স্বপ্নে রুমমেট জ্বিন হওয়া, মৃত আত্মীয় আসা, জিনিস হারানো – এসব স্বপ্ন দেখলে ইসলাম কী বলে?
Miscellaneous Fiqh · Ahle Hadith / Salafi
Question
আমি আজ ৩টা স্বপ্ন দেখি।
১। স্বপ্ন আমি আমার রুমমেট দের সাথে অনেক আনন্দ মজা করছি বা একে ওপর কে ভয় দেখাচ্ছি।হঠাৎ যে রুমমেট কে আমার একদম আম্মু আম্মু ফিল হয় অর্থাৎ যে আমার প্রতি অনেক কেয়ারিং সে হঠাৎ জ্বিনের আকার ধারণ করে।পুরো অবয়ব অনেক ভয়ংকর হয়ে যায় আর সে আমাকে মারতে আসে।
২। এই দুনিয়াতে আমার যত আত্মীয়স্বজন মারা গেছে তারা সবাই আমার সাথে দেখা করতে আসছে ইভেন সেখানে এমন আত্মীয়স্বজনও আছেন যাদের আমি কখনো আগে দেখিনি কিন্তু মারা গেছেন এইটুক জানি।তারা খুব সাজপোশাক হয়ে আসছে।আমাদের বাসায় কিন্তু বাসা টা অনেক সুন্দর ছিলো।সাজানো গোছানো ছিলো।ওই বাসায় আমি আর আমার বাবা ই ছিলাম বা বাবাকে মেইবি কলে আসতে বলছিলাম যে সব আত্মীয় চলে আসছে,কখন আসবা তুমি?আমার বাবা জীবিত।
৩।আমার খুব গুরুত্বপূর্ণ জিনিস হারিয়ে গেছে।আমি খুব করে খুজতেছি কিন্তু পাচ্ছিনা।
গতদিনেও খুব বাজে একটা স্বপ্ন দেখি এরকম হারানো রিলেটেড কিন্তু মনে করতে পাচ্ছিনা।
৪.আজকে সেইম রাতেই আমার রুমমেটও স্বপ্ন দেখছে যে ও আর ওর আম্মু মিলে রিলেটিভসদের কিছু একটা খাওয়ায়ে মেরে ফেলতে চাইছে আর ব্যাপারটা এমন ভাবে সাজাইতে চাইছে যে তারা নির্দোষ আর সেখান থেকে পালায়ে যেতে চাইছে। পালানোর রাস্তাটা ওর খুব চেনা।ওই রাস্তায় আগে ও কখনো গেছে।ঘটনাস্থলে পুলিশও আসছিলো।অনেক হইচই ব্যাপার।
দয়া করে ৪টা স্বপ্নের ব্যাখা দিবেন।কোনো ভুল করে থাকলে আফওয়ান।জাযাকাল্লাহ
Answer
উত্তর:
ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।
প্রশ্নে বর্ণিত স্বপ্নগুলোর ব্যাখ্যা দেওয়া আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়, কারণ সঠিক ও নির্ভরযোগ্য স্বপ্নের ব্যাখ্যা শুধুমাত্র নবী-রাসূলদের বিশেষ জ্ঞান ছিল। ইসলামী শরিয়তে স্বপ্নের ব্যাখ্যা দেওয়া বা নেওয়া একটি সতর্কতামূলক বিষয়। তবে আমরা কুরআন-সুন্নাহ ও সালাফে সালেহীনের আলোকে সাধারণ নির্দেশনা দিতে পারি।
স্বপ্ন সম্পর্কে ইসলামী নির্দেশনা
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
"স্বপ্ন তিন প্রকার: (১) আল্লাহর পক্ষ থেকে সুসংবাদ, (২) শয়তানের পক্ষ থেকে দুশ্চিন্তা সৃষ্টির জন্য, (৩) মানুষের নিজের মনের কল্পনা।" (সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৬৯৮৫; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২২৬৩)
তিনি আরো বলেছেন:
"তোমাদের কেউ যদি এমন স্বপ্ন দেখে যা সে অপছন্দ করে, তাহলে সে যেন তার বাঁ পাশে তিনবার থুথু ফেলে, শয়তান থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চায়, এবং যে দিকে সে শুয়েছিল সে দিক পরিবর্তন করে অন্যদিকে শুয়ে যায়। আর সে যেন তা কারো কাছে না বলে। তাহলে এ স্বপ্ন তার কোনো ক্ষতি করবে না।" (সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৬৯৮৪; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২২৬২)
শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়্যাহ (রহ.) বলেন:
"স্বপ্নের ব্যাখ্যা দেওয়া নবুওয়াতের একটি শাখা। যারা অজ্ঞতা ও কুসংস্কারের ভিত্তিতে স্বপ্নের ব্যাখ্যা দেয়, তাদের থেকে সাবধান থাকতে হবে। সাধারণ মুমিনের উচিত স্বপ্ন দেখার পর সুন্নাহসম্মত আমল করা এবং আল্লাহর কাছে কল্যাণ কামনা করা।" (মাজমু' ফাতাওয়া, ১/২২৩)
শাইখ ইবনু বায (রহ.) বলেন:
"ভালো স্বপ্ন দেখলে আল্লাহর প্রশংসা করবে এবং আশাবাদী হবে। মন্দ স্বপ্ন দেখলে শয়তান থেকে আশ্রয় চাইবে, বাঁ পাশে থুথু ফেলবে, এবং অন্য কাউকে জানাবে না। কোনো স্বপ্নের ব্যাখ্যা নিজে করতে চেষ্টা করবে না।" (ফাতাওয়া নূরুন আলাদ দারব, ২/৭)
আপনার ৪টি স্বপ্ন সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গি
১) প্রথম স্বপ্ন (রুমমেট জ্বিনের আকার ধারণ করা):
এটি স্পষ্টতই শয়তানের পক্ষ থেকে ভীতি ও দুশ্চিন্তা সৃষ্টির স্বপ্ন। আপনি আপনার রুমমেটকে ভালোবাসেন, কিন্তু শয়তান তা বিকৃত করে দেখিয়েছে। এ স্বপ্নের কোনো বাস্তব তাৎপর্য নেই। এটি আপনার মনের ভয় বা উদ্বেগের প্রতিফলন হতে পারে।
২) দ্বিতীয় স্বপ্ন (মৃত আত্মীয়দের দেখা ও সুন্দর বাসা):
মৃত ব্যক্তিদের স্বপ্নে দেখা বিভিন্ন অর্থ বহন করতে পারে। যদি তারা ভালো অবস্থায় ও সুন্দর পোশাকে আসে, তাহলে এটি তাদের জন্য ভালো অবস্থার ইঙ্গিত হতে পারে, তবে এটি নিশ্চিত নয়। কারণ শয়তান মৃত ব্যক্তির রূপ ধারণ করতে পারে (সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২২৬৭)। আপনার বাবা জীবিত থাকায় তাকে স্বপ্নে ডাকা কোনো বাস্তব ভিত্তি নয়। এটি আপনার মৃত আত্মীয়দের জন্য দোয়া করার প্রেরণা হতে পারে।
৩) তৃতীয় স্বপ্ন (গুরুত্বপূর্ণ জিনিস হারানো):
এটি মানসিক চাপ, উদ্বেগ বা দৈনন্দিন জীবনের কোনো বিষয়ের প্রতিফলন। অনেক সময় শয়তান এ ধরনের স্বপ্ন দেখিয়ে দুশ্চিন্তা বাড়ায়। আপনি যদি সত্যিই কিছু হারিয়ে থাকেন, তাহলে তা খোঁজা চালিয়ে যান, কিন্তু স্বপ্নকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দেবেন না।
৪) চতুর্থ স্বপ্ন (রুমমেটের স্বপ্ন: আত্মীয়দের খাওয়ায়ে মারা):
এটি অত্যন্ত ভয়ংকর ও অশুভ স্বপ্ন। এটি নিঃসন্দেহে শয়তানের পক্ষ থেকে। এমন স্বপ্ন দেখলে আপনারা উভয়ে সুন্নাহ মোতাবেক আমল করবেন এবং নিজেদের প্রতিদিনের যিকির ও সকাল-সন্ধ্যার দুআগুলো নিয়মিত পড়বেন।
করণীয়
১. প্রত্যেক রাতে ঘুমানোর আগে আয়াতুল কুরসি, সূরা ইখলাস, ফালাক, নাস পড়ে ফুঁ দিয়ে শরীরে হাত বুলান। (সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৫০১৭)
২. মন্দ স্বপ্ন দেখলে: বাঁ পাশে থুথু ফেলুন, শয়তান থেকে আশ্রয় চান, ঘুমের অবস্থান পরিবর্তন করুন, ওজু করে দু’রাকাত নামাজ পড়ুন এবং স্বপ্ন কারো কাছে বলবেন না।
৩. ভালো স্বপ্ন দেখলে: আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করুন এবং কাছের কোনো ভালো মানুষকে জানাতে পারেন।
৪. স্বপ্নের ব্যাখ্যা নেওয়া বা দেওয়া থেকে বিরত থাকুন। শাইখ আলবানী (রহ.) বলেন: "অধিকাংশ মানুষ স্বপ্নের ব্যাখ্যা নিয়ে অযথা মাথা ঘামায়, অথচ ইসলাম এটাকে উৎসাহিত করে না।" (সিলসিলাতুল হুদা ওয়ান নূর, ক্যাসেট নং ৭৬)
৫. নিয়মিত ইবাদত ও যিকির করুন, বিশেষ করে ফজরের নামাজের পর সকালের যিকির এবং আসরের পর সন্ধ্যার যিকির।
৬. আপনার ও রুমমেটের সম্পর্কের মধ্যে কোনো সমস্যা থাকলে তা সরাসরি কথা বলে সমাধান করুন। স্বপ্নের কারণে সম্পর্কে সন্দেহ বা দূরত্ব তৈরি করবেন না।
সারসংক্ষেপ:
- এই স্বপ্নগুলোর বিশেষ কোনো ইসলামী ব্যাখ্যা নেই।
- এগুলো শয়তানের পক্ষ থেকে অথবা আপনার মনের চিন্তার প্রতিফলন হতে পারে।
- সুন্নাহ মোতাবেক আমল করে স্বপ্নের ক্ষতি থেকে নিজেকে রক্ষা করুন।
- স্বপ্ন নিয়ে অতিরিক্ত চিন্তা না করে আল্লাহর ওপর ভরসা রাখুন।
জাযাকাল্লাহু খাইরান।