দেন মোহর এর পরিবর্তে স্ত্রীকে হজ করানো
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
Answer
উত্তর (Answer)
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ:
স্বামী স্ত্রীর দেনমোহর ১০ লাখ টাকা নির্ধারণ করেছেন, কিন্তু তিনি আর্থিকভাবে সচ্ছল নন। ইউরোপে বৈধ হননি, দেশে ভাঙা ঘর ছাড়া কিছু নেই, স্ত্রী আনার জন্য ৬ লাখ টাকা খরচ হয়েছে, আর লিগ্যাল হওয়ার জন্যও টাকা লাগছে। তিনি এখন শুধু স্ত্রীকে ৪০ হাজার টাকার একটি সোনার আংটি দিয়েছেন। তিনি জানতে চান, দেনমোহরের পরিবর্তে নিজে, স্ত্রী ও মাকে উমরাহ ও হজ করালে কী হবে?
ইসলামী বিধান
১. দেনমোহর (Mahr) একটি ঋণ:
ইসলামে দেনমোহর স্ত্রীর অধিকার এবং স্বামীর দায়িত্ব। তা অবশ্যই আদায় করতে হবে। ঋণ পরিশোধ না করে অন্য খাতে অর্থ ব্যয় করা জায়েজ নয়, যদি না স্ত্রী স্পষ্টভাবে সম্মতি দেয়।
قال الله تعالى: ﴿وَآتُوا النِّسَاءَ صَدُقَاتِهِنَّ نِحْلَةً﴾ [النساء: 4]
“আর তোমরা স্ত্রীদেরকে তাদের দেনমোহর আদায় করো খুশি মনে।” (সূরা নিসা: ৪)
قال رسول الله ﷺ: «المطلوب غارم» (سنن ابن ماجه: ২৪৮০)
“ঋণগ্রস্ত ব্যক্তির জন্য ঋণ পরিশোধ করা বাধ্যতামূলক।”
২. দেনমোহরের পরিবর্তে হজ-উমরা করানো:
যদি স্ত্রী দেনমোহর মাফ করে দেয় বা অন্য কিছু গ্রহণে রাজি হয়, তাহলে তা জায়েজ। কিন্তু একতরফাভাবে স্বামী তার ঋণের বদলে নিজে, স্ত্রী বা মায়ের জন্য হজ-উমরার ব্যবস্থা করে দিলে তা দেনমোহরের বদলে গণ্য হবে না, যতক্ষণ না স্ত্রী স্পষ্টভাবে তাতে রাজি হয়।
قال الإمام ابن عابدين رحمه الله: «ولو جعل مكان الصداق حجة أو عمرة جاز برضاها» (رد المحتار: ৩/৩০১)
“যদি দেনমোহরের স্থলে হজ বা উমরা নির্ধারণ করা হয়, তবে তা স্ত্রীর সম্মতি সাপেক্ষে জায়েজ।”
অর্থাৎ স্ত্রী যদি বলে “আমি তোমার উপর থেকে দেনমোহর মাফ করলাম অথবা তুমি আমাকে হজ করিয়ে দিলে তা আমি দেনমোহর হিসেবে গ্রহণ করব”, তাহলে তা বৈধ। কিন্তু স্বামী নিজে হজ করলে তা স্ত্রীর দেনমোহরের বদলে হবে না, বরং তা স্বামীর নিজের ইবাদত।
৩. স্ত্রীকে দেওয়া সোনার আংটির বিধান:
স্বামী যদি স্ত্রীকে কিছু দেয়, তবে তা দেনমোহরের অংশ হিসেবে গণ্য হবে যদি পূর্বে চুক্তি থাকে বা স্ত্রী সেটি মোহর হিসেবে গ্রহণ করে। নতুবা তা উপহার হিসেবে গণ্য হবে এবং দেনমোহর পুরো বাকি থাকবে। এখানে আংটিটি শুধু উপহার দেওয়া হয়েছে, দেনমোহরের অংশ হিসেবে উল্লেখ নেই—সুতরাং তা দেনমোহরের পরিশোধ নয়।
৪. স্বামীর জন্য নিজের হজ করা:
যার ওপর দেনমোহর বা অন্য ঋণ আছে, তার জন্য হজ করা ওয়াজিব নয় যতক্ষণ না প্রয়োজনের অতিরিক্ত অর্থ থাকে। কেননা ঋণ পরিশোধ করা হজের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ।
قال العلامة الكاساني: «ولا يجب الحج على من عليه دين يمنعه عن نفقة الحج» (بدائع الصنائع: ২/১২০)
সুতরাং স্বামী যদি এখন হজ করে, কিন্তু দেনমোহর আদায় না করে, তাহলে সে হজ কবুল হওয়ার আশা করতে পারবে না। বরং আগে ঋণ পরিশোধের চেষ্টা করা জরুরি।
৫. মায়ের জন্য হজ-উমরা করানো:
মা যদি নিজে হজ করতে অক্ষম হন এবং তার পক্ষ থেকে কাউকে নিয়ে যাওয়ার নিয়ত করেন, তাহলে এটি সওয়াবের কাজ। কিন্তু এটি স্বামীর ব্যক্তিগত ঋণ (মোহর) থেকে আলাদা। তাই ঋণ থাকা অবস্থায় ইচ্ছামতো এ খরচ করা উচিত নয়, যদি না স্ত্রী মাফ করে দেয়।
মুবাইল কলে ইজাব কবুল গ্রহণযোগ্য নয়। তবে উকিল প্রেরণ মারফত ইজাব কবুল হলে সেই ইজাব কবুল গ্রহণযোগ্য হবে।
ফুকাহায়ে কেরামের নির্দেশনা
-
ফাতাওয়া উসমানী (১/২৯০):
“দেনমোহর স্ত্রীর অবশ্যাপ্রাপ্য অধিকার। স্ত্রীর অনুমতি ছাড়া তা অন্য কাজে ব্যয় করা জায়েজ নয়। এমনকি নিজের হজের টাকাও যদি মোহর পরিশোধ না করে দেওয়া যায়, তবে হজ করা জায়েজ হবে না।” -
ইমদাদুল ফাতাওয়া (২/৪৮৯):
“হজ বা ওমরাহ দেনমোহরের বদলে করা স্ত্রীর সম্মতি ব্যতীত জায়েজ নয়।” -
রদ্দুল মুহতার (৩/৩০১):
“যদি স্ত্রী হজ বা উমরাকে দেনমোহর হিসেবে কবুল করে নেয়, তবে তা জায়েজ; অন্যথায় নয়।”
করণীয়
১. স্বামী স্ত্রীর সাথে বসে খোলামেলা আলোচনা করুন। বর্তমান আর্থিক সংকটের কথা বলুন এবং স্ত্রীকে জানান যে, সম্পূর্ণ মোহর এখন দেওয়া সম্ভব নয়। যদি স্ত্রী সদয় হয়ে মোহর কমিয়ে দেয় বা হজ-উমরা করিয়ে দেওয়ার বিনিময়ে মাফ করে দেয়, তাহলে তা করতে পারেন।
২. যদি স্ত্রী রাজি না হন, তাহলে স্বামী ধার-দেনা করে বা কিস্তিতে হলেও দেনমোহর আদায়ের ব্যবস্থা করুন। স্ত্রীকে সংসারে রাখা এবং তার ভরণপোষণ দেওয়াও ওয়াজিব।
৩. নিজের ও মায়ের হজের ব্যাপারে সতর্ক থাকুন। যতক্ষণ না মোহর আদায় নিশ্চিত হয়, ততক্ষণ নিজের জন্য হজ ওয়াজিব নয়। হজে গেলেও ঋণগ্রস্ত অবস্থায় তা কবুলের ব্যাপারে সন্দেহ থাকে।
৪. স্ত্রীকে দেওয়া আংটিটি উপহার গণ্য হবে। মোহর থেকে তা কাটা যাবে না, যদি না স্ত্রী তা মোহর হিসেবে গণ্য করতে রাজি হন।
সংক্ষিপ্ত উত্তর
প্রশ্নের সরাসরি উত্তর:
দেনমোহর আল্লাহর নির্ধারিত একটি ঋণ। স্বামী নিজে, স্ত্রী ও মাকে উমরাহ-হজ করালে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে দেনমোহরের পরিবর্তে গণ্য হবে না। এর জন্য স্ত্রীর স্পষ্ট সম্মতি থাকা জরুরি। স্ত্রী যদি রাজি হন, তাহলে তা জায়েজ; অন্যথায় নয়। বর্তমানে স্বামী আর্থিকভাবে অসমর্থ হলেও স্ত্রীর সাথে আলোচনা করে মোহর কমানো বা স্থগিত করার চেষ্টা করুন। নিজে হজ করা – যদিও মোহর আদায় না হয় – তা ফরজ হজ হবে কিনা, তা নিয়ে সতর্কতা আবশ্যক। সর্বোত্তম হলো স্ত্রীর সম্মতি আদায় করে মোহরের বদলে হজ-উমরা করানো, অথবা ধার-দেনা করে মোহর আদায় করা।