হারাম সম্পর্ক থেকে বের হতে না পারা এক মুসলিম বোনের জন্য ইসলামী সমাধান।
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
Answer
উত্তর:
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রথমেই বলে রাখি, আপনার পরিচিত বোনের এই অবস্থা অত্যন্ত সঙ্কটজনক। হারাম সম্পর্কে লিপ্ত থাকা একটি বড় গুনাহ এবং তা থেকে বেরিয়ে আসা প্রত্যেক মুসলিমের জন্য ফরজ। তবে আল্লাহ তাআলা বলেন,
"আর যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য (উদ্ধারের) পথ বের করে দেন এবং তাকে এমন জায়গা থেকে রিজিক দেন যা তার ধারণার বাইরে।" (সূরা আত-তালাক: ২-৩)
আপনার বোন যেহেতু বারবার চেষ্টা করেও বের হতে পারছেন না, তার মূল কারণ হলো শয়তানের প্ররোচনা এবং ভয়—ভয় যে তার পরিবার জানতে পারলে কী হবে। এই ভয় তাকে আবার সেই হারাম সম্পর্কে ঠেলে দিচ্ছে। অথচ এখানে মূল ভয়টা হওয়া উচিত আল্লাহর গজব ও শাস্তির।
সমাধান ও করণীয়:
১. তওবা ও ইস্তিগফার:
প্রথম পদক্ষেপ হলো আল্লাহর কাছে আন্তরিক তওবা করা। তওবা কবুলের শর্ত হলো:
- গুনাহ থেকে পুরোপুরি বিরত থাকা।
- ভবিষ্যতে আর না করার দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করা।
- অতীতের জন্য অনুতপ্ত হওয়া।
আল্লাহ বলেন, "নিশ্চয়ই আল্লাহ তওবাকারীদের এবং পবিত্রতা অবলম্বনকারীদের ভালোবাসেন।" (সূরা আল-বাকারা: ২২২)
২. সম্পর্ক পুরোপুরি ছিন্ন করা:
তাকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সেই ছেলের সাথে সমস্ত যোগাযোগ বন্ধ করতে হবে। মোবাইল, সোশ্যাল মিডিয়া, কল—সব বন্ধ করে দিতে হবে। কারণ যতক্ষণ পর্যন্ত সম্পর্কের সেতু থাকবে, ততক্ষণ শয়তান প্রভাব বিস্তার করতে থাকবে।
ইমাম আবু হানিফা (রহ.) বলেছেন, "হারাম থেকে বাঁচার জন্য যা কিছু প্রয়োজন, তা করা ওয়াজিব।" (আল-হিদায়া)
৩. একাকীত্ব ও নিঃসঙ্গতা থেকে দূরে থাকা:
নিজেকে একা না রাখা। বন্ধু-বান্ধব বা পরিবারের সদস্যদের সাথে সময় কাটানো। বেশি বেশি নামাজ, কুরআন তিলাওয়াত এবং জিকির করা।
৪. ভয় দূর করার উপায়:
তাকে বুঝাতে হবে যে, মানুষের ভয় আল্লাহর ভয়ের চেয়ে বড় হওয়া উচিত নয়। যদি সে সত্যিই তওবা করে এবং আল্লাহর ওপর ভরসা করে, তাহলে আল্লাহ তাকে এমন পথ দেখাবেন যা তার কল্পনার বাইরে। হাদিসে এসেছে,
"যে ব্যক্তি আল্লাহর ভয়ে কোনো জিনিস ত্যাগ করে, আল্লাহ তাকে তার চেয়ে উত্তম জিনিস দান করেন।" (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ২১৩৭৪)
৫. পরিবারকে জানানোর দরকার নেই:
যদি এখনও বিষয়টি পরিবার না জানে, তাহলে জানানোর প্রয়োজন নেই। বরং গোপনে তওবা করে সম্পর্ক ছিন্ন করাই উত্তম। কারণ প্রকাশ করলে ফিতনা বাড়তে পারে। তবে যদি ভয় থাকে যে, সম্পর্ক জোরদার হয়ে গেলে বিয়ে বা অন্য কোনো সমস্যা দেখা দেবে, তাহলে অভিভাবকদের জানানো জরুরি।
৬. অভিভাবক ও আলেমের সাহায্য নেওয়া:
যদি নিজে একা বের হতে না পারেন, তাহলে কোনো বিশ্বস্ত আলেম বা পরিবারের সদস্য (যাদের ওপর আস্থা আছে) তাদের কাছে বিষয়টি খুলে বলতে পারেন। তারা তাকে সঠিক পরামর্শ ও সহায়তা দিতে পারবেন।
ফাতাওয়া ও গ্রন্থের রেফারেন্স:
- ফাতাওয়া উসমানী (মুফতি তাকী উসমানি): হারাম সম্পর্ক থেকে বের হওয়া ফরজ। যদি তা সম্ভব না হয়, তাহলে অন্ততপক্ষে সব ধরনের যোগাযোগ বন্ধ করা আবশ্যক।
- রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবেদিন): যে ব্যক্তি নিজের গুনাহের জন্য লজ্জিত এবং তওবা করে, আল্লাহ তার তওবা কবুল করেন।
- বেহেশতি জেওর (মাওলানা আশরাফ আলী থানভী): তওবা করার সময় সম্পূর্ণভাবে গুনাহের পরিবেশ ও কারণ ছেড়ে দিতে হবে।
সতর্কবার্তা:
যারা হারাম সম্পর্কে লিপ্ত থাকে, তাদের জন্য দুনিয়া ও আখিরাতে গুরুতর শাস্তি রয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,
"কোনো ব্যক্তি ব্যভিচার করে যদি সে মুমিন থাকে তাহলে তা করে না।" (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৪৭৫)
সুতরাং বিলম্ব না করে এখনই তওবা করে নিজেকে সংশোধন করা জরুরি। আল্লাহ তাআলা তাকে হেদায়েত দান করুন এবং এই কঠিন সময়ে উদ্ধারের পথ দেখিয়ে দিন। আমীন।