ইসলামে বিবাহিত নারীর প্রতি পিতা-মাতার ভরণপোষণের হুকুম কী?
Family Life · Hanafi
Question
আমি মনে করি আমার স্বামীর সব দায়িত্ব পালন করে, স্বামীর মা-বাবা/ আরও আত্মীয়দের হালকা দায়িত্ব পালন করে আমার মা-বাবার জন্য ব্যবসায় মন দেয়া important. তা কি ঠিকাছে?
Answer
প্রশ্নের উত্তর:
আপনার মা-বাবার প্রতি আপনার দায়িত্ব ও ভালোবাসা প্রশংসনীয়। ইসলামে পিতা-মাতার সেবা ও সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। তবে বিবাহিত নারী হিসেবে আপনার কর্তব্য ও সীমারেখা বুঝে চলা জরুরি। নিচে হানাফি ফিকহের আলোকে বিস্তারিত উত্তর দেওয়া হলো:
১. পিতা-মাতার ভরণপোষণের দায়িত্ব কার?
-
ইসলামী শরিয়ত অনুযায়ী, সন্তানের ওপর পিতা-মাতার ভরণপোষণ ফরজ যদি পিতা-মাতা নিঃস্ব, অসহায় বা উপার্জনে অক্ষম হন। তবে এটি শুধু পুত্র সন্তানের ওপর ফরজ, কন্যার ওপর নয়। কারণ কন্যার আয়-ব্যয়ের দায়িত্ব বিবাহের পর স্বামীর ওপর বর্তায়।
(সূরা বাকারা: ২৩৩; কিতাবুল আসল, ইমাম মুহাম্মদ; রদ্দুল মুহতার, ৩/৬০৪) -
বিবাহিত কন্যা নিজের উপার্জন বা স্বামীর অনুমতি সাপেক্ষে মা-বাবাকে আর্থিক সাহায্য করতে পারেন, তবে তা ফরজ নয়, বরং নফল ইবাদত ও সওয়াবের কাজ।
(ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/৩৪২; ইমদাদুল ফাতাওয়া, ২/৪৭৫)
২. স্বামীর সম্পদ থেকে মা-বাবাকে দেওয়া:
-
আপনার স্বামীর সম্পদ তার নিজের মালিকানাধীন। স্ত্রী স্বামীর অনুমতি ছাড়া তার সম্পদ থেকে নিজের মা-বাবাকে দিতে পারেন না। তবে স্বামী যদি সন্তুষ্ট চিত্তে অনুমতি দেন, তাহলে তা জায়েজ এবং সওয়াবের কাজ।
(হিদায়া, ৪/৩৫০; ফাতাওয়া উসমানি, ২/২৪০) -
যদি স্বামী প্রতি মাসে নির্দিষ্ট অর্থ দেওয়ার সামর্থ্য রাখেন কিন্তু দিতে রাজি না হন, তাহলে আপনি তার ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারবেন না। কারণ স্বামীর দায়িত্ব শুধু স্ত্রী ও সন্তানদের ভরণপোষণ দেওয়া; শ্বশুর-শাশুড়ি তার ওপর ফরজ নয়।
(রদ্দুল মুহতার, ৩/৬০৫)
৩. আপনার বর্তমান পরিকল্পনা (স্বামীর দায়িত্ব পালন করে মা-বাবার জন্য ব্যবসায় মন দেওয়া) কতটুকু ঠিক?
- আপনি যদি স্বামীর দায়িত্ব (তার খোরপোশ, তার সেবা, তার পরিবারের প্রয়োজন) পূর্ণরূপে পালন করেন, তাহলে অবশিষ্ট সময়ে নিজের মা-বাবার জন্য ব্যবসায় মন দেওয়া নৈতিকভাবে উত্তম। তবে মনে রাখবেন:
- স্বামীর অধিকার আগে।
- স্বামী যদি আপনার এই কাজে আপত্তি করেন, তাহলে তাঁর অনুমতি নেওয়া বাধ্যতামূলক। কারণ স্ত্রীর ওপর স্বামীর হক সর্বোচ্চ (সূরা নিসা: ৩৪; সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫২০৪)।
- স্বামীর মা-বাবা ও আত্মীয়দের সেবা করা আপনার ওপর ফরজ নয়, বরং তা স্বামীর দায়িত্ব। আপনি সাধ্যমতো সহযোগিতা করতে পারেন, তবে নিজের মা-বাবার চেয়ে তাদের অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি নয়।
(ফাতাওয়া শামি, ৩/৬০৫; বাহিশতি জেওর, ২/১০০)
৪. ছোট ব্যবসায় লাভ না হলে করণীয়:
- আপনার মা-বাবার জন্য দোয়া করতে থাকুন। আল্লাহর ওপর ভরসা রাখুন।
- ব্যবসায় উন্নতির জন্য বেশি বেশি ইস্তিগফার ও দরুদ পড়ুন।
- যদি ব্যবসায় লাভ না হয়, তাহলে অন্য কোনো উপায়ে তাদের সাহায্য করার চেষ্টা করুন। যেমন: নিজের ব্যক্তিগত সঞ্চয় থেকে দেওয়া, তাদের প্রয়োজনীয় জিনিস কিনে দেওয়া, বা সময় দিয়ে সেবা করা।
৫. গুরুত্বপূর্ণ নসিহত:
- মা-বাবার সেবা করা ইবাদত, কিন্তু স্বামীর হক নষ্ট করে নয়।
- আপনি যদি স্বামীর অনুমতি ছাড়া তার সম্পদ থেকে মা-বাবাকে দেন, তাহলে তা গুনাহ হবে এবং আপনার মা-বাবার জন্য এই অর্থ বরকতময় হবে না।
(সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৬২) - উত্তম পদ্ধতি: স্বামীকে বুঝিয়ে তার কাছ থেকে অনুমতি নেওয়া, অথবা নিজের ব্যক্তিগত সম্পদ (যেমন: মোহরানার টাকা, নিজের উপার্জন) থেকে দেওয়া।
সারসংক্ষেপ:
আপনার মা-বাবার প্রতি দায়িত্ববোধ খুবই প্রশংসনীয়। কিন্তু ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে:
১. আপনার ওপর তাদের ভরণপোষণ ফরজ নয় (ভাই বা পুত্রের ওপর ফরজ)।
২. স্বামীর সম্পদ থেকে দেওয়ার জন্য তার অনুমতি জরুরি।
৩. নিজের ব্যবসা বা ব্যক্তিগত সম্পদ থেকে দেওয়া উত্তম।
৪. স্বামীর দায়িত্ব পালন করা আপনার অগ্রাধিকার।
আপনি যা করছেন (স্বামীর দায়িত্ব পালন করে নিজের মা-বাবার জন্য ব্যবসায় মন দেওয়া) তা ঠিক আছে, তবে শর্ত হলো স্বামী যাতে এতে আপত্তি না করেন। যদি স্বামী সন্তুষ্ট হন, তাহলে এটি একটি উত্তম সমন্বয়।
আল্লাহ আপনাকে উত্তম বুদ্ধি দিন এবং আপনার মা-বাবার প্রতি আপনার সেবা কবুল করুন।
সনদ:
- কুরআন: সূরা বাকারা (২:২৩৩), সূরা নিসা (৪:৩৪), সূরা বনি ইসরাইল (১৭:২৩-২৪)।
- হাদিস: সহিহ বুখারি (৫২০৪), সহিহ মুসলিম (১৬২)।
- হানাফি কিতাব: রদ্দুল মুহতার (৩/৬০৪-৬০৫), ফাতাওয়া হিন্দিয়া (১/৩৪২), ইমদাদুল ফাতাওয়া (২/৪৭৫), ফাতাওয়া উসমানি (২/২৪০), বাহিশতি জেওর (২/১০০), আল-হিদায়া (৪/৩৫০)।