কুরবানী করা ওয়াজিব হয়েছে কিনা
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
পরিবারের সদস্য ৭ জন,
১ম- এই জনের উপার্জন অনুযায়ী কুরবানীর সময়ে তার কাছে নেসাব পরিমাণ (৫২.৫ তোলা রুপার দাম/১,৮০,০০০ টাকা) সম্পদ থাকার কথা, ধরে নেই আছে।
২য়- এই জনের ৫-৬ ভরি স্বর্ণ আছে এবং অল্প পরিমাণ টাকা, তবে অন্য সম্পত্তি নাই।
৩য়- এই জনের ব্যবসায়িক মাল হিসাবে কুরবানীর সময়ে নিসাব পরিমাণ থাকার কথা, তবে সেই ব্যবসা আবার প্রথম জনের সাথে শেয়ার করা (পারিবারিক ব্যবসা)। যা আবার ২য় জনের নামে লাইসেন্স করা, যদিও তিনি মহিলা এবং ব্যবসা তে জড়িত না।
৪,৫,৬,৭ তম- এই কয়জন ১ম জনের স্ত্রী এবং সন্তান রা। (যাদের ১ জন নাবালেক, এবং ২ জনের নেসাব পরিমাণ সম্পদ নাই।) স্ত্রীর স্বর্ণ বাবদ নেসাব পরিমাণ সম্পদ না থাকলেও বাকি কিছু মিলে ৫২.৫ তোলা রুপার দাম হবে।
এখন, উপরে উল্লেখিত প্রথম ৩ জন তাদের পিতার (৩য় জনের স্বামীর) রেখে যাওয়া প্রায় ১ কোটি টাকার ঋণ এর জন্য মর্টগেজ দেওয়া বাড়ি তে বাস করছে। (৪,৫,৬,৭ তম সদস্য রাও)। এই বাড়ি ছাড়া আর কোন যায়গা সম্পত্তি এবং আবাসস্থল তাদের নেই। ওয়ারিশ হিসাবে এই বাড়ি যেহেতু তারা পেয়েছে, সেই ক্ষেত্রে এই বাড়ির উপর করা তাদের বাবা (এবং স্বামীর) করা ঋণ ও তো তাদের উপর বর্তাবে? যদি বর্তায়। তাহলে এই সমস্ত কিছু বিবেচনায় তাদের উপর কি কুরবানী ওয়াজিব, এবং জাকাত ফরজ হয়েছে? যদি হয় তাহলে বিবরন অনুযায়ী কার কার উপর হয়েছে?
Answer
উত্তর:
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রশ্নে বর্ণিত পরিবারের সদস্যদের কুরবানি ও যাকাতের হুকুম নির্ধারণের জন্য নিম্নলিখিত বিষয়গুলো বিবেচনা করতে হবে:
১. মৃত পিতার ঋণের দায়িত্ব ওয়ারিশদের উপর?
ইসলামী শরিয়াহ অনুযায়ী, মৃত ব্যক্তির ঋণ তার রেখে যাওয়া সম্পত্তি থেকে পরিশোধ করতে হবে। ওয়ারিশরা ব্যক্তিগতভাবে ঐ ঋণের জন্য দায়ী নয়; বরং তারা উত্তরাধিকার সূত্রে যা পায়, তা থেকে ঋণ পরিশোধের পর অবশিষ্টাংশ ভোগ করে। (সুরা আল-বাকারা: ১৮০, ২৪০; ফাতাওয়া উসমানী, ১/৪৫৬; রদ্দুল মুহতার, ৫/২৬৯)
এক্ষেত্রে যে বাড়িটি বন্ধক (মর্টগেজ) রয়েছে, সেটি মৃতের সম্পত্তি। ওয়ারিশরা বাড়িটি পাওয়ার অর্থ এই নয় যে, তারা ব্যক্তিগতভাবে ঋণ পরিশোধ করতে বাধ্য; বরং ঋণের কারণে বাড়িটি বিক্রি হতে পারে, অথবা তারা নিজেদের তরফ থেকে ঋণ পরিশোধ করে বাড়িটি রক্ষা করতে পারে। তবে যাকাত ও কুরবানির জন্য নেসাব গণনার সময় এই ঋণ তাদের ব্যক্তিগত দায় হিসেবে বিবেচিত হবে না, যতক্ষণ না তারা নিজেদে অর্থ থেকে তা পরিশোধ করতে বাধ্য হন। আর বাড়িটি নিজেদের বসবাসের জন্য ব্যবহৃত হওয়ায় তা যাকাত ও কুরবানির নেসাবের অন্তর্ভুক্ত নয়। (আল-হিদায়া, ১/১৯৩; বাহিশ্তী জেওর, ৪/২২)
২. কার কার উপর কুরবানি ওয়াজিব এবং যাকাত ফরজ?
প্রত্যেক ব্যক্তির নিজস্ব সম্পদ ও দায়-দেনা পৃথকভাবে বিবেচনা করতে হবে। নেসাবের পরিমাণ হলো: ৫২.৫ তোলা রূপার মূল্য (বর্তমান বাজার মূল্য অনুযায়ী প্রায় ১,৮০,০০০ টাকা) অথবা ৭.৫ তোলা (৮৭.৪৮ গ্রাম) স্বর্ণ।
(ক) প্রথম ব্যক্তি (পুত্র):
তার কাছে নিজ উপার্জন থেকে নেসাব পরিমাণ সম্পদ বিদ্যমান। এছাড়া ব্যবসায়িক অংশীদারিত্বের মাধ্যমেও তার নেসাব পরিমাণ মাল আছে। সুতরাং তার উপর কুরবানি ওয়াজিব এবং যাকাত ফরজ (যদি নেসাব এক বছর স্থায়ী থাকে)।
(খ) দ্বিতীয় ব্যক্তি (কন্যা):
তার কাছে ৫-৬ ভরি স্বর্ণ (প্রায় ৫৮-৭০ গ্রাম) ও অল্প টাকা আছে। এই স্বর্ণের বাজারমূল্য রূপার নেসাবের (১,৮০,০০০ টাকা) থেকে অনেক বেশি। তাই তার উপর কুরবানি ওয়াজিব ও যাকাত ফরজ।
(গ) তৃতীয় ব্যক্তি (মৃতের স্ত্রী/মাতা):
তার কাছে ব্যবসায়িক মাল (পণ্য) নেসাব পরিমাণ আছে, যদিও লাইসেন্স দ্বিতীয় ব্যক্তির নামে। প্রকৃত মালিকানা প্রথম ও তৃতীয় ব্যক্তির। সুতরাং তার উপরও কুরবানি ওয়াজিব ও যাকাত ফরজ।
(ঘ) চতুর্থ ব্যক্তি (প্রথম ব্যক্তির স্ত্রী):
তার কাছে স্বর্ণ ও অন্যান্য সম্পদ মিলিয়ে রূপার নেসাব (১,৮০,০০০ টাকা) পূর্ণ হয়। তাই তার উপর কুরবানি ওয়াজিব ও যাকাত ফরজ।
(ঙ) পঞ্চম, ষষ্ঠ ও সপ্তম ব্যক্তি (প্রথম ব্যক্তির সন্তান):
- একজন নাবালেগ (অপ্রাপ্তবয়স্ক): তার উপর কুরবানি ওয়াজিব নয় এবং যাকাত ফরজ নয়। (রদ্দুল মুহতার, ২/২৬৪)
- অপর দুইজনের নেসাব পরিমাণ সম্পদ নেই। তাই তাদের উপরও কুরবানি ওয়াজিব নয় এবং যাকাত ফরজ নয়।
৩. গুরুত্বপূর্ণ নোট:
- যাকাত ফরজ হওয়ার জন্য নেসাব পরিমাণ সম্পদ এক বছর পর্যন্ত স্থায়ী থাকতে হবে। কুরবানি ওয়াজিব হওয়ার জন্য কুরবানির দিন (১০ জিলহজ) সকালে নেসাব থাকলেই যথেষ্ট।
- ব্যবসায়িক মালের যাকাত হিসাব করতে হবে পণ্যের বর্তমান বাজারমূল্যের উপর।
- মৃত পিতার ঋণ উত্তরাধিকারীদের ব্যক্তিগত সম্পদ থেকে কাটবে না, যদি না তারা স্বেচ্ছায় তা পরিশোধ করে। বাড়িটি বসবাসের হওয়ায় যাকাত ও কুরবানির নেসাবে গণ্য হবে না।
সারসংক্ষেপ:
| ব্যক্তি | কুরবানি ওয়াজিব? | যাকাত ফরজ? |
|--------|----------------|------------|
| ১ম | হ্যাঁ | হ্যাঁ |
| ২য় | হ্যাঁ | হ্যাঁ |
| ৩য় | হ্যাঁ | হ্যাঁ |
| ৪র্থ | হ্যাঁ | হ্যাঁ |
| ৫ম (নাবালেগ) | না | না |
| ৬ষ্ঠ | না | না |
| ৭ম | না | না |
উপদেশ: যাকাত ও কুরবানির সঠিক হিসাবের জন্য স্থানীয় আলেম বা মুফতির সাহায্য নিন।
সূত্র:
- কুরআন: সুরা আল-বাকারা ১৮০, ২৪০
- ফাতাওয়া উসমানী, ১/৪৫৬
- রদ্দুল মুহতার, ২/২৬৪, ৫/২৬৯
- বাহিশ্তী জেওর, ৪/২২
- আল-হিদায়া, ১/১৯৩
- ইমদাদুল ফাতাওয়া, ২/১৪৮