হারাম টাকায় কেনা জিনিস কি অল্প টাকায় কিনে হালাল করা যাবে?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
একজন বোনের মা, হারাম টাকায় কিছু গহনা কিনেছেন দীর্ঘ দিন আগে। তখন ভরি ছিলো ৭-১০ হাজার বা এর চেয়ে কিছু বেশি।
বোনটা দ্বীনের বুঝদার মাশা'আল্লহ, হারাম টাকার জিনিস নিতে ইচ্ছুক না। কিন্তু মা চান, মেয়ে কিছু গয়না নিক৷
আমার প্রশ্ন হচ্ছে, মেয়ে কি স্বর্ণের আগের মূল্য (যেমন-১০/১৫ হাজার টা ভরি) ধরে মায়ের থেকে স্বর্ণ ক্রয় করতে পারবে? এটা কি জায়েজ?
Answer
উত্তর:
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاتة
প্রশ্নটির সারমর্ম হলো, কোনো ব্যক্তি যদি হারাম অর্থ দ্বারা কোনো বস্তু (এখানে স্বর্ণালংকার) ক্রয় করে, তাহলে সেই বস্তুটি কি তার মালিকানা থেকে বের হয়ে যায়? এবং অন্য কেউ কি তা কম মূল্যে কিনে নিতে পারে? বিশেষ করে যখন ক্রেতা মেয়ে এবং বিক্রেতা মা।
ফিকহী বিশ্লেষণ:
১. হারাম টাকায় কেনা জিনিসের মালিকানা:
ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, হারাম উপায়ে অর্জিত অর্থ দিয়ে কোনো জিনিস কিনলে তা ক্রেতার মালিকানায় চলে আসে। তবে সে গুনাহগার হয় এবং তার জন্য ওই অর্থ বা জিনিস ব্যবহার করা জায়েজ নয়। বরং তাকে অবশ্যই ওই অর্থ বা জিনিসের মূল্য সদকা করে দিতে হবে বা প্রকৃত মালিককে ফিরিয়ে দিতে হবে। (রদ্দুল মুহতার, ৪/২২৪; ফাতাওয়া আলমগিরী, ২/২৭৫)
২. মেয়ের জন্য মায়ের কাছ থেকে কম মূল্যে কেনা:
মা যদি হারাম টাকায় স্বর্ণ কিনে থাকেন, তাহলে সেই স্বর্ণ তার মালিকানায় আছে। কিন্তু তাকে জানা উচিত যে, ওই স্বর্ণ তার জন্য হালাল নয়। সে যদি তা মেয়েকে দিতে চান বা বিক্রি করতে চান, তাহলে নিম্নোক্ত শর্তাবলী প্রযোজ্য:
-
কম মূল্যে কেনা জায়েজ নয়: মেয়ে যদি জানতে পারে যে, মায়ের টাকা হারাম, তাহলে সে ওই স্বর্ণ বর্তমান বাজারমূল্যের চেয়ে কম দামে কিনতে পারবে না। কারণ এটি মায়ের হারাম অর্থের মাধ্যমে অর্জিত সম্পদকে বৈধ করার একটি কৌশল হতে পারে। বরং মেয়েকে বর্তমান বাজারমূল্য পরিশোধ করতে হবে।
(ইমদাদুল ফাতাওয়া, ৫/২৫০; ফাতাওয়া উসমানী, ২/৪৫৮) -
মা যদি সদকা করে দেন: উত্তম পন্থা হলো, মা নিজেই ওই স্বর্ণের বর্তমান মূল্য হিসাব করে তা গরিব-মিসকিনকে সদকা করে দিন। তাহলে তাঁর মালিকানা পবিত্র হবে এবং মেয়ে তা বর্তমান মূল্যে কিনতে পারবে। আর মা যদি সদকা না করেন, তাহলে মেয়ের জন্য কম মূল্যে কেনা জায়েজ হবে না।
৩. মেয়ের করণীয়:
মেয়ে যদি দ্বীনদার হন এবং হারাম টাকার জিনিস নিতে না চান, তাহলে তিনি মাকে নিম্নোক্ত পরামর্শ দিতে পারেন:
- মা যেন ওই স্বর্ণের বর্তমান বাজারমূল্য নির্ধারণ করে সেটি গরিবকে সদকা করে দেন।
- অথবা মা যেন ওই স্বর্ণ বিক্রি করে পুরো টাকা সদকা করে দেন।
- তারপর মেয়ে যদি চান, তাহলে মাকে হালাল উপায়ে উপার্জিত টাকা দিয়ে নতুন স্বর্ণ কিনে দিতে পারেন।
ফকীহদের মতামত:
- ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ (রহ.)-এর মতে, হারাম উপায়ে অর্জিত সম্পদ মালিকানায় আসে না। বরং তা ফিরিয়ে দেওয়া বা সদকা করা ওয়াজিব।
- ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, মালিকানা আসে, তবে ব্যবহার জায়েজ নয়।
- এই মাসআলায় ফাতাওয়া উসমানী এবং ইমদাদুল ফাতাওয়া-তে উভয় মতের সমন্বয়ে বলা হয়েছে— হারাম অর্থের জিনিস কমে কেনা জায়েজ নয়, বরং বর্তমান মূল্যে কিনতে হবে এবং মা সেটি সদকা করবেন।
(ফাতাওয়া উসমানী, ২/৪৫৮; ইমদাদুল ফাতাওয়া, ৫/২৫০)
পরিশেষে উত্তর:
মেয়ে যদি স্বর্ণের আগের মূল্য (যেমন ১০-১৫ হাজার টাকা ভরি) ধরে মায়ের কাছ থেকে স্বর্ণ ক্রয় করে, তবে তা জায়েজ হবে না। কারণ এটি হারাম টাকার জিনিসকে বৈধ করার একটি পন্থা। বরং নিম্নোক্ত পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে:
১. মা বর্তমান বাজারমূল্য নির্ধারণ করবেন।
২. মেয়ে সেই বর্তমান মূল্যে স্বর্ণ কিনবেন।
৩. মা সেই টাকা গরিব-মিসকিনকে সদকা করে দেবেন অথবা প্রকৃত মালিক (যদি চেনা যায়) ফিরিয়ে দেবেন।
৪. এরপর মেয়ের জন্য ওই স্বর্ণ হালাল হবে এবং সে তা ব্যবহার করতে পারবে।
আল্লাহ তাআলা তাওবা কবুল করুন এবং হালাল রিজিক দান করুন।
রেফারেন্স:
- রদ্দুল মুহতার, ৪/২২৪
- ফাতাওয়া আলমগীরী, ২/২৭৫
- ইমদাদুল ফাতাওয়া, ৫/২৫০
- ফাতাওয়া উসমানী, ২/৪৫৮
- বাহিশতি জেওর, ৪/১০২
- মাআরিফুল কুরআন, ২/৪৫০