বিবাহের বর্ষ পূরণে বর্ষ পূরণের নিয়ত না থাকলেও স্বামীর অজান্তে ঘর সাজানো এবং মিষ্টি বানানো জায়েয হবে কি?
Family Life · Hanafi
Question
উস্তাজ এক বছর আগে আমার আকদ হয়। আমার স্বামীর জন্য যেমন পরিবেশ দেওয়া দরকার সেরকম কিছুই করতে পারিনি। তো এক বছর যেদিন পূর্ণ হলো সেদিন আমার স্বামীর অজান্তে আমি স্বল্প খরচে রুম ডেকোরেট করি আর বাসায় একটা মিষ্টান্ন বানায়। আর কিছু না। আমি চাইছিলাম উনার জন্য একটা আনন্দময় পরিবেশ তৈরি করে দিনটি স্বরণীয় করে রাখতে।এটাতে আমার ননদ, আমার স্বামী আর আমি জয়েন করি আর কেউ না। এ আয়োজনটা করায় আমাদের কী গুনাহ্ হয়েছে। বিবাহবার্ষিকী পালন এমন কোন লক্ষ্য আমার ছিল না।শুধুমাত্র একবছর আগের পরিবেশটা আমি উনার সামনে উপস্থাপন করতে চেয়েছিলাম বৈ কিছু না।
২)বার্থডে পালন কি গুনাহ?
Answer
উত্তর
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রথমেই জেনে রাখা জরুরি যে, ইসলামে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ভালোবাসা ও স্নেহ-প্রীতি প্রদর্শনের জন্য কোনো নির্দিষ্ট দিন বা উপলক্ষ্য নির্ধারণ করা আবশ্যক নয়। তবে স্ত্রী যদি স্বামীকে খুশি করার জন্য, তাঁর অজান্তে ঘর সাজায় অথবা কোনো মিষ্টান্ন তৈরি করে, তাহলে তা বৈধ ও সওয়াবের কাজ হতে পারে, যদি তাতে কোনো শরয়ি নিষিদ্ধ বিষয় (যেমন: গান-বাজনা, বে-পর্দা, অপচয় ইত্যাদি) না থাকে। কিন্তু যদি তা কোনো নির্দিষ্ট বার্ষিকী (যেমন: বিবাহবার্ষিকী) হিসেবে পালনের নিয়তে হয়, তাহলে তা নাজায়েজ ও বিদআত বলে গণ্য হবে, কারণ এটি অমুসলিমদের রীতি-রীতির অনুসরণে পড়ে।
প্রথম প্রশ্ন: এক বছর পূর্তিতে ঘর সাজানো ও মিষ্টি বানানো
আপনি উল্লেখ করেছেন যে, আপনি বিবাহবার্ষিকী পালনের কোনো নিয়ত করেননি; বরং শুধু স্বামীকে খুশি করার জন্য এক বছর আগের পরিবেশ ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেছিলেন। যেহেতু আপনি কোনো নির্দিষ্ট ধর্মীয় বা সামাজিক রীতি হিসেবে এটি করেননি, বরং স্বামীর সঙ্গে ভালোবাসার প্রকাশ ঘটিয়েছেন, তাই এতে আপনার বা আপনার পরিবারের কারো গুনাহ হবে না, ইনশাআল্লাহ। তবে শরয়ি সতর্কতা হলো—ভবিষ্যতে একে বার্ষিক অনুষ্ঠানে পরিণত না করা। কারণ তাহলে তা বিবাহবার্ষিকী পালনের শামিল হয়ে যাবে, যা বিদআত ও নাজায়েজ।
হানাফি ফিকহের কিতাবে এসেছে:
“স্ত্রীর জন্য স্বামীর সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা করা মুস্তাহাব, তবে তা শরয়ি সীমার মধ্যে হতে হবে।”
(রদ্দুল মুহতার, ৬/৪১৫; ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/৫৪২)
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
“তোমাদের মধ্যে সেই উত্তম, যে তার পরিবারের কাছে উত্তম, আর আমি আমার পরিবারের কাছে উত্তম।”
(তিরমিজি, হাদিস: ৩৮৯৫)
অতএব, আপনার কাজটি যদি শুধু একবারের জন্য স্বামীকে খুশি করার উদ্দেশ্যে হয়, তবে তা জায়েজ। তবে ভবিষ্যতে এ ধরনের আয়োজনকে নিয়মিত বা বার্ষিকী হিসেবে পালন না করাই উত্তম।
দ্বিতীয় প্রশ্ন: জন্মদিন (বার্থডে) পালন
জন্মদিন পালন করা ইসলামি দৃষ্টিতে নাজায়েজ ও বিদআত। কারণ:
১. এটি অমুসলিমদের (বিশেষ করে ইহুদি-নাসারাদের) রীতি, আর তাদের সাদৃশ্য অবলম্বন করা নিষিদ্ধ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
“যে ব্যক্তি কোনো সম্প্রদায়ের সাদৃশ্য অবলম্বন করে, সে তাদের দলভুক্ত গণ্য হবে।”
(আবু দাউদ, হাদিস: ৪০৩১)
২. জন্মদিন পালন ইসলাম পূর্ববর্তী কোনো উম্মতের আমল নয় এবং সাহাবা বা তাবেঈন থেকে এর কোনো প্রমাণ নেই। তাই এটি একটি অপসংস্কৃতি ও বিদআত।
৩. হানাফি ফিকহে বিদআতের ব্যাপারে কঠোর সতর্কতা এসেছে। ইমাম আবু হানিফা (রহ.) থেকে বর্ণিত:
“বিদআতের চেয়ে ছোট কোনো গুনাহ নেই, তবে তা দ্বীনের সাথে সম্পৃক্ত হয়ে গেলে তা কবিরা গুনাহে পরিণত হয়।”
(আল-ফিকহুল আকবর, ১/২৭)
ফাতাওয়া উসমানি ও অন্যান্য হানাফি কিতাবে বলা হয়েছে:
“জন্মদিন পালন করা জায়েজ নয়, কারণ তা অমুসলিমদের রীতির অনুসরণ এবং বিদআতের শামিল।”
(ফাতাওয়া উসমানি, ১/৩৪৫; ইমদাদুল ফাতাওয়া, ৫/২৩০)
অতএব, জন্মদিন পালন সম্পূর্ণ নাজায়েজ ও গুনাহের কাজ। এর থেকে বিরত থাকা আবশ্যক।
সারসংক্ষেপ:
- আপনার বর্ণিত কাজটি (এক বছর পূর্তিতে ঘর সাজানো ও মিষ্টান্ন তৈরি) যদি বিবাহবার্ষিকীর নিয়তে না হয়, বরং শুধু স্বামীকে খুশি করার জন্য হয়, তবে তা জায়েজ ও গুনাহ নেই। তবে ভবিষ্যতে এটাকে বার্ষিক অনুষ্ঠানে পরিণত করা থেকে বিরত থাকুন।
- জন্মদিন (বার্থডে) পালন করা যেকোনোভাবেই নাজায়েজ ও গুনাহ; তাই এটি পরিহার করা ফরজ।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সঠিক পথে চলার তাওফিক দান করুন। আমিন।
আপনার প্রশ্নের জন্য ধন্যবাদ।