বিয়ের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারছি না,পরামর্শ চাই।
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
আমার বয়স ২৭। এটাই প্রথমবার কোনো ফ্যমিলি থেকে আমাকে দেখতে আসে।গত শুক্রবার একটা ফ্যামিলি থেকে আমাকে দেখতে আসে।আমাকে বৃহস্পতিবার রাতে জানানো হয়।এর আগে বায়ওডাটা দেখেছিলাম ভালো লাগেনি কিন্তু বাসায় বলিনি।পরে বলেছিলো রেস্টুরেন্টে দেখবে আমি বলছি আমি যাবো। তখন বুঝেছিলাম হয়তো পর্দার গুরুত্ব বোঝে না। ছেলে, ছেলের মা বাবা ভাবি আর ঘটক আসছে।ভাবি আর মা বোরখা পড়া ছিল নিকাব ছিলোনা। আমি ঘটক আর বাবার সামনে যাবোনা বলেছি তো ঘটককে সরানো হলো। ছেলের বাবা আমার এসএসসি এইচএসসির সাল জিজ্ঞেস করলো, আর আইওএমে যে পড়ি কেনো পড়ি জিজ্ঞেস করলো। ছেলের কোনোকিছু জানার আছে কিনা জিজ্ঞেস করলে বললো সমস্যা নেই উনার কোনোকিছু জানার থাকলে করতে পারেন। নামাজের ব্যপারে জিজ্ঞেস করলে বললো পড়ে বাট মাঝে মাঝে ছুটে যায় তাদের কাজের প্রেশার থাকে কাজের জন্য সফর করতে হয়। মাহরাম ননমাহরাম মানে। মাযহাব সম্পর্কে জিজ্ঞেস করায় বললো যে আপনি যেহেতু পরছেন আপনার জানা আছে এমনি ফরজ সুন্নত মানি।কুরআন শুদ্ধভাবে জানে কিনা জিজ্ঞেস করলে বললো জানে আটকে গেলে ইউটিউব বা বাবার কাছ থেকে জেনে নেই তবে পড়ার চেয়ে কুরআন শোনা হয়।
পরে আবার ডেকে জিজ্ঞেস বললো যে পাবলিক ভার্সিটির ফ্রী মিক্সিং এর মধ্যে থাকলেও তার কোনোকিছু ছিলোনা কারো সাথে।আর তারা দুইভাই একসাথেই থাকবে মা বাবা না থাকলেও। আমি বললাম পর্দা মেনে চলি কঠোরভাবে। বললো কোনো সমস্যা হবে না আপনি আপনার মতো থাকতে পারবেন আর আমাদের বাসায় তেমন কেউ আসে না যে যার রুমে তো থাকবে। ছেলের মা বাবা শিক্ষক।। এডুকেডেট ফ্যামিলি তাই আমার বাসায় থেকে মত দিতে চাচ্ছে। আমার আংকেল নাকি ছেলে বন্ধুদের থেকেও খবর নিছে। ওদের কথাবার্তা আমার ফ্যমিলির ভালো লাগতেছে। কিন্তু ছেলের ফেসবুক আইডি দেখলাম ভালো লাগেনি আগে ভার্সিটিতে থাকতে কয়েকটা মেয়ের সাথে ছবি আছে। আমি জানালাম ছেলের দীনের বুঝ নেই। আমার মা বলতেছে আমি নাকি মানাতে পারবো আমি বললাম হেদায়েত আল্লাহর কাছ থেকে আসে।এখন আমাকে জোর দিচ্ছে। আমি কয়েকদিন সময় চাইছি। আসার আগের দিন থেকে ইস্তেখারার সলাত পড়েছি। আমি তো দীনদার কাউকে চাইছিলাম। ওখানে আমি কেমনে থাকবো ছেলের দীনের বুঝ নেই আর দুই ভাই একসাথেই থাকবে।
ওস্তাজ আমার কি করা উচিত? আর ছেলের আকিদা ঠিক আছে কিনা ছেলের চরিত্র বা ছেলের সম্পর্কে আরো কি কি জানা প্রয়োজন? আর পরিবারকে কিভাবে বুঝাবো ওরা না মানলে কি করবো?
Answer
উত্তর:
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রথমেই বলব, আপনি ইসলামী মূল্যবোধ ও পর্দার ব্যাপারে যত্নশীল, এটি খুবই প্রশংসনীয়। আল্লাহ আপনাকে উত্তম প্রতিদান দিন। আপনার বয়স ২৭ বছর এবং এটি প্রথম পাত্র দেখার অভিজ্ঞতা, তাই কিছু দ্বিধা ও সংশয় থাকাটাই স্বাভাবিক। আসুন, কুরআন-হাদিস ও হানাফি ফিকহের আলোকে বিষয়টি বিশ্লেষণ করি।
১. পাত্র নির্বাচনের মূলনীতি
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"তিনটি গুণের জন্য নারীকে বিয়ে করা হয়: তার সম্পদ, তার বংশমর্যাদা, তার সৌন্দর্য এবং তার দ্বীন। তুমি দ্বীনদারকে অগ্রাধিকার দাও, তাহলে তুমি সফল হবে।" (বুখারি, মুসলিম)
এখানে 'দ্বীন' অর্থ পূর্ণাঙ্গ ইসলামী জীবনযাপন, যার মধ্যে নামাজ, জাকাত, পর্দা, হালাল-হারামের জ্ঞান ও আমল সবই শামিল। আপনি যেহেতু দীনদার পাত্র চাচ্ছেন, এটি একদম সঠিক মানসিকতা।
২. ছেলেটির আকীদা ও চরিত্র সম্পর্কে যা জানা দরকার
আপনি ছেলেটির কিছু দুর্বলতা লক্ষ করেছেন:
- নামাজে নিয়মিত নন (মাঝে মাঝে ছুটে যায়)।
- বিশ্ববিদ্যালয়ে মেয়েদের সাথে মিশেছেন এবং ফেসবুকে মেয়েদের সাথে ছবি আছে।
- কুরআন পড়ার চেয়ে শোনাই বেশি করেন।
- মাযহাব সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা নেই বলে মনে হয়েছে।
- দুই ভাই একসাথে থাকবেন, পর্দার পরিবেশ কেমন হবে সেটি স্পষ্ট নয়।
হানাফি ফিকহের দৃষ্টিভঙ্গি: ইমাম আবু হানিফা (রহ.) বলেছেন: "كفاءة في الدين" অর্থাৎ বিবাহের ক্ষেত্রে সামঞ্জস্যতা (কুফু) ধর্মের দিক থেকে হওয়া জরুরি। (রদ্দুল মুহতার, ৩/৬১)
যদি পাত্র নিজে নামাজে অনিয়মিত হয়, পর্দার গুরুত্ব বোঝে না, তাহলে ভবিষ্যতে স্ত্রীকেও দ্বীনের পথে চলতে বাধা দিতে পারে অথবা পরিবেশ দুর্বল করে দেয়ার সম্ভাবনা থাকে। আপনি বলেছেন, ছেলেটির 'দীনের বুঝ নেই' – এটি একটি গুরুতর ইঙ্গিত।
৩. ফেসবুকে মেয়েদের সাথে ছবি ও অতীতের মিশ্রণ
এটি একটি স্পষ্ট নিদর্শন যে পর্দার ব্যাপারে তার সংবেদনশীলতা কম। ইসলামে বেগানা পুরুষ-মহিলার ছবি তোলা বা সেগুলো সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশ করাও নাজায়েজ। যদি ছেলেটি অতীতে এ ধরনের কাজ করে থাকে, কিন্তু এখন তওবা করে সত্যিকার অর্থে পরিবর্তিত হয়েছে, তাহলে আলাদা কথা। তবে আপনি যদি দেখেন এখনও সে এসব বিষয়ে গাফেল, তাহলে সতর্ক থাকা উচিত।
৪. দুই ভাইয়ের সাথে বসবাসের অবস্থা
ছেলেটি বলেছে, "তারা দুই ভাই একসাথে থাকবেন এবং অন্য কেউ আসে না।" কিন্তু আপনি যদি ওখানে যান, তাহলে দেবর (ভাসুর) সাথে পর্দা জরুরি। দেবর মাহরাম নয়। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: "দেবর (স্বামীর ভাই) মৃত্যুর মতো শঙ্কাজনক।" (বুখারি, ৫২৩২) অর্থাৎ দেবরের সাথে একাকী মেলামেশা বা স্বচ্ছন্দে চলাফেরা করা জায়েজ নয়। ছেলেটি যদি এই বিষয়টি বুঝেই আপনাকে আপনার মতো থাকতে বলছে, তাহলে বোঝা যায় তার পর্দার ব্যাপারে ধারণা শিথিল।
৫. ইস্তেখারার সঠিক পদ্ধতি
ইস্তেখারা মানে আল্লাহর কাছে কল্যাণ চাওয়া। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, নামাজ পড়েই বসে থাকবেন। ইস্তেখারার সাথে সাথে আপনাকে বুদ্ধি-বিবেচনা, তথ্য সংগ্রহ ও পরামর্শ নিয়েই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। হাদিসে এসেছে:
"তোমাদের কেউ যখন কোনো কাজের সংকল্প করে, সে যেন দু'রাকাত নফল পড়ে... তারপর বলেঃ হে আল্লাহ, আমি তোমার ইলমের মাধ্যমে কল্যাণ চাই..." (বুখারি)
ইস্তেখারার পর যদি মনে শান্তি না আসে বা ব্যাপারটি ভালো আলোচনার সত্ত্বেও আপনার মধ্যে অস্বস্তি থাকে, তাহলে তা না করাই উত্তম। তাই আপনি সময় নিয়ে ভাবুন।
৬. পরিবারকে বোঝানোর উপায়
পরিবার যদি শিক্ষিত পরিবার দেখে মুগ্ধ হয়, তাহলে আপনি তাদেরকে বলতে পারেন:
- শিক্ষা ও চাকরি দ্বীনের বিকল্প নয় (কুরআন: ৪৯:১৩)।
- কুরআনে বলা হয়েছে, নারী-পুরুষের সম্পর্ক পর্দা ও সংযমের ভিত্তিতে হওয়া উচিত (সূরা নূর)।
- আপনি দীনদার স্বামী চান, যিনি নামাজে কেয়ামত করবেন ও পর্দা রক্ষায় সহায়তা করবেন।
- আপনি যদি বাধ্য হন, তাহলে ভবিষ্যতে আপনার সংসার যদি দ্বীনের পথে চালাতে না পারেন, তাহলে সন্তানদের দ্বীনি ভবিষ্যত বিপন্ন হবে।
যদি তারা না মানে: ইসলামে পিতামাতার আনুগত্য ফরজ, কিন্তু স্পষ্ট হারাম বা দ্বীনের বিপরীত পাত্র নির্বাচনে বাধ্য করা জায়েজ নয়। আপনি নম্রভাবে বলবেন: "আমি আপনার সন্তান, আপনি আমার কল্যাণ চান, কিন্তু আমি একটি দ্বীনদার স্বামী চাই। যদি এই প্রস্তাবটি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হয়, তাহলে আল্লাহই কল্যান দান করবেন। অন্যথায় তা পরিত্যাগ করাই কল্যাণকর।"
৭. করণীয়:
(ক) পাত্রের সাথে আরও বিস্তারিত কথা বলুন (পর্দার গুরুত্ব, তার দ্বীনের জ্ঞান, পরিবারে দ্বীনের চর্চা)। (খ) তার মুসল্লিতে যাওয়ার অভ্যাস, হালাল-হারাম সম্পর্কে সচেতনতা জিজ্ঞাসা করুন। (গ) তার অতীত বন্ধুবান্ধব সম্পর্কে জানুন (মাহরাম পুরুষের মাধ্যমে – নিজে নয়)। (ঘ) ইস্তেখারা অব্যাহত রাখুন এবং মনে শান্তি কামনা করুন। (ঙ) যদি মনে প্রশান্তি না আসে, তাহলে দ্বিধা ছাড়াই নম্রভাবে অসম্মতি জানান।
সতর্কতা: এমন পাত্র যার নামাজ নিয়মিত নয়, পর্দার ব্যাপারে উদাসীন, এবং বিবাহের পরেও দুই ভাইয়ের সাথে থাকতে হবে – সেখানে আপনার দ্বীন পালন করা কঠিন হতে পারে। আপনি যদি কঠোর পর্দা করেন, তাহলে আপনার জন্য আলাদা ব্যবস্থা না থাকলে বিপদে পড়তে পারেন।
ফতোয়া ও হানাফি কিতাবের রেফারেন্স:
- রদ্দুল মুহতার (৩/৬১-৬২): কুফু (সামঞ্জস্যতা) ধর্মের ভিত্তিতে নির্ধারিত।
- ফাতাওয়া হিন্দিয়া (১/২৮৪): পাত্রের ধর্মীয় অবস্থা বিচার করা জরুরি।
- বাহিশতি জেওর (বিবাহ অধ্যায়): দ্বীনদার পাত্র বেছে নেওয়া অত্যাবশ্যক।
- ফাতাওয়া উসমানি (২/৫২৮): ইস্তেখারার পর মন সায় না দিলে প্রস্তাব ফিরিয়ে দেওয়া উচিত।
- মা’আরিফুল কুরআন (সূরা নূরের তাফসীর): পর্দা ও শালীনতা নারী-পুরুষ উভয়ের জন্য ফরজ।
উপসংহার:
আপনার বর্ণনায় স্পষ্ট যে, পাত্র ও তার পরিবারের কথা-বার্তায় দ্বীনের গুরুত্ব খুব বেশি নেই। আপনার মনের অবস্থাও সায় দিচ্ছে না। সুতরাং দ্বিধা না করে আপনি নম্র ভাষায় আপনার পরিবারকে বুঝিয়ে বলুন যে এই প্রস্তাব আপনার মনে শান্তি দিচ্ছে না এবং আপনি আরও সময় নিতে চান অথবা বিনয়ের সাথে অস্বীকৃতি জানিয়ে দেন। আল্লাহর কাছে হেদায়েত চান, নিশ্চয়ই তিনি উত্তম ব্যবস্থা দান করবেন।
আল্লাহ আপনাকে ধৈর্য ও সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার তাওফিক দান করুন। আমীন।