হায়েয অবস্থায় আজানের জবাব দেওয়া কি জায়েয?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
Answer
উত্তর:
হ্যাঁ, মেয়েদের হায়েয (মাসিক) অবস্থায় আজানের জবাব দেওয়া জায়েয এবং মুস্তাহাব। এটি কোনো নিষিদ্ধ কাজ নয়, বরং যিকির ও দু‘আর অন্তর্ভুক্ত। হায়েযগ্রস্ত নারী যিকির, দরূদ, ইস্তিগফার ইত্যাদি করতে পারেন। আজানের জবাব দেওয়াও এক ধরনের যিকির—এতে পবিত্রতার শর্ত নেই।
প্রমাণ ও হানাফী ফিকহের ব্যাখ্যা:
১. আজানের জবাব দেওয়ার ফজিলত ও সাধারণ বিধান:
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
“إِذَا سَمِعْتُمُ الْمُؤَذِّنَ فَقُولُوا مِثْلَ مَا يَقُولُ…”
“তোমরা যখন মুয়াযযিনকে (আযান দিতে) শোনো, তখন তোমরাও তাই বলো যা সে বলে…” (সহীহ বুখারী, হাদীস: ৬১১; সহীহ মুসলিম, হাদীস: ৩৮৩)
এই হাদীসটি সাধারণ সকল শ্রোতার জন্য—নারী-পুরুষ, পবিত্র-অপবিত্র সবার জন্য প্রযোজ্য, যতক্ষণ না কোনো বিশেষ বাধা থাকে (যেমন নামাযে থাকা, পায়খানায় থাকা ইত্যাদি)।
২. হায়েয অবস্থায় যিকিরের অনুমতি:
হানাফী ফিকহের বিশ্বস্ত কিতাব রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন)-এ এসেছে:
“والحائض والنفساء لا يمنعان من الذكر والدعاء…”
“হায়েযগ্রস্ত ও নিফাসগ্রস্ত নারীকে যিকির ও দু‘আ করা থেকে বাধা দেওয়া হয় না।” (রদ্দুল মুহতার, ১/২৯৩)
আজানের জবাব দেওয়া যিকিরের অন্তর্ভুক্ত, কারণ এতে ‘আল্লাহু আকবার’, ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’, ‘আশহাদু আননা মুহাম্মাদার রাসূলুল্লাহ’ ইত্যাদি বাক্য রয়েছে।
ফাতাওয়া হিন্দিয়্যাহ (আলমগীরী)-তেও সাধারণভাবে বলা হয়েছে:
“ويستحب لمن سمع الأذان أن يقول مثل ما يقول المؤذن إلا في الحيعلة…”
“যে ব্যক্তি আযান শুনে, তার জন্য মুস্তাহাব যে, সে মুয়াযযিনের মতো বলবে—কেবল ‘হাইয়া ‘আলাস সালাহ’ ও ‘হাইয়া ‘আলাল ফালাহ’ বলার সময় ‘লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ’ বলবে।” (ফাতাওয়া হিন্দিয়্যাহ, ১/৫২)
এখানে কোনো ‘পবিত্রতা’র শর্ত উল্লেখ নেই; তাই হায়েযগ্রস্ত নারীর জন্যও এই নির্দেশ প্রযোজ্য।
৩. বিশেষ হানাফী উসূল:
- ইমাম আবু হানীফা (রহ) ও তাঁর অনুসারী ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মাদ (রহ)-এর মতে, হায়েযগ্রস্ত নারী কুরআন তিলাওয়াত করতে পারে না, কিন্তু যিকির ও দু‘আ করতে পারে।
- মুফতী মুহাম্মাদ শফী (রহ) ‘জাওহারুল ফিকহ’-এ লিখেছেন:
“حائضہ عورت کے لیے اذان کا جواب دینا جائز ہے، کیونکہ یہ ذکر ہے، قرآن کی تلاوت نہیں۔”
“হায়েযগ্রস্ত নারীর জন্য আজানের জবাব দেওয়া জায়েয, কারণ এটি যিকির, কুরআন তিলাওয়াত নয়।” - মুফতী তকী উসমানী (দামাত বারাকাতুহুম) ‘ফাতাওয়া উসমানী’-তে একই মত দিয়েছেন:
“حائضہ عورت اذان کا جواب دے سکتی ہے۔ اس میں کوئی حرج نہیں۔”
৪. ব্যতিক্রমী অংশ:
আজানের জবাব দেওয়ার সময় ‘হাইয়া ‘আলাস সালাহ’ ও ‘হাইয়া ‘আলাল ফালাহ’-এর জবাবে ‘লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ’ বলতে হবে—এটিও যিকির, তাই হায়েযগ্রস্ত নারীর জন্যও তা বলতে কোনো বাধা নেই।
উপসংহার:
সুতরাং প্রশ্নোক্ত ক্ষেত্রে মেয়েদের হায়েযের সময় আজানের জবাব দেওয়া জায়েয ও মুস্তাহাব। এতে কোনো গুনাহ নেই; বরং তা সওয়াবের কাজ।
সতর্কতা:
- আজানের জবাব দেওয়ার সময় শুধু মুখে উচ্চারণ করবেন, মুয়াযযিনের মতো আওয়াজ উঁচু করার প্রয়োজন নেই।
- যদি নারী নিজে সালাত (নামায) আদায়রত অবস্থায় থাকে, তাহলে জবাব দেবে না; কিন্তু হায়েয অবস্থায় নামায না থাকায় জবাব দেওয়াই উত্তম।
রেফারেন্স কিতাবসমূহ:
- সহীহ বুখারী, হাদীস: ৬১১
- সহীহ মুসলিম, হাদীস: ৩৮৩
- রদ্দুল মুহতার, ১/২৯৩
- ফাতাওয়া হিন্দিয়্যাহ, ১/৫২
- বেহেশ্তী জেওর (আশরাফ আলী থানভী), হায়েয অধ্যায়
- ফাতাওয়া উসমানী (মুফতী তকী উসমানী)
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (মুফতী শফী)