিতাবে উল্লেখিত:
- নামাজের মতো স্থির হয়ে বসা ও কিবলামুখী হওয়া।
- শব্দগুলো আস্তে আস্তে ও অর্থ বুঝে পড়া।
- আল্লাহর দয়া, ভয় ও ভালোবাসা নিয়ে চিন্তা করা।
- মাসনূন (সুন্নাহ সম্মত) দোয়া ও জিকির পড়া।
হযরত মুফতি তাকি উসমানি (দামাত বারাকাতুহুম) বলেন:
"ইবাদতে কল্পনার আশ্রয় নেয়া জায়েয নয়। বরং মনোযোগ আনার জন্য সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো ইবাদতের অর্থ ও গুরুত্ব উপলব্ধি করা এবং আল্লাহর সামনে দাঁড়ানোর অনুভূতি জাগ্রত করা।" (কিতাবুল ফতোয়া, ৬/৪২৪)
সুতরাং
প্রশ্নে বর্ণিত ধরণের কল্পনা করা জায়েয নয়, বরং এটি বিদআতের সীমায় পড়ে। দোয়া, তেলাওয়াত ও জিকিরের সময় সরাসরি আল্লাহর কাছে নিজেকে পেশ করুন এবং স্থান বা মাধ্যমের কল্পনা পরিহার করুন। সঠিক মনোযোগ আনার জন্য কুরআন-হাদীসের নির্দেশিত পথেই চেষ্টা করুন।
আল্লাহই সবচেয়ে ভালো জানেন।