হানাফি মাযহাব মানা কতটুকু সঠিক?
Faith and Belief · Hanafi
Question
কুরআন ও সুন্নাহ অনুযায়ী মাযহাব মানা জায়েজ কি? মাযহাব মানলে নিজেকে হানাফি বা অন্য মাযহাবী বলে পরিচয় দেওয়া কতটা সঠিক, শুধু মুসলিম বলে পরিচয় থাকা যথেষ্ট নয় কি? হাদিসে এসেছে এই উম্মাহ ৭৩টা দলে বিভক্ত হবে শুধুমাত্র একটি দল জান্নাতে যাবে। মাযহাব মানার ফলে উম্মাহ বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে যায় কিনা?, রাসুল ﷺ ও সাহাবিদের (রা.) এর যুগে তো এগুলো ছিলো না।
আফওয়ান প্রশ্ন বড় বা বিস্তারিত করার জন্য, কিন্তু আমি এগুলো সব জানতে চাচ্ছি মিন ফাদ্বলিক।
Answer
بسم الله الرحمن الرحيم
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রশ্নকারীকে ধন্যবাদ। আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং বর্তমান যুগে অনেকের মনে একই দ্বিধা কাজ করে। আমি কুরআন, হাদিস ও হানাফি ফিকহের আলোকে বিশদভাবে উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করব, ইনশাআল্লাহ।
১. মাযহাব মানা কি জায়েজ?
মাযহাব মানা জায়েজ এবং বরং প্রয়োজনীয়, তবে শর্ত হলো তা কুরআন ও সুন্নাহর বিরোধী না হওয়া। মাযহাব মূলত কুরআন-সুন্নাহ বুঝার এবং আমল করার একটি পদ্ধতি। ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-সহ অন্যান্য ইমামগণ কুরআন ও হাদিসের ভিত্তিতেই ফিকহি সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। সুতরাং কোনো মাযহাব অনুসরণ করা কুরআন-সুন্নাহ ত্যাগ করা নয়, বরং সেই সূত্র ধরেই আমল করা।
আল্লাহ বলেন:
"তোমরা জিজ্ঞাসা করো আহলে জিকরকে (বিদ্বানদেরকে), যদি তোমরা না জানো।" (সূরা আন-নাহল: ৪৩)
এই আয়াতের ভিত্তিতে যারা নিজেদের জ্ঞানের অভাববোধ করেন, তারা বিদ্বানদের অনুসরণ করেন, যা মাযহাব অনুসরণের মূল ভিত্তি।
হাদিসে এসেছে:
"আমার উম্মতের মধ্যে মতভেদ রহমত।" (বায়হাকী, শুআবুল ঈমান)
এই মতভেদ সাহাবীদের যুগেও ছিল, যেমন ইবনে আব্বাস (রা.) ও ইবনে মাসউদ (রা.)-এর মধ্যে কয়েকটি মাসআলায় ভিন্নতা ছিল। কিন্তু তারা কাউকে গোমরাহ বলেননি।
২. নিজেকে হানাফি বা অন্য মাযহাবী বলে পরিচয় দেওয়া কি সঠিক?
নিজেকে হানাফি, শাফেয়ি ইত্যাদি বলা জায়েজ, তবে শর্ত হলো তা গোষ্ঠী-অহংকার বা বিভেদের কারণ না হয়। বরং এটি শিক্ষার্থী বা আমলকারীর পদ্ধতিগত পরিচয় মাত্র। যেমন কেউ যদি বলে "আমি হানাফি মাযহাব অনুসরণ করি", তাহলে এর অর্থ তিনি ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর ফিকহি পদ্ধতি মানেন, যা তিনি কুরআন-সুন্নাহ থেকে গ্রহণ করেছেন।
ইমাম আবু হানিফা (রহ.) নিজে বলেছেন:
"যদি হাদিস সহিহ হয়, তবে সেটাই আমার মাযহাব।" (ইবনে আবিদীন, রাদ্দুল মুহতার)
সুতরাং মাযহাব মানা মানে হাদিস ত্যাগ করা নয়, বরং হাদিস বুঝার একটি নির্ভরযোগ্য মাধ্যম।
শুধু "মুসলিম" বলে পরিচয় দেওয়া যথেষ্ট, কিন্তু এটি মাযহাব অস্বীকারের কারণ নয়। কেননা মাযহাব ইসলামের অংশ, বরং ইসলামকে বাস্তবায়নের একটি পদ্ধতি।
৩. ৭৩ দলে বিভক্ত হওয়ার হাদিস ও মাযহাব
হাদিসে এসেছে:
"ইয়াহুদী-নাসারারা ৭১-৭২ দলে বিভক্ত হয়েছিল। আমার উম্মত ৭৩ দলে বিভক্ত হবে। সবাই জাহান্নামে যাবে, শুধু একটি দল (জামাআত) ছাড়া।" (তিরমিজি, আবু দাউদ)
এই বিভক্তি আকিদাগত (বিশ্বাসগত), ফিকহি (আমলগত) নয়। ফিকহি মাযহাবের কারণে উম্মাহ বিভক্ত হয়নি; বরং তারা সবাই একই আকিদার উপর (তাওহিদ, রিসালাত, আখিরাত) ঐক্যবদ্ধ। মাযহাব শুধু আমলের পদ্ধতি ভিন্ন, যা সাহাবীদের যুগেও ছিল। রাসূল ﷺ ও সাহাবীদের যুগে মাযহাব নামে কিছু ছিল না, কিন্তু সাহাবীরা নিজেদের মধ্যে ফিকহি মাসআলায় ভিন্নমত পোষণ করতেন এবং তা গ্রহণযোগ্য ছিল। তাই মাযহাব মানা উম্মাহকে বিভক্ত করে না, বরং ফিকহি ইখতিলাফকে সুশৃঙ্খল করে।
৪. মাযহাব মানার প্রয়োজনীয়তা
আজকের যুগে জ্ঞানের ঘাটতি এবং হাদিস বোঝার জটিলতার কারণে একজন সাধারণ মুসলিমের জন্য কোনো নির্ভরযোগ্য মাযহাব অনুসরণ করা নিরাপদ। ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মাযহাব সবচেয়ে প্রাচীন ও বিশুদ্ধ, যা কুরআন-সুন্নাহ এবং ইজমা-কিয়াসের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত।
ইমাম তাহাবী (রহ.) বলেন:
"যে ব্যক্তি হানাফি মাযহাব অনুসরণ করে, সে আসলে রাসূল ﷺ-এর সুন্নাহ অনুসরণ করছে, কারণ ইমাম আবু হানিফা (রহ.) তা-ই অনুসরণ করতেন।" (শারহু মা'আনিল আসার)
উপসংহার
- মাযহাব মানা জায়েজ এবং বরং অল্পজ্ঞদের জন্য প্রয়োজনীয়।
- নিজেকে হানাফি বলে পরিচয় দেওয়া নাজায়েজ নয়, তবে তা অহংকারের কারণ না হয়।
- ৭৩ দলে বিভক্ত হওয়ার হাদিসটি আকিদাগত বিভেদ নিয়ে, ফিকহি মাযহাব নিয়ে নয়।
- সাহাবীদের যুগে ফিকহি ইখতিলাফ ছিল, যা মাযহাবের ভিত্তি।
আল্লাহ আমাদের সবাইকে সঠিক পথে চলার তাওফিক দিন। (আমিন)
وَاللَّهُ أَعْلَمُ بِالصَّوَابِ