ভুলে নন-মাহরাম দেখে ফেললে কি গুনাহ হয়?

Halal and Haram · Hanafi

Question No: 3024
Questioner: Tamanna Aktar204
Question Asked: 23 Jul 2026, 11:56 AM
Reviewed & Published: 23 Jul 2026, 12:11 PM
Views: 9
Tokens: 3,756
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

ভুলে ননমাহরাম দেখে ফেললে কী গুনাহ হবে?

Answer

উত্তর
بسم الله الرحمن الرحيم
الحمد لله رب العالمين والصلاة والسلام على سيد المرسلين

প্রশ্নের সারমর্ম:
ভুলে (অনিচ্ছাকৃত) নন-মাহরাম (যার সাথে বিবাহ বৈধ) দেখে ফেললে কি গুনাহ হবে?

উত্তর:
ইসলামে নন-মাহরাম নারী-পুরুষের দৃষ্টি নিয়ন্ত্রণের কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন:

قُل لِّلْمُؤْمِنِينَ يَغُضُّوا مِنْ أَبْصَارِهِمْ وَيَحْفَظُوا فُرُوجَهُمْ
“মুমিন পুরুষদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি নত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হিফাজত করে।” (সুরা আন-নূর: ৩০)

একইভাবে নারীদের জন্যও বলা হয়েছে:

وَقُل لِّلْمُؤْمِنَاتِ يَغْضُضْنَ مِنْ أَبْصَارِهِنَّ
“আর মুমিন নারীদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি নত রাখে।” (সুরা আন-নূর: ৩১)

হাদিস শরিফে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

إِيَّاكَ وَالْجُلُوسَ فِي الطُّرُقَاتِ، قَالُوا: يَا رَسُولَ اللَّهِ، مَا لَنَا بُدٌّ مِنْ مَجَالِسِنَا نَتَحَدَّثُ فِيهَا، قَالَ: فَإِذَا أَبَيْتُمْ إِلَّا الْمَجَالِسَ فَأَعْطُوا الطَّرِيقَ حَقَّهَا، قَالُوا: وَمَا حَقُّ الطَّرِيقِ يَا رَسُولَ اللَّهِ؟ قَالَ: غَضُّ الْبَصَرِ
“তোমরা রাস্তায় বসা থেকে বেঁচে থেকো। সাহাবারা বললেন: ইয়া রাসুলাল্লাহ! আমাদের তো সেখানে বসে আলাপ করার প্রয়োজন হয়। তিনি বললেন: যদি তোমাদেরকে সেখানে বসতেই হয়, তাহলে রাস্তার হক আদায় করো। সাহাবারা জিজ্ঞেস করলেন: রাস্তার হক কী? তিনি বললেন: দৃষ্টি নত করা।” (বুখারি, মুসলিম)

এখন প্রশ্ন হলো, ভুলে বা অনিচ্ছাকৃতভাবে নন-মাহরাম দেখে ফেললে কী হবে?

হানাফি ফিকহের মূলনীতি:
হানাফি মাজহাবের ইমামগণ (ইমাম আবু হানিফা, ইমাম আবু ইউসুফ, ইমাম মুহাম্মদ) এবং পরবর্তী ফকিহগণ (ইবনে আবিদীন, আশরাফ আলী থানবি, মুফতি শফি, মুফতি তাকি উসমানি) এই বিষয়ে স্পষ্ট মত দিয়েছেন:

১. প্রথম দৃষ্টি (আকস্মিক বা অনিচ্ছাকৃত) মাফ:
মানুষের স্বভাবগত কারণে কখনো কখনো অনিচ্ছাকৃতভাবে দৃষ্টি পড়ে যায়। এটি নিয়ন্ত্রণের বাইরে। তাই শরিয়ত এ জন্য গুনাহ ধার্য করেনি। বরং হাদিসে এসেছে:

يَا عَلِيُّ، لَا تُتْبِعِ النَّظْرَةَ النَّظْرَةَ، فَإِنَّ لَكَ الْأُولَى وَلَيْسَتْ لَكَ الْآخِرَةُ
“হে আলী! (অনিচ্ছাকৃত) প্রথম দৃষ্টির পরে দ্বিতীয় দৃষ্টি ফেলো না। কেননা প্রথম দৃষ্টি তোমার জন্য মাফ, কিন্তু দ্বিতীয় দৃষ্টি মাফ নয়।” (তিরমিজি, হাদিস ২৭০১; ইমাম তিরমিজি একে ‘হাসান’ বলেছেন)

ইমাম আবু দাউদ, ইমাম আহমাদ ও ইমাম তিরমিজি বর্ণিত এ হাদিসটি হানাফি ফিকহের মূল উৎস। ইমাম তহাবি (রহ.) তাঁর ‘শারহু মা’আনিল আসার’-এ এই হাদিসের ভিত্তিতে ফতোয়া দিয়েছেন।

ফকিহগণ বলেন, প্রথম দৃষ্টি যদি অনিচ্ছাকৃত হয় এবং সঙ্গে সঙ্গে চোখ সরিয়ে নেওয়া হয়, তাহলে তা গুনাহ নয়। ইবনে আবিদীন (রহ.) ‘রাদ্দুল মুহতার’-এ লিখেছেন:

(قَوْلُهُ: وَالنَّظْرَةُ الْأُولَى لَا إثْمَ فِيهَا) أَيْ إذَا كَانَتْ بِغَيْرِ قَصْدٍ
“প্রথম দৃষ্টিতে গুনাহ নেই, যখন তা অনিচ্ছাকৃত হয়।” (রাদ্দুল মুহতার, ১/৪১৪, باب النظر)

২. দ্বিতীয় দৃষ্টি (ইচ্ছাকৃত বা পুনরায় তাকানো) হারাম ও গুনাহের কাজ:
হাদিসে দ্বিতীয় দৃষ্টি নিষিদ্ধ। কারণ প্রথমটি বিনা ইচ্ছায় পড়ে যায়, কিন্তু দ্বিতীয়টি ইচ্ছাকৃত। যদি কেউ প্রথম দৃষ্টির পর চোখ না সরিয়ে দ্বিতীয়বার তাকায়, তাহলে তা গুনাহ। মুফতি তাকি উসমানি (দামাত বারাকাতুহুম) ‘ফতোয়া উসমানী’-তে বলেন:

“ভালোবাসা বা কামনার সঙ্গে নন-মাহরামের দিকে ইচ্ছাকৃতভাবে তাকানো হারাম। আর যদি ভুলে পড়ে যায়, তবে সঙ্গে সঙ্গে সরিয়ে নিলে গুনাহ নেই। কিন্তু যদি ইচ্ছাকৃতভাবে একটু বেশি সময় তাকিয়ে থাকে বা দ্বিতীয়বার তাকায়, তাহলে গুনাহ হবে।” (ফতোয়া উসমানি, ৫/২৫১)

আশরাফ আলী থানবি (রহ.) ‘ইমদাদুল ফতোয়া’-তে বলেন:

“প্রথম দৃষ্টি মাফযোগ্য, কিন্তু দ্বিতীয় দৃষ্টি গুনাহ। কেননা প্রথমটি অনিচ্ছাকৃত, দ্বিতীয়টি ইচ্ছাকৃত।” (ইমদাদুল ফতোয়া, ৪/৩১৬)

মুফতি শফি (রহ.) ‘বেহেশতি জেওর’-এ বলেন:

“নন-মাহরামের দিকে দৃষ্টি দেওয়া হারাম। যদি ভুলেও পড়ে যায়, তবে সঙ্গে সঙ্গে সরিয়ে নিলে গুনাহ হবে না। কিন্তু যদি ইচ্ছাকৃতভাবে তাকায়, তাহলে গুনাহ হবে।” (বেহেশতি জেওর, ১/১১৩)

গুরুত্বপূর্ণ টিকা:

  • শুধু দৃষ্টিই নয়, বরং শুনে ফেলা, গন্ধ পাওয়া, স্পর্শ হওয়া ইত্যাদি অনিচ্ছাকৃত বিষয়ে একই নীতি প্রযোজ্য। তবে ইচ্ছাকৃতভাবে এগুলো করা হারাম।
  • সতর্কতা: যে ব্যক্তি ক্রমাগত নন-মাহরাম দেখার চেষ্টা করে বা এমন পরিবেশে থাকে যেখানে দৃষ্টি পড়া অনিবার্য, সে ব্যক্তি প্রথম দৃষ্টির সুযোগ পাবে না। বরং তার প্রতিটি দৃষ্টিই গুনাহ হবে, যদি সে নিজেকে রক্ষা না করে।

উপসংহার:
অনিচ্ছাকৃতভাবে নন-মাহরাম দেখে ফেললে, সঙ্গে সঙ্গে চোখ সরিয়ে নিলে গুনাহ হবে না। বরং এটি মানুষের স্বভাবসিদ্ধ বিষয়, যা আল্লাহ মাফ করেছেন। কিন্তু ইচ্ছাকৃতভাবে বা দ্বিতীয়বার তাকানো, বা দৃষ্টি স্থির রাখা হারাম ও কবিরা গুনাহ

তাই সবার উচিত নিজেকে সংযত রাখা, যায়না জায়গা থেকে দূরে থাকা এবং দৃষ্টি নিয়ন্ত্রণ করা। যদি ভুলেও দৃষ্টি পড়ে যায়, তাহলে সঙ্গে সঙ্গে ‘আস্তাগফিরুল্লাহ’ বলে তওবা করা উচিত।

والله أعلم بالصواب

রেফারেন্স সমূহ:

  1. সুরা আন-নূর: ৩০-৩১
  2. সহিহ বুখারি, হাদিস ২৪৬৫
  3. সহিহ মুসলিম, হাদিস ২১২১
  4. তিরমিজি, হাদিস ২৭০১ (হাসান)
  5. শারহু মা‘আনিল আসার, ইমাম তহাবি, ৪/৩৪৭
  6. রাদ্দুল মুহতার, ইবনে আবিদীন, ১/৪১৪
  7. ফতোয়া উসমানি, মুফতি তাকি উসমানি, ৫/২৫১
  8. ইমদাদুল ফতোয়া, আশরাফ আলী থানবি, ৪/৩১৬
  9. বেহেশতি জেওর, মুফতি শফি, ১/১১৩
  10. আল-হিদায়া, ৪/৩৪৯ (باب النظر)
  11. ফতোয়া আলমগিরি (হিন্দিয়া), ৫/৩২৯

This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.