স্বপ্নে পিতার কবর, মুখ দেখা ও মাটি তোলা – ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে এর ব্যাখ্যা কী?

Miscellaneous Fiqh · Hanafi

Question No: 3124
Questioner: Ishika Ashraf
Question Asked: 25 Jul 2026, 11:09 PM
Reviewed & Published: 25 Jul 2026, 11:13 PM
Views: 26
Tokens: 7,185
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহ। আমার এক বান্ধবি জানতে চেয়েছে...

❝আমি স্বপ্নে হঠাৎ দেখছি কারা যেন (মনে হলো আমার পরিচিত কোনো ছেলে, মানে এক ক্লাসে পড়ি যাদের সাথে; তবে এটাও শিওর না) আব্বুর কবরের ওখান থেকে মাটি উঠাচ্ছে। কি যেন দরকারে তুলছিল। তো আমি পাশে দাঁড়িয়ে ছিলাম আর বলছিলাম এটা আমার আব্বুর কবর। কিন্তু কাউকে নিষেধ করছিলাম না। আবার প্রথম দিকে যে ওটা কবর ছিলো এটাও ভাবিনি। হঠাৎ স্বপ্নের মধ্যে মনে হলো।
যদিও বাস্তবে আব্বুর কবর যেখানে সেই জায়গার সাথে ওটার কোনো মিল নাই।

এরপর দেখছি কবর থেকে আব্বুর মুখ একপাশ দেখা যাচ্ছে। তো ওটা দেখে আমি অস্থির হয়ে গেছি। যে যাচ্ছে তাকেই বলছি আব্বুর মুখ দেখা যাচ্ছে আপনারা ঢেকে দেন। কিন্তু কেউ ঢাকছে না। তারপর আমিই আশেপাশের মাটি মুখের উপর দিচ্ছি। কিন্তু মুখ ঢাকছে না। তারপর হঠাৎ একটু ঢেকে গেলো। তারপর দেখছি আব্বু শুয়ে শুয়েই কেমন জানি মাথা নাড়াচ্ছে।এই দৃশ্যটা দূর থেকে দেখেছি। বাকি সব কিছুই কাছ থেকে দেখা। কিন্তু আশ্চর্যভাবে আব্বুর মুখ আমি তখন যেমন দেখেছি সেটা আমার এখন কিছুতেই মনে পড়ছে না।
কিন্তু এটা মনে আছে যে আমি স্বপ্নের মধ্যে ভালো করেই দেখেছি মুখ। আর বলছিলাম আব্বু পুরো সেই আগের মতোই আছে আর চুলও পাকেনি।
তারপর শেষে কি দেখছি কিছু মনে নাই। যেইটুকু খন্ড খন্ড করে মনে ছিলো সবই বললাম।
এমন স্বপ্ন কেনো দেখলাম? আল্লাহ কি আমাকে কোনো বার্তা দিতে চাচ্ছেন? রাতে ঘুমানোর আগে যে আব্বুর কথা ভেবেছি এমনও না। আর আসতাগফিরুল্লাহ পড়তে পড়তে ঘুমাইছি ( যতটুকু মনে আছে )❞

Answer

উত্তর

وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

প্রিয় বান্ধবী, আপনার স্বপ্নের বিবরণ পড়ে বুঝা যায় যে, এটি একটি অস্থির ও ভীতিপ্রদ স্বপ্ন। ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে স্বপ্ন তিন প্রকার: (১) আল্লাহর পক্ষ থেকে সুসংবাদ, (২) শয়তানের পক্ষ থেকে ভীতি ও অস্থিরতা, (৩) নিজের মনগড়া কল্পনা (যা দিনের চিন্তা-ভাবনার প্রতিফলন)। আপনার বর্ণিত স্বপ্নটি সম্ভবত দ্বিতীয় বা তৃতীয় প্রকারের, কেননা এতে কবর, মৃতের মুখ দেখা ইত্যাদি ভয়াবহ দৃশ্য রয়েছে যা সাধারণত শয়তানের কুমন্ত্রণা বা নিজের অবচেতন মনের প্রতিফলন হয়।

হানাফী ফিকহের কিতাব ও উলামায়ে কেরামের বক্তব্য অনুযায়ী:

১. স্বপ্নের ব্যাখ্যা না করার নির্দেশনা:

  • রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: “যখন তোমাদের কেউ এমন স্বপ্ন দেখে যা সে পছন্দ করে না, তখন সে যেন বাম দিকে তিনবার থুথু ফেলে এবং তিনবার ‘আউযু বিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজীম’ পড়ে, আর শয্যা পরিবর্তন করে নেয়। আর সে যেন এ স্বপ্ন কারো কাছে না বলে। তাহলে এ স্বপ্ন তার কোনো ক্ষতি করবে না।” (সহীহ মুসলিম, হাদীস: ২২৬২)
  • তাই আপনার বান্ধবীকে বলুন, তিনি যেন এই স্বপ্নের কথা অন্য কাউকে না বলেন (পূর্বেই বলে ফেললে এখন আর কিছু করার নেই), এবং উক্ত আমলগুলো করেন।

২. মৃত ব্যক্তির কবর বা মুখ দেখা সম্পর্কে:

  • হানাফী ফকীহ ইবনে আবেদীন শামী (রহ.) রদ্দুল মুহতার গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, মৃত ব্যক্তিকে স্বপ্নে দেখা বাস্তবের মতোই হয়, তবে স্বপ্নের দৃশ্য শয়তানের বিকৃতিও হতে পারে। (রদ্দুল মুহতার, ১ম খণ্ড, কিতাবুত তাহারাহ)
  • ইমদাদুল ফাতাওয়া (আশরাফ আলী থানভী) তে বলা হয়েছে, মৃতকে স্বপ্নে দেখলে তা যদি ভীতিকর হয়, তবে সেটি শয়তানের প্ররোচনা হতে পারে; তাই এ নিয়ে চিন্তা না করে আল্লাহর কাছে মৃতের জন্য দো‘আ করতে হবে।
  • ফাতাওয়া উসমানী (মুফতি তকী উসমানী) তে এসেছে, মৃত ব্যক্তির স্বপ্ন সাধারণত বাস্তবের প্রতিচ্ছবি নয়; বরং জীবিত ব্যক্তির মনের অবস্থার প্রতিফলন। তাই কোনো বার্তা বা ভবিষ্যদ্বাণী মনে না করাই উত্তম।

৩. আল্লাহর পক্ষ থেকে বার্তা হওয়ার সম্ভাবনা:

  • স্বপ্ন যদি অত্যন্ত স্পষ্ট, নবী-ওলীদের স্বপ্নের মতো হয় এবং তাতে কোনো শরীয়ত বিরোধী বিষয় না থাকে, তাহলে তা সত্য স্বপ্ন হতে পারে। কিন্তু আপনার বর্ণিত স্বপ্নে কবর থেকে মাটি তোলা, মুখ দেখা, মাটি দিয়ে ঢাকার চেষ্টা — এসব দৃশ্য বিভ্রান্তিকর এবং শয়তানের কুমন্ত্রণার মতো।
  • হাদীসে এসেছে: “সত্য স্বপ্ন আল্লাহর পক্ষ থেকে, আর মিথ্যা স্বপ্ন শয়তানের পক্ষ থেকে।” (বুখারী, হাদীস: ৬৯৮৪)
  • যেহেতু আপনি ঘুমানোর আগে ‘আস্তাগফিরুল্লাহ’ পড়েছিলেন, এটি একটি নেক কাজ, কিন্তু শয়তান তখনও কুমন্ত্রণা দিতে পারে। তাই স্বপ্নকে আল্লাহর বার্তা ভাবার প্রয়োজন নেই।

৪. কবর, মৃত ব্যক্তি ও মাটির দৃশ্যের ব্যাখ্যা:

  • সাধারণত স্বপ্নে কবর দেখা মৃত্যু, দুশ্চিন্তা অথবা পরকালের ভাবনার ইঙ্গিত দেয়। কিন্তু হানাফী উলামায়ে কেরাম (যেমন, আল্লামা ইবনে আবেদীন) সতর্ক করেছেন যে, স্বপ্নের ব্যাখ্যা দেওয়া বিদ্বানের কাজ, আর সাধারণ মানুষের উচিত নিজের স্বপ্নের ব্যাখ্যা নিজে না করা।
  • বাহিশতী জেওয়ার (আশরাফ আলী থানভী) তে বলা হয়েছে: “যদি কেউ অশুভ বা ভয়ংকর স্বপ্ন দেখে, তবে সে যেন আল্লাহর কাছে পানাহ চায় এবং সেই স্বপ্ন নিয়ে গবেষণা না করে।”

সারসংক্ষেপ ও পরামর্শ:

  • আপনার বান্ধবীকে বলুন, তিনি যেন এ স্বপ্ন নিয়ে কোনো চিন্তা না করেন। এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে কোনো বার্তা নয়, বরং শয়তানের প্ররোচনা বা নিজের মনের কল্পনা।
  • তিনি যেন নিম্নোক্ত আমল করেন:
    • ঘুম থেকে উঠে বাম দিকে তিনবার থুথু ফেলেন (শুধু ফু দিলেই হবে, থুথু না ফেললেও চলবে)।
    • তিনবার ‘আউযু বিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজীম’ পড়েন।
    • শয্যা পরিবর্তন করে অন্য দিকে ঘুমান (যদি আবার ঘুমাতে চান)।
    • স্বপ্নের কথা কাউকে না বলেন (আল্লাহর কাছে ক্ষমা চেয়ে নিন, যেহেতু ইতিমধ্যে বলেছেন)।
    • মৃত আব্বুর জন্য বেশি বেশি দো‘আ করুন: “রাব্বানা-গফির লি ওয়ালি-ওয়ালিদাইয়া ওয়ালিল মু’মিনীনা ইয়াওমা ইয়াকুমুল হিসাব” (সূরা ইব্রাহীম: ৪১)
    • সদকা করুন (অর্থ বা খাবার দান করুন) এবং কবর জিয়ারত করলে সুরা ফাতিহা, ইখলাস পাঠ করুন।
  • স্বপ্নের ব্যাখ্যা দেওয়া ফিকহের মূল বিষয় নয়; তাই কোনো ‘স্বপ্নের ব্যাখ্যাকারীর’ কাছে না যাওয়াই উত্তম।

রেফারেন্স (প্রযোজ্য ক্ষেত্রে উদ্ধৃতি):

  • সহীহ মুসলিম: স্বপ্ন সম্পর্কিত হাদীস।
  • রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবেদীন): ১ম খণ্ড, কিতাবুত তাহারাহ।
  • ইমদাদুল ফাতাওয়া (আশরাফ আলী থানভী): স্বপ্ন অধ্যায়।
  • ফাতাওয়া উসমানী (মুফতি তকী উসমানী): স্বপ্ন সংক্রান্ত প্রশ্নোত্তর।
  • বাহিশতী জেওয়ার (আশরাফ আলী থানভী): স্বপ্নের আমল।

আল্লাহ আমাদের সবাইকে সঠিক বুঝ দান করুন। আমীন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.