মৃত ব্যক্তির ব্যাংকে জমা হওয়া সুদের টাকা দিয়ে ব্রিজ নির্মাণ বা জামাইয়ের কিস্তি পরিশোধ করা কি জায়েজ?
Halal and Haram · Ahle Hadith / Salafi
Question
শুধুমাত্র রাস্তা থেকে একটি বাড়ির দিকে যাওয়ার জন্য এই ব্রিজ নির্মিত হবে। যেখানে বাস করে তাদের চাচাতো, জ্যাঠাতো ভাই বোন, এক বাড়িতে এইরকম কতগুলি ফ্যামিলির মানুষেরঘর আছে, তাদের যাতায়াতের সুবিধের জন্য ব্রিজ করা। মৃত ব্যক্তির সন্তানেরা গ্রামের বাড়িতে থাকে না। শহরে থাকে।মাঝে মাঝে গ্রামের বাড়িতে যায়।
এদিকে সেই মৃত ব্যক্তির জামাই কিস্তিতে কিছু টাকা উঠিয়ে, জামাতার ভাইকে বিদেশ পাঠিয়েছিল, বিদেশে মাইর খেয়ে ধরা খেয়ে দেশে ফেরত আসলো তার ভাই, তাই কিস্তির টাকা অনেক কষ্ট করে জামাতার পরিশোধ করতেহয়, এখন আমি জানতে চাই , তার জামাতা উনার শ্বশুরের সুদের টাকাগুলো দিয়ে কিস্তির টাকা পরিশোধ করতে পারবে কি???
Answer
সুদের টাকা খরচের বিধান - ইসলামী নির্দেশনা
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ
এক ব্যক্তি মারা গেছেন, তার ব্যাংকে রাখা টাকার উপর তিন লক্ষ টাকা সুদ জমা হয়েছে। এখন তার সন্তানরা এই সুদের টাকা দিয়ে গ্রামের বাড়ির সংযোগ সড়কের জন্য একটি ব্রিজ নির্মাণে অংশ নিতে চায়। অন্যদিকে, মৃত ব্যক্তির জামাই তার শ্বশুরের সুদের টাকা দিয়ে নিজের কিস্তির টাকা পরিশোধ করতে চায়। এগুলো কি জায়েজ হবে?
উত্তর
প্রথম অংশ: সুদের টাকা দিয়ে ব্রিজ নির্মাণ
সুদের টাকা ব্যবহার করা সম্পূর্ণ হারাম এবং জায়েজ নয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
"لَعَنَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ آكِلَ الرِّبَا وَمُوكِلَهُ وَكَاتِبَهُ وَشَاهِدَيْهِ وَقَالَ هُمْ سَوَاءٌ" "রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সুদখোর, সুদদাতা, সুদের লেখক এবং তার দুই সাক্ষীকে লানত করেছেন এবং বলেছেন, তারা সবাই সমান।" (সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১৫৯৭)
মৃত ব্যক্তির সুদের টাকা তার রেখে যাওয়া সম্পদ থেকে আলাদা। এটি তার ওয়ারিশদের জন্য হালাল নয়। ওয়ারিশরা শুধুমাত্র হালাল সম্পদের উত্তরাধিকারী হবে। সুদের টাকা তাদের মালিকানায় আসে না; বরং এটি নাপাক (অপবিত্র) সম্পদ যা সদকা করে দিতে হবে।
শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়াহ (রহিমাহুল্লাহ) বলেন:
"সুদ থেকে প্রাপ্ত অর্থ সুদগ্রহীতার জন্য হালাল নয়। তাকে অবশ্যই তা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে এবং তা দান করে দিতে হবে।" (মাজমু' ফাতাওয়া, ২৯/২৭২)
সুদের টাকা দিয়ে ব্রিজ নির্মাণের বিধান:
এই টাকা দিয়ে ব্রিজ নির্মাণ করা জায়েজ হবে না, কারণ:
১. এটি একটি সদকা বা দান হিসেবে গণ্য হবে না, বরং এটি একটি কল্যাণমূলক কাজে ব্যবহার। ২. এই ব্রিজ ব্যবহার করে মৃত ব্যক্তির সন্তানরাও উপকৃত হবে, যা সুদের টাকা ব্যবহারের একটি অতিরিক্ত হারাম দিক। ৩. শাইখ ইবনে উসাইমীন (রহিমাহুল্লাহ) বলেন: "সুদের টাকা দিয়ে মসজিদ নির্মাণ, দান-সদকা বা যেকোনো ভালো কাজ করাও জায়েজ নয়। বরং তা থেকে মুক্তি পাওয়ার উপায় হলো তা গরীব-দুঃখী মানুষকে দান করা, নিজে না খেয়ে বা কোনো উপকার না নিয়ে।" (ফাতাওয়া নূরুন আলাদ-দারব)
শাইখ সালেহ আল-ফাওযান (হাফিজাহুল্লাহ) বলেন:
"সুদের অর্থ কোনো সৎকাজে ব্যবহার করা জায়েজ নয়, কারণ আল্লাহ তাআলা তা অপবিত্র করেছেন। বরং তা ফেলে দেওয়া উচিত অথবা তা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য গরীব-দুঃখীকে দেওয়া উচিত, যদিও তা তাদের জন্য হালাল নয়, কিন্তু এটি দূষিত অর্থ থেকে মুক্তি পাওয়ার একটি উপায়।" (আল-মুন্তাকা মিন ফাতাওয়া আল-ফাওযান)
সঠিক পন্থা: সুদের টাকা পৃথক করে গরীব-মিসকিনদের দান করে দিতে হবে, নিজে কোনো উপকার না নিয়ে। ব্রিজ নির্মাণের জন্য হালাল উপায়ে অর্থ সংগ্রহ করতে হবে।
দ্বিতীয় অংশ: জামাইয়ের কিস্তি পরিশোধের জন্য সুদের টাকা ব্যবহার
এটাও জায়েজ নয়। জামাই তার শ্বশুরের সুদের টাকা নিজের ঋণ পরিশোধে ব্যবহার করতে পারবে না, কারণ:
১. এটি তার মালিকানাধীন নয়। ২. এটি হারাম সম্পদ, যা দিয়ে ঋণ শোধ করলে তা বৈধ হবে না। ৩. আল্লাহ তাআলা বলেন:
"يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَذَرُوا مَا بَقِيَ مِنَ الرِّبَا إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ" "হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং সুদের যা বাকি আছে তা ছেড়ে দাও, যদি তোমরা মুমিন হও।" (সূরা আল-বাকারা: ২৭৮)
শাইখ ইবনে বায (রহিমাহুল্লাহ) বলেন:
"সুদের টাকা খাওয়া, তা দিয়ে ঋণ পরিশোধ করা বা কোনো কাজে ব্যবহার করা জায়েজ নয়। বরং তা সদকা করে দিতে হবে অথবা পাবলিক কল্যাণে ব্যবহার না করে পথে ফেলে দিতে হবে, যাতে লোকেরা তা উঠিয়ে নিয়ে যায়।" (মাজমু' ফাতাওয়া ইবনে বায, ১৯/২৯৪)
উপসংহার ও সুপারিশ
১. সুদের তিন লক্ষ টাকা কোনোভাবেই নিজেদের বা পরিবারের কাজে ব্যবহার করা যাবে না।
২. এই টাকা গরীব-মিসকিনদের দান করে দিতে হবে যাতে কোনো প্রকার প্রতিদানের আশা না থাকে এবং নিজেরা কোনো উপকার না নেয়।
৩. ব্রিজ নির্মাণের জন্য হালাল উপায়ে অর্থ সংগ্রহ করতে হবে।
৪. জামাই নিজের হালাল উপার্জন দিয়ে তার কিস্তি পরিশোধ করবে।
৫. সুদের টাকা ব্যবহার করলে সবাই গুনাহগার হবে এবং দুনিয়া ও আখিরাতে শাস্তির সম্মুখীন হবে।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
"إِنَّ اللَّهَ طَيِّبٌ لَا يَقْبَلُ إِلَّا طَيِّبًا" "নিশ্চয়ই আল্লাহ পবিত্র, তিনি শুধু পবিত্র বস্তুই গ্রহণ করেন।" (সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১০১৫)
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে হারাম থেকে বিরত থাকার এবং হালাল উপার্জনের তাওফীক দিন।
আল্লাহু আলাম (আল্লাহ সবচেয়ে ভালো জানেন)