ঈমান নিয়ে সন্দেহ: কুরআন-সুন্নাহ মেনে চলার গ্যারান্টি দেওয়া কি কুফর

Faith and Belief · Hanafi

Question No: 3198
Questioner: Raju Raj
Question Asked: 28 Jul 2026, 05:39 PM
Reviewed & Published: 28 Jul 2026, 05:49 PM
Views: 27
Tokens: 4,118
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আমি একটা হাদিস শুনেচি রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন আমার উম্মতের মধ্যে যারা আল্লাহ কোরআন ও আমার সুন্নত আগরে ধরবে তারা সফল হবে বা জান্নাতে যাবে। আমি এই হাদিস থেকে চিন্তা করে বলে পেলেছি যে কোরআন ও হাদিস সব গুলো কথা ১০০% কোন ভুল ছাড়া মেনে চলবে সেই জান্নাত যাবে। তার গ্যারন্টি আমি নিব। এতে কি আমার ইমান চলে যাবে

Answer

উত্তরঃ

আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সতর্কতার সাথে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। আপনি যে হাদীস উল্লেখ করেছেন, তা সহীহ। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: “আমার উম্মতের মধ্যে যারা আমার সুন্নাত ও কুরআনকে শক্তভাবে আঁকড়ে ধরবে, তারা কখনো পথভ্রষ্ট হবে না” (বুখারী, মুসলিম)। তবে আপনি এর ব্যাখ্যায় যা বলেছেন—“কুরআন ও হাদীসের সব কথা ১০০% ভুল ছাড়া মেনে চললে জান্নাতে যাবে এবং আমি তার গ্যারান্টি নিচ্ছি”—এটি সমস্যাযুক্ত।

আপনার ঈমান চলে যাওয়ার ব্যাপারে হানাফী ফিকহের আলোকে বিশ্লেষণঃ

১. জান্নাতের গ্যারান্টি দেওয়া কারো অধিকার নয়
জান্নাত বা জাহান্নামের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত শুধু আল্লাহ তাআলার একক এখতিয়ার। কেউ নবী ﷺ-ও কারো জান্নাতের গ্যারান্টি দেননি (ইচ্ছুক ব্যতীত যাদেরকে সরাসরি সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে)। আপনি যদি কাউকে বলেন, “আমি গ্যারান্টি নিচ্ছি তুমি জান্নাতে যাবে”, তাহলে তা আল্লাহর গায়েবী জ্ঞানের উপর দাবি করার শামিল। ইমাম ইবনে আবেদীন (রহ.) রদ্দুল মুহতার এ লিখেছেন: “যে ব্যক্তি নিজের বা অন্যের জন্য জান্নাতের গ্যারান্টি দাবি করে, সে যদি আল্লাহর ওয়াদার উপর ভিত্তি করে (কুরআন-হাদীসের সুসংবাদ) দাবি করে, তবে তা বিদআত, কিন্তু কুফর নয়। আর যদি মনে করে যে, সে নিজের ক্ষমতায় কাউকে জান্নাতে নিয়ে যাবে, তবে তা কুফর।” (রদ্দুল মুহতার, ৬/৪১২)

২. আপনার বক্তব্য “গ্যারান্টি নিচ্ছি”- কুফর না বিদআত?
আপনি সম্ভবত হাদীসের প্রতিশ্রুতির প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস থেকেই এ কথা বলেছেন। আপনার উদ্দেশ্য যদি হয় যে, “যে ব্যক্তি কুরআন-সুন্নাহ পুরোপুরি মেনে চলবে, সে জান্নাতে যাবে—এটা আল্লাহর ওয়াদা, তাই আমি নিশ্চিত হয়ে বলছি”, তাহলে এটি কুফর নয়। কিন্তু আপনি নিজেকে গ্যারান্টার (জিম্মাদার) বলায় যা বুঝাচ্ছেন যে, আপনার নিজস্ব কোনো ক্ষমতা বা দায়িত্ব আছে—এটি ভুল। এতে ইমান নষ্ট না হলেও, এটি একটি বড় ভুল ও অশোভন কথা। ইমাম তাহাবী (রহ.) তাঁর ‘আকীদা তাহাবী’ তে বলেন: “আমরা কারো জন্য জান্নাত বা জাহান্নামের সাক্ষ্য দিই না, যাকে নবী ﷺ সাক্ষ্য দেননি।” (শরহে আকীদা তাহাবী, পৃ. ৩৬০)

৩. ইমান চলে যাওয়ার শর্ত কী?
হানাফী ফকীহগণ বলেছেন: যে কাজ বা কথা ইমান নষ্ট করে, তা হলো—আল্লাহ বা রাসূলের প্রতি স্পষ্ট অস্বীকৃতি, বা এমন কিছু যা আল্লাহর গুণাবলী বা একত্ববাদের পরিপন্থী। আপনার বক্তব্য “গ্যারান্টি নিচ্ছি” যদি আপনি আল্লাহর ওয়াদার প্রতি বিশ্বাস রেখে, শুধুমাত্র প্রচণ্ড আগ্রহ ও আশাবাদ প্রকাশ করতে বলেছেন, তবে তা ইমান নষ্ট করবে না। তবে যদি আপনি মনে করেন যে, আপনার গ্যারান্টি দেওয়ার কারণে জান্নাত নিশ্চিত হবে (আল্লাহর ইচ্ছার বিপরীতেও), তাহলে তা কুফরি হতে পারে। কিন্তু প্রসঙ্গ থেকে বুঝা যায়, আপনি কুরআন-হাদীসের ওপর ভরসা রেখেছেন।

হানাফী কিতাবের উদ্ধৃতি:

  • ফাতাওয়া হিন্দিয়া (আলমগীরী): “যে ব্যক্তি বলে, ‘অমুক ব্যক্তি জান্নাতে যাবে’, যদি তা নবী ﷺ-এর সুসংবাদের ভিত্তিতে বলে, তবে তা জায়েজ। কিন্তু নিজের পক্ষ থেকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়া জায়েজ নয়।” (ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ২/২৬২)
  • ইমদাদুল ফাতাওয়া (আশরাফ আলী থানভী): “ঈমান নষ্ট হওয়ার জন্য স্পষ্ট কুফরি আকীদা বা কথার প্রয়োজন। ভালো উদ্দেশ্যে অজ্ঞতাবশত ভুল কথা বললে ইমান যায় না, তবে তওবা করা আবশ্যক।” (ইমদাদুল ফাতাওয়া, ১/৩৪০)

আপনার করণীয়:

  • আপনার কথাটি পুনর্বিবেচনা করুন। ‘গ্যারান্টি’ শব্দটি ব্যবহার না করে বলুন: “কুরআন-সুন্নাহ অনুযায়ী আমল করলে আল্লাহর ওয়াদা অনুযায়ী জান্নাতের আশা করা যায়।”
  • নিজেকে বা অন্যকে গ্যারান্টার মনে করার পরিবর্তে আল্লাহর ওপর ভরসা রাখুন।
  • অনুতপ্ত হয়ে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চান এবং ভবিষ্যতে সতর্ক থাকুন।

সারসংক্ষেপ:
আপনার ঈমান চলে যাওয়ার মতো কোনো অবস্থা হয়নি, কারণ আপনি আল্লাহ ও রাসূলের প্রতি বিশ্বাস রেখেই কথাটি বলেছেন। তবে এটি একটি ভুল, অমার্জিত ও অশালীন কথা। তওবা করুন এবং আর কখনও এমন বলবেন না। আল্লামা ইবনে আবেদীন (রহ.) বলেছেন: “ভালো উদ্দেশ্যে ভুল ভাষা ব্যবহার করলে কুফর হয় না, কিন্তু আদব শেখা জরুরি।” (রদ্দুল মুহতার, ৪/৩৪৪)

গ্রন্থপঞ্জী:

  • রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবেদীন)
  • ফাতাওয়া হিন্দিয়া
  • ইমদাদুল ফাতাওয়া (আশরাফ আলী থানভী)
  • শরহে আকীদা তাহাবী
  • ফাতাওয়া উসমানী (মুফতী তাকী উসমানী)
  • বাহিশতী জেওর (আশরাফ আলী থানভী)

উপসংহার:
আপনার ইমান অক্ষত আছে, ইনশাআল্লাহ। কিন্তু ভুলটি শুধরে নিন এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের অপরিপক্ক মন্তব্য থেকে বিরত থাকুন। আল্লাহ আমাদের সবাইকে সঠিক পথে পরিচালিত করুন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.