নামাজকে পেরা বললে কি কুফর হয়?

Faith and Belief · Hanafi

Question No: 3172
Questioner: Saadman saif Sagee
Question Asked: 27 Jul 2026, 06:59 PM
Reviewed & Published: 27 Jul 2026, 07:06 PM
Views: 23
Tokens: 8,779
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম
কেউ ঠিকভাবে ইমান নিয়ে চলতে চায়, কুফর থেকে বাচতে চায়।ইসলামের কোন অকট্য বিষয়কে নিয়ে উপহাস বা এমন কিছু যা অপমানজনক তা করলে তার জানামতে হয়তো ইমান চলে যায়।একবার সে এশার নামাজের আগে বলে, যাই নামাজটা পড়ে ফেলি।পেরা শেষ হয়ে যাবে।
এ কথা বলার সময় এত খেয়াল করে বলে নাই,বাট বলার পর তার মধ্যে ভয় চলে আসে নামাজকে পেরা বলা হয়ে গেল কিনা,ইমান চলে গেল কিনা,সে ইস্তেগফার করে। দোয়া করে।তার বোঝামতে তার কখনোই নামাজকে পেরা বলার কোন ইচ্ছে বা নিয়ত থাকার কথাই না।নামাজকে অপমান করার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে তাই নেই।সে নামাজকে ফরজ, অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, মর্যাদার যোগ্য মনে করে,সে সচেতনভাবে বললে হয়তো কখনো নামাজকে পেরা বলতো। সে হয়তো নামাজ না পড়ার যে মানসিক চাপ সেটা শেষ হয়ে যাবে বুঝাইছে বা নামাজ যে আদায় করবে ফলে তার মেইন কাজ শেষ হয়ে যাবে পরে তেমন কাজ থাকবে না এরকম বলতে কথাটা মুখ ফসকে বলে ফেলছে। সে আসলেই নামাজকে এভাবে বলতে চায় না।সে বিবাহিত, প্রেগ্ন্যান্ট। তার জানামতে নামাজকে পেরা বলার উদ্দেশ্য নিয়ে এ কথা বলে নাই তাই কুফর হবার কথা না।
আবার ইচ্ছেকৃতও এভাবে বলে নাই,সচেতনভাবে না,হটাৎ মুখ দিয়ে বলে ফেলেছে।ক দিন আগে ঘটছে এখনো ভয় পেয়ে যাচ্ছে যদি ইমান চলে গিয়ে থাকে, কি হবে।বিয়ে নিয়েও ভয়ে আছে, ইমান চলে গেলে বিয়েও যদি ভেঙে যায় কি করবে।কউকে কিছু বলতেও পারছে না।এমনিতেও সে সারাদিন মাসালা ঘাটাঘাটি করে ইমান, বিয়ে ভাঙা ও বিভিন্ন বিষয় নিয়ে ভয়ে থাকে।এভাবে ঐ সময় বলে ফেলাতে কি কোন সমস্যা হইছে ইমানের।তার আল্লাহ ও রাসুল স. এর উপর পরিপূর্ণ ইমান আছে।কুফরি থেকে বেচে থাকতে চায়।সে মাসালা ঘেটে ইমান ভাঙার অনেক কিছু দেখছে হয়তো, বাট সবসময় সব মনে থাকে না আবার ইখতিলাফও আছে দেখে,কখনো এরকম হটাৎ মুখ ফসকে কিছু বলে ফেললে কি ইমান চলে যেতে পারে আকিদা ঠিক থাকলেও?

Answer

بسم الله الرحمن الرحيم

উত্তর:

আপনার বর্ণিত পরিস্থিতি অত্যন্ত স্পষ্ট: জননী সাহেবা নামাজকে (সালাত) ‘পেরা’ (বোঝা/ঝামেলা) বলে ফেলেছেন, কিন্তু তা অপমানজনক উদ্দেশ্যে নয়, বরং তার মানসিক চাপ কেটে যাওয়ার প্রসঙ্গে মুখ ফসকে এমন ভাষা বেরিয়ে গেছে। তিনি সঙ্গে সঙ্গে ইস্তিগফার ও দু‘আ করেছেন এবং তার অন্তরে আল্লাহ ও রাসূলের প্রতি পরিপূর্ণ ঈমান ও ভালোবাসা রয়েছে। সুতরাং এই কথা দ্বারা তার ঈমান নষ্ট হয়নি এবং তার বিবাহ ভঙ্গ হয়নি। নিম্নে হানাফি ফিকহের আলোকে দলিলসহ ব্যাখ্যা দেওয়া হলো:


১. কুফরি শব্দের ক্ষেত্রে নিয়তের গুরুত্ব

হানাফি মাযহাবের মূলনীতি হলো: যে ব্যক্তি কোন কুফরি শব্দ উচ্চারণ করলেও যদি তা অজান্তে, ভুলে, বা অনিচ্ছাকৃতভাবে মুখ ফসকে বেরিয়ে যায়, আর তার অন্তরাকীদা (বিশ্বাস) ঠিক থাকে, তাহলে সে কাফির হয় না। কেননা কুফর নির্ভর করে ইচ্ছা ও জ্ঞানের ওপর। আল্লাহ তাআলা বলেন:

وَلَيْسَ عَلَيْكُمْ جُنَاحٌ فِيمَا أَخْطَأْتُمْ بِهِ وَلَٰكِنْ مَا تَعَمَّدَتْ قُلُوبُكُمْ
"আর তোমাদের ওপর এমন বিষয়ে কোনো দোষ নেই যা তোমরা ভুলবশত করে ফেল; কিন্তু তোমাদের অন্তর যা ইচ্ছাকৃত করে (সেজন্য দোষ হবে)..."
(সূরা আল-আহযাব: ৫)

ইমাম ইবনু আবিদীন (রহ.) ‘রদ্দুল মুহতার’-এ স্পষ্টভাবে বলেছেন:

"إِذَا جَرَى عَلَى لِسَانِهِ كَلِمَةُ الْكُفْرِ بِلَا قَصْدٍ وَلَا اخْتِيَارٍ، لَا يَكْفُرُ، مَا لَمْ يَعْتَقِدْ مَعْنَاهَا"
"যদি তার জবান থেকে ইচ্ছা ও স্বেচ্ছাচারিতা ছাড়াই কুফরি শব্দ বেরিয়ে যায়, তবে সে কাফির হবে না, যতক্ষণ না সে তার অর্থ বিশ্বাস করে।"
(রদ্দুল মুহতার, ৪/২৩৬, কিতাবুস সিয়ার, বাবুর রিদ্দা)

আপনার বর্ণনায় স্পষ্ট: তিনি ইচ্ছাকৃত কিংবা অপমানসূচক অর্থে ‘পেরা’ শব্দটি ব্যবহার করেননি। বরং তিনি নামাজকে ফরজ, গুরুত্বপূর্ণ ও মর্যাদাপূর্ণ মনে করেন। সুতরাং তাঁর ঈমান অক্ষুণ্ণ আছে।


২. ‘পেরা’ শব্দটি ব্যবহার কি কুফরি?

‘পেরা’ (বাংলায় বোঝা/ঝামেলা) শব্দটি নিজে কোনো কুফরি শব্দ নয়। তবে যদি কেউ সশব্দে জানা সত্ত্বেও নামাজকে ‘পেরা’ (বোঝা) বলে এবং তার উদ্দেশ্য হয় নামাজকে তুচ্ছ করা বা অপমান করা, তবে তা কুফর হতে পারে। কিন্তু এখানে সেটি হয়নি। বরং তিনি নামাজ না পড়ার মানসিক চাপ শেষ হওয়ার অর্থে বলেছেন, যেমন কেউ বলে: "নামাজ পড়ে নিলে মন হালকা হবে, বোঝা কমবে।" এটি অপমানজনক নয়, বরং স্বাভাবিক ভাষা।

তাছাড়া ইমাম তাহাবি (রহ.) ‘শারহু মা‘আনি আল-আসার’-এ উল্লেখ করেছেন:

"لا يكفر المسلم إلا بجحود ما علم من الدين بالضرورة أو استحلال ما حرم أو تكذيب الرسول صلى الله عليه وسلم"
"কোনো মুসলিম কাফির হবে না যতক্ষণ না সে দ্বীনের জরুরি বিষয় অস্বীকার করে, হারামকে হালাল বলে, কিংবা রাসূল (সা.)-কে মিথ্যা বলে।"

এখানে তিনি এগুলোর কিছুও করেননি। তাই কুফরের কোনো প্রশ্নই আসে না।


৩. হঠাৎ মুখ ফসকে বলে ফেলার বিধান

ফিকহে হানাফিতে ‘হাতফ’ (অনিচ্ছাকৃত উক্তি) বা ‘সবকুল লিসান’ (জবানের ভুল) কে সাধারণত দোষণীয় গণ্য করা হয় না, যদি তা ইচ্ছাকৃত না হয় এবং অন্তরের বিশ্বাস পরিপূর্ণ থাকে।

ইমাম মুহাম্মাদ ইবনুল হাসান (রহ.) এক ঘটনায় বলেন:

"إِنَّ الْعَبْدَ لَيَتَكَلَّمُ بِالْكَلِمَةِ لَا يُلْقِي لَهَا بَالًا يَهُوِي بِهَا فِي النَّارِ أَبْعَدَ مَا بَيْنَ السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ"
"নিশ্চয়ই বান্দা এমন কথা বলে যার প্রতি সে মোটেও ভ্রুক্ষেপ করে না, কিন্তু তার কারণে সে জাহান্নামে পতিত হয় যতদূর আসমান ও জমিনের ব্যবধান।"
(সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৪৭৮)

এ হাদিসটি সজ্ঞান ও ইচ্ছাকৃত অনর্থক কথার ব্যাপারে। আর এখানে তিনি অজান্তে বলেছেন এবং সঙ্গে সঙ্গে ভয় পেয়েছেন। তাই এটি ওই হাদিসের আওতাভুক্ত নয়।


৪. ঈমান চলে গেলে বিয়ে ভেঙে যাওয়ার শঙ্কা

যেহেতু ঈমান নষ্ট হয়নি, সেহেতু বিবাহ ভঙ্গ হওয়ার কোনো প্রশ্নই নেই। আপনাকে শুধু শয়তানের ওয়াসওয়াসা (কুমন্ত্রণা) থেকে বাঁচতে হবে। নবী (সা.) বলেন:

"إِنَّ الشَّيْطَانَ يَأْتِي أَحَدَكُمْ فَيَقُولُ: مَنْ خَلَقَ كَذَا؟ مَنْ خَلَقَ كَذَا؟ حَتَّى يَقُولَ: مَنْ خَلَقَ رَبَّكَ؟ فَإِذَا بَلَغَهُ فَلْيَسْتَعِذْ بِاللَّهِ وَلْيَنْتَهِ"
"শয়তান তোমাদের কাছে এসে বলে: এটা কে সৃষ্টি করল? ওটা কে সৃষ্টি করল? এমনকি সে বলে: তোমার রব কে সৃষ্টি করল? যদি এ অবস্থায় পৌঁছে, তবে সে যেন আল্লাহর কাছে আশ্রয় চায় এবং থেমে যায়।"
(সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩২৭৬)

আপনার মনের এই ভয়ও ওয়াসওয়াসা। আপনি ইস্তিগফার ও দু‘আ করে নিশ্চিন্ত থাকুন।


৫. আমার পরামর্শ

১. আপনি ইতিমধ্যেই ইস্তিগফার ও দু‘আ করেছেন, এটি যথেষ্ট। এ বিষয়ে আর কোনো চিন্তা করবেন না।
২. ঈমান ও তাকওয়া বাড়ানোর জন্য বেশি করে কুরআন তিলাওয়াত, নামাজ, জিকির ও দ্বীনি ইলম অর্জন করুন।
৩. মাসয়ালা ঘাটাঘাটি করে ভয়ের মধ্যে থাকবেন না। বরং নির্ভরযোগ্য আলেম বা মুফতির কাছ থেকে সরাসরি জেনে নিন।
৪. শয়তানের ওয়াসওয়াসা থেকে বাঁচতে প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যা ‘আ‘উযু বিল্লাহি মিনাশ শয়তানির রাজীম’ পড়ুন এবং ‘সুরা নাস’ ও ‘সুরা ফালাক’ তিলাওয়াত করুন।


সারসংক্ষেপ:

আপনার (জননী সাহেবা) ঈমান অক্ষুণ্ণ আছে। নামাজকে ‘পেরা’ বলায় কোনো কুফর হয়নি, কেননা তা অনিচ্ছাকৃত ও অপমানজনক উদ্দেশ্য ছাড়া হয়েছে। আপনার বিবাহও বৈধ আছে। আল্লাহ আপনার ঈমান ও আমল কবুল করুন এবং আপনাকে শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে হিফাজত করুন। আমিন।

وَاللّٰهُ أَعْلَمُ بِالصَّوَابِ



This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.