ইসলামিক ডিপিএসে প্রাপ্ত মুনাফা কি হালাল? সুদী ব্যাংক থেকে বিপদে পড়ে লোন নিলে যে সুদসহ দিতে হয় সেই সুদটা কি ইসলামী ডিপিএসের মুনাফা থেকে দেয়া যাবে?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
Answer
প্রশ্ন: ইসলামিক ডিপিএসে (ডিপোজিট পেনশন স্কিম) প্রাপ্ত মুনাফা কি হালাল? আর সুদী ব্যাংক থেকে বিপদে পড়ে লোন নিলে যে সুদসহ দিতে হয়, সেই সুদ কি ইসলামী ডিপিএসের মুনাফা থেকে দেওয়া যাবে?
উত্তর
بسم الله الرحمن الرحيم
الحمد لله رب العالمين، والصلاة والسلام على سيدنا محمد وعلى آله وأصحابه أجمعين
১. ইসলামিক ডিপিএসের মুনাফা কি হালাল?
ইসলামিক ডিপিএস যদি শরিয়তসম্মত চুক্তির ভিত্তিতে পরিচালিত হয়—যেমন মুদারাবা, মুশারাকা বা বাই’মুয়াজ্জাল—তবে তার মুনাফা হালাল ও পবিত্র। তবে শর্ত হলো, ডিপিএসের তহবিল যেন কোনো সুদী লেনদেন, নিষিদ্ধ পণ্য বা জুয়া-ঘুষ ইত্যাদিতে বিনিয়োগ না হয়। বর্তমানে অনেক ইসলামিক ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান শরিয়াহ বোর্ডের তত্ত্বাবধানে এ ধরনের ডিপিএস পরিচালনা করে। সেগুলোর মুনাফাকে অধিকাংশ ফুকাহায়ে কেরামগন হারাম বলে গণ্য করেন।
قال الله تعالى: ﴿وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا﴾ [البقرة: 275]
(আল্লাহ তা‘আলা বলেন: “আল্লাহ বেচাকেনাকে হালাল এবং সুদকে হারাম করেছেন।”)
وفي "الهداية": "الربا حرام بالإجماع، والتجارة حلال بالنص"
(সুদ সর্বসম্মতিক্রমে হারাম, আর ব্যবসা কুরআনের দলিলে হালাল।)
২. বিপদে পড়ে সুদী ব্যাংক থেকে লোন নেওয়া ও তার সুদ পরিশোধ
প্রথমত, শরিয়তের দৃষ্টিতে সুদী লোন নেওয়া কবিরা গুনাহ। বিপদগ্রস্ত অবস্থায়ও সুদী লোন নেওয়া জায়েজ নয়, যদি অন্য কোনো হালাল উপায় থাকে। তবে যদি জীবন-মৃত্যুর সঙ্কট বা চরম প্রয়োজন (দারূরত) হয়, তাহলে কিছু হানাফি ফকীহ সুদী লোন নেওয়াকে শুধু প্রয়োজনের পরিমাণে রুখসত (অনুমতি) দিয়েছেন, কিন্তু এটিকে জায়েজ (বৈধ) বলেননি; বরং বলেছেন, এটি একটি অপারগতার কারণে অনিচ্ছাকৃত পাপ, তবে পরে তওবা ও ইস্তিগফার করা আবশ্যক।
قال العلامة ابن عابدين في "رد المحتار": "ويحرم أخذ القرض بالربا، وإن اضطر إليه لم يجز، لكن إن خاف على نفسه أو ماله ضررا عظيما جاز مع الكراهة التحريمية، وعليه التوبة"
(সুদী ঋণ নেওয়া হারাম। প্রয়োজনের সময়ও তা জায়েজ নয়। তবে যদি নিজের জীবন বা সম্পদের জন্য মারাত্মক ক্ষতির আশঙ্কা হয়, তাহলে তা মাকরূহে তাহরীমি সহকারে জায়েজ হতে পারে, কিন্তু তওবা ওয়াজিব।) [রদ্দুল মুহতার, ৪/১৭৬]
সুদ পরিশোধ করা: সুদ আদায় করা ও দেওয়া উভয়ই কুরআন-হাদীসে স্পষ্টভাবে হারাম বলা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:
"لعن الله آكل الربا وموكله وكاتبه وشاهديه" (صحيح مسلم)
“আল্লাহ সুদখোর, সুদদাতা, তার লেখক ও সাক্ষীদ্বয়কে লানত করেছেন।”
তাই স্বাভাবিক অবস্থায় সুদ দেওয়া বৈধ নয়। বিপদগ্রস্ত অবস্থায়ও সুদ দেওয়া জায়েজ নয়; বরং ঋণদাতার সঙ্গে কথা বলে শুধু মূল টাকা পরিশোধের চেষ্টা করা উচিত। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বহু ক্ষেত্রে ব্যাংক শুধু মূল টাকা নিতে রাজি হয় না, তখন ঋণগ্রহীতা নিরুপায় হয়ে সুদ দিতে বাধ্য হন। এ অবস্থায় ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, জোরপূর্বক সুদ দিলে তা দাতার পক্ষ থেকে গুনাহ নয়, বরং গ্রহীতার ওপর দোষ বর্তায়। তবে স্বেচ্ছায় সুদ দেওয়া হারাম।
في "الدر المختار": "ولو أكره على بذل الربا فبذله لا يأثم، لأن الإكراه يرفع الإثم"
(যদি কাউকে সুদ দিতে বাধ্য করা হয়, তাহলে তা দিতে গুনাহ হবে না, কারণ জবরদস্তি গুনাহ দূর করে।)
৩. ইসলামিক ডিপিএসের মুনাফা দিয়ে সুদ পরিশোধ করা যাবে কি?
না,যাবেনা। এটিও নাজায়েজ।
সূত্র:
- কুরআনুল কারীম (সূরা বাকারা: ২৭৫, ২৭৮)
- সহীহ মুসলিম, কিতাবুল মুসাকাত
- রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবেদীন) – ৪/১৭৬, ৪/১৮৪
- ফাতাওয়া হিন্দিয়্যা – ৩/২১৪
- ফাতাওয়া উসমানী – ২/৩৪৫
- ইমদাদুল ফাতাওয়া – ৩/৪১২
- আল-হিদায়া – ৩/৮২ (বাবুর রিবা)