স্বপ্নে মৃত্যুর পূর্বাভাস দেখা কি ইসলামী দৃষ্টিতে স্বাভাবিক?
Faith and Belief · Hanafi
Question
আমি একটি বিষয় নিয়ে জানতে চাচ্ছিলাম। বিষয়টি অনেক আগের, কিন্তু এর উত্তর আমি কখনো পাইনি।
বিষয়টি স্বপ্ন নিয়ে। আগে আমার এমন হতো যে, আমাদের পরিবারের কেউ মারা যাওয়ার আগে আমি অদ্ভুত কিছু স্বপ্ন দেখতাম। এতে আমার খুব ভয় ঢুকে গিয়েছিল। কখনো দাঁত পড়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখতাম, আবার কখনো ঠিক যে পরিবারে মৃত্যু হবে, সেই দিকের কাউকে স্বপ্নে মারা যেতে দেখতাম। এমন ঘটনা একাধিকবার হয়েছে।
এতটাই ভয় পেতাম যে, শেষবার যখন এমন একটি স্বপ্ন দেখলাম, তখন আমার ভাইকে সবকিছু মেসেজে লিখে পাঠিয়েছিলাম। শুনেছিলাম, স্বপ্ন কাউকে বলে দিলে নাকি তা বাস্তব হয় না।
সেই স্বপ্নে আমার মনে হয়েছিল, আমার আব্বুর দিকের আত্মীয়দের মধ্যে—বিশেষ করে আমার ফুপুর দিকের কারও মৃত্যু হবে। এরপর ১০ দিন পর্যন্ত কিছুই হয়নি। আমি ভেবেছিলাম, হয়তো আর কিছু হবে না। কিন্তু ১০ম দিনে হঠাৎ খবর পেলাম যে, আমার আব্বুর খালাতো বোন (যাকে আমরা ফুপি বলি)-এর ভাই বিদেশে আত্মহত্যা করেছেন। খবরটি শুনে আমি খুবই অবাক ও মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলাম।
তবে এই ঘটনার পর থেকে আর কখনো এমন ধরনের স্বপ্ন দেখিনি।
আমার প্রশ্ন হলো, ইসলামের দৃষ্টিতে বা সাধারণভাবে এমন ঘটনা কি স্বাভাবিক? এর কোনো ব্যাখ্যা আছে কি?
Answer
উত্তর:
ওয়ালাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
প্রশ্নের জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। আপনার বর্ণিত ঘটনা ও স্বপ্ন নিয়ে ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেওয়া যাচ্ছে।
ইসলামে স্বপ্নের প্রকারভেদ
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"الرُّؤْيَا الصَّالِحَةُ مِنَ اللهِ، وَالحُلْمُ مِنَ الشَّيْطَانِ"
"সৎ স্বপ্ন আল্লাহর পক্ষ থেকে, আর দুঃস্বপ্ন শয়তানের পক্ষ থেকে।"
(সহীহ বুখারী, হাদীস: ৬৫৯২; সহীহ মুসলিম, হাদীস: ২২৬১)
ইসলামী শিক্ষা অনুযায়ী স্বপ্ন তিন প্রকার:
- রহমানি স্বপ্ন (আল্লাহর পক্ষ থেকে): যা সত্য হয় এবং কল্যাণের ইঙ্গিত বহন করে।
- শয়তানি স্বপ্ন: যা ভীতি প্রদর্শন বা মনের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টির জন্য হয়।
- নফসানি স্বপ্ন: যা দৈনন্দিন চিন্তা-ভাবনা বা মানসিক অবস্থার প্রতিফলন।
আপনার স্বপ্নের ব্যাখ্যা
আপনার বর্ণিত স্বপ্নগুলো (যেমন: দাঁত পড়ে যাওয়া, আত্মীয়ের মৃত্যু দেখা) এবং সেগুলো বাস্তবে ঘটার ঘটনা ইঙ্গিত করে যে এগুলো রহমানি স্বপ্ন বা সত্য স্বপ্ন হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। কারণ:
- হাদীসে এসেছে:
"مَنْ رَآنِي فِي الْمَنَامِ فَقَدْ رَآنِي، فَإِنَّ الشَّيْطَانَ لَا يَتَمَثَّلُ بِي"
"যে ব্যক্তি আমাকে স্বপ্নে দেখে, সে সত্যিই আমাকে দেখে; কারণ শয়তান আমার আকার ধারণ করতে পারে না।"
(সহীহ বুখারী, হাদীস: ৬৯৯৩)
তবে স্বপ্নে মৃত্যু বা বিপদের ইঙ্গিত দেখা গায়েব জানার বিষয় নয়; বরং এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি সতর্কবাণী বা পরীক্ষা হতে পারে। আল্লাহ বলেন:
"وَمَا هُمْ بِعَالِمِينَ الْغَيْبَ إِلَّا مَنِ ارْتَضَىٰ مِنْ رَسُولٍ"
"তারা গায়েব জানে না, তবে আল্লাহ তাঁর মনোনীত রাসূলদেরকে (যতটুকু ইচ্ছা) জানান।"
(সূরা আল-জিন: ২৬-২৭)
স্বপ্ন কাউকে বলার বিষয়টি
আপনি শুনেছিলেন যে, স্বপ্ন কাউকে বললে তা বাস্তব হয় না। ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি সম্পূর্ণ সঠিক নয়। বরং হাদীসে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে:
- ভালো স্বপ্ন দেখলে তা শুধু প্রিয়জন বা জ্ঞানী ব্যক্তিকে বলা উচিত।
- মন্দ স্বপ্ন দেখলে তা কাউকে না বলা এবং বাম দিকে তিনবার থুথু ফেলে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাওয়া উচিত।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"إِذَا رَأَى أَحَدُكُمْ رُؤْيَا يُحِبُّهَا فَإِنَّمَا هِيَ مِنَ اللهِ، فَلْيَحْمَدِ اللهَ عَلَيْهَا وَلْيُحَدِّثْ بِهَا، وَإِذَا رَأَى غَيْرَ ذَلِكَ مِمَّا يَكْرَهُ فَإِنَّمَا هِيَ مِنَ الشَّيْطَانِ، فَلْيَسْتَعِذْ بِاللهِ مِنْ شَرِّهَا، وَلَا يَذْكُرْهَا لِأَحَدٍ فَإِنَّهَا لَا تَضُرُّهُ"
"তোমাদের কেউ যদি পছন্দনীয় স্বপ্ন দেখে, তবে তা আল্লাহর পক্ষ থেকে—সুতরাং সে যেন আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে এবং স্বপ্নটি (উপযুক্ত ব্যক্তিকে) বলে। আর যদি অপছন্দনীয় স্বপ্ন দেখে, তবে তা শয়তানের পক্ষ থেকে—সে যেন এর ক্ষতি থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চায় এবং কাউকে না বলে; তাহলে তা তার কোনো ক্ষতি করবে না।"
(সহীহ বুখারী, হাদীস: ৭০৪৪; সহীহ মুসলিম, হাদীস: ২২৬১)
আপনার ক্ষেত্রে স্বপ্নটি মৃত্যুর ইঙ্গিত বহন করায় সম্ভবত এটি মন্দ স্বপ্নের পর্যায়ে পড়ে। তবে এটি যে সত্য হয়েছে, তাতে বোঝা যায় যে এটি শয়তানের প্ররোচনা নয়, বরং আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি ইশারা ছিল। তবে সাধারণ নিয়ম হলো—মন্দ স্বপ্ন দেখলে তা কাউকে না বলা এবং আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাওয়া।
ঘটনাটির স্বাভাবিকতা ও ব্যাখ্যা
ইসলামের দৃষ্টিতে এ ধরনের ঘটনা স্বাভাবিক এবং এর ব্যাখ্যা আছে:
- ইলহাম বা অন্তর্দৃষ্টি: কোনো ব্যক্তির মধ্যে আল্লাহ তাআলা এমন ক্ষমতা রাখতে পারেন যার মাধ্যমে তিনি কিছু ঘটনার পূর্বাভাস পান। এটি ইলহাম বা ফিরাসাত নামে পরিচিত। হাদীসে আছে:
"اتَّقُوا فِرَاسَةَ الْمُؤْمِنِ، فَإِنَّهُ يَنْظُرُ بِنُورِ اللهِ"
"মুমিনের ফিরাসাত (অন্তর্দৃষ্টি) থেকে সাবধান থাকো; কারণ সে আল্লাহর নূর দ্বারা দেখে।"
(সুনান তিরমিযী, হাদীস: ৩১২৭)
-
পরীক্ষা: এটি আপনার জন্য একটি পরীক্ষা ছিল। আপনি যখন স্বপ্ন দেখে ভয় পেয়েছেন এবং ভাইকে জানিয়েছেন, তখন এটি আপনার মানসিক অবস্থার প্রমাণ। ঘটনা সত্যি হওয়ার পর আপনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়লেও, পরবর্তীতে আর এসব স্বপ্ন না দেখা ইঙ্গিত দেয় যে এটি একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ছিল।
-
শয়তানের প্রভাব নয়: আপনার স্বপ্ন সত্যি হওয়ায় এটা শয়তানি স্বপ্ন নয়। বরং তা আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি সতর্কবাণী অথবা আপনার ভালোবাসা ও উদ্বেগের প্রতিফলন হতে পারে।
উপসংহার ও পরামর্শ
- আপনার ঘটনা স্বাভাবিক ইসলামী দৃষ্টিতে। অনেক সাহাবী ও আলিমের ক্ষেত্রেও এমন ঘটনা ঘটেছে।
- স্বপ্ন নিয়ে উদ্বিগ্ন না হওয়া: ইসলামে স্বপ্নের ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে, তবে তাকে গায়েব বা ভবিষ্যদ্বাণী মনে করা উচিত নয়। বরং সৎ স্বপ্ন হলে শুকরিয়া আদায় করুন, আর মন্দ স্বপ্ন হলে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চান।
- ভাইকে মেসেজ করার বিষয়ে: আপনি যা করেছেন, তাতে কোনো গুনাহ নেই। তবে ভবিষ্যতে মন্দ স্বপ্ন দেখলে কাউকে না বলা এবং নিম্নের দোয়া পড়া উত্তম:
"أَعُوذُ بِاللهِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيمِ" (বাম দিকে থুথু ফেলে) এবং "أَعُوذُ بِكَلِمَاتِ اللهِ التَّامَّاتِ مِنْ شَرِّ مَا خَلَقَ" পড়া।
- বাস্তবতার প্রতি মনোযোগ: স্বপ্নের চেয়ে বাস্তব জীবনের আমল ও আল্লাহর ওপর ভরসা করা জরুরি। নিয়মিত নামাজ, দোয়া ও কুরআন তিলাওয়াত করুন।
আল্লাহ তাআলা আপনার ভয় দূর করুন এবং আপনাকে সঠিক পথে পরিচালিত করুন। (আমিন)
রেফারেন্স:
- সহীহ বুখারী (হাদীস: ৬৫৯২, ৬৯৯৩, ৭০৪৪)
- সহীহ মুসলিম (হাদীস: ২২৬১)
- সুনান তিরমিযী (হাদীস: ৩১২৭)
- ফাতাওয়া উসমানী (খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ২৫৪)
- বাহিশতি জেওর (স্বপ্নের ব্যাপক অধ্যায়)
- রদ্দুল মুহতার (খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ৫৪২)