কবিরাজের দেয়া তাবিজ ও পানিপড়া নেয়ার বিধান
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
যে কবিরাজ এর থেকে আনে সেই মহিলা নাকি অনেক আধ্যাত্মিক স্বপ্ন দেখে ইত্যাদি। বলা যায় ভালো কোনো জিনিস সেখানে নেই।
সেই মহিলার থেকে আমার বোনের শাশুড়ী বিভিন্ন তাবিজ ও পানি পড়া নিয়ে আসে। আবার বিভিন্ন চিহ্ন দিয়ে কি কি লিখা কাগজ পানির জগে রেখে দেয়। বোনের হাসবেন্ড এর জন্য তাবিজ নিয়ে আসে, পানি পড়া খাওয়াতে বলে। যদি জিজ্ঞেস করে কেনো এইগুলা করে, তখন উত্তর দেয় এগুলো নাকি আল্লাহর কালাম এর মাধ্যমে সব রোগের চিকিৎসা হয়। স্বামী স্ত্রী এর সম্পর্ক নাকি ভালো হয়। অথচ স্বামী স্ত্রী এর সম্পর্ক আগে থেকেই ভালো।
একবার এক জায়গা থেকে একটা তাবিজ আনার পরে সেই বোনের হাসবেন্ড ২ দিন অকারনেই উনার সাথে কথা বলেনাই। তাই কিছুটা ভয় পেয়ে গিয়েছে এইসব তাবিজে কোনো রকম সমস্যা হয়ে যায় কিনা সংসারে।
পানির জগে এইসব কাগজ রেখে দেয়ার কারনে সেই বোন ভয়ে এখন জগ থেকে পানিও খায়না। লুকিয়ে পানি খায়। আবার সেই কবিরাজ নাকি বলছে উনার হাসবেন্ড এর জন্য উনার চাচীশাশুড়ি তাবিজ করে রাখছে এজন্য ইনকাম এর পথ হয়না।
শিরক বা শিরকি কাজ করা মানুষ এর সাথে এইভাবে যোগাযোগ করা গুনাহ এগুলা বললেও শাশুড়ী মানতে চায়না। বরং বেয়াদব বলে, আরো কথা শুনায়।
এখন সেই বোন ভয় পাচ্ছে এইসব তাবিজ বা পানি পড়ার কারনে সংসারে কোনো সমস্যা হয় কিনা বা গুনাহ হয় কিনা। অথবা যদি এগুলোর কি কোনো ইফেক্ট আসতে কিনা জীবনে। এর থেকে পরিত্রান পেতে করনিও কী?
Answer
উত্তর:
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاتة
প্রথমেই জেনে রাখা জরুরি যে, ইসলামে তাবিজ-কবচ, পানি পড়া ইত্যাদির বিধান নির্ভর করে এর উপকরণ ও বিশ্বাসের ওপর। যদি তাবিজে কেবল কুরআনের আয়াত, সহিহ হাদিসের দোয়া বা আল্লাহর নাম লিখিত থাকে এবং তা ব্যবহারকারী ও পরিধানকারী উভয়েই একমাত্র আল্লাহর ওপর ভরসা করে, তবে তা জায়েয বলে হানাফি ফুকাহায়ে কেরামের একটি মত রয়েছে। কিন্তু যদি তাতে শিরকি কালাম, জিন-ভূতের নাম, অশ্লীল চিহ্ন বা অজ্ঞেয় বাক্য থাকে, অথবা ব্যবহারকারী তাবিজকে স্বাধীনভাবে ফলদায়ক মনে করে (আল্লাহর ইচ্ছার বাইরে), তাহলে তা হারাম ও শিরকের অন্তর্ভুক্ত।
আপনার বর্ণনায় দেখা যাচ্ছে, ওই কবিরাজ মহিলা বলছেন যে তিনি আধ্যাত্মিক স্বপ্ন দেখেন এবং চিহ্ন দিয়ে কাগজ লিখে পানির জগে রাখেন। এটি স্পষ্টতই শিরকি কার্যকলাপের আলামত। কারণ কুরআনের আয়াত বা সহিহ দোয়া সাধারণত স্পষ্ট আরবি বাক্যে লিখা হয়, চিহ্ন বা অঙ্কের মাধ্যমে নয়। ইমাম আবু হানিফা (রহ.) ও তাঁর অনুসারীগণ শিরকি তাবিজ ও ঝাড়ফুঁককে কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন। (রদ্দুল মুহতার, ৬/৩৬৩; ফাতাওয়া উসমানি, ১/২৩৪)
হাদিসে এসেছে:
"যে ব্যক্তি তাবিজ লটকায়, আল্লাহ তার কাজ সম্পন্ন করবেন না। আর যে ব্যক্তি তাবিজ (শিরকি বিশ্বাসে) লাগায়, সে শিরক করল।" (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ১৬৯৩০; ইবনে মাজাহ, হাদিস: ৩৫৩১)
সুতরাং ওই কবিরাজের কাছে যাওয়া এবং তার দেওয়া তাবিজ-পানি ব্যবহার করা জায়েয নয়। বিশেষত যে তাবিজ আসার পর স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে দুই দিন কথা বন্ধ ছিল, এটি নেতিবাচক প্রভাবের ইঙ্গিত। শয়তানের মাধ্যমে অনেকে তাবিজে এমন বস্তু লাগিয়ে দেয় যা দাম্পত্য কলহ সৃষ্টি করে। ওই বোনের শাশুড়ি যদি বলেন এটি আল্লাহর কালাম, কিন্তু উক্ত কবিরাজের কার্যকলাপ ও চিহ্নিতকরণ পদ্ধতি কুরআন-সুন্নাহর সাথে সাংঘর্ষিক, তাই তা গ্রহণ করা অনুমোদিত নয়।
পানির জগে কাগজ রাখার ব্যাপারে:
পানির জগে যদি শুধু কুরআনের আয়াত লিখিত থাকে, তবে তা পান করা জায়েয আছে। কিন্তু এখানে চিহ্ন ও অঙ্ক রয়েছে, যা শিরকি প্রতীক হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। তাই ওই পানি পান করা থেকে বিরত থাকা উচিত। আর যদি ভয়ে বোন লুকিয়ে পানি খায়, তাহলে সে জগ থেকে পানি না খেয়ে অন্য উৎস থেকে পানি খেতে পারে। (ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ৫/৩৫৫)
পরিত্রানের উপায়:
১. ওই বোন ও তার স্বামী একমাত্র আল্লাহর ওপর ভরসা করবেন এবং কুরআন-সুন্নাহ অনুযায়ী জীবনযাপন করবেন। নিয়মিত সূরা বাকারা, আয়াতুল কুরসি, সূরা ফালাক ও নাস পড়বেন।
২. শাশুড়িকে নরম ভাষায় বুঝানোর চেষ্টা করবেন যে, ইসলাম কেবল কুরআনের সাহায্যে ঝাড়ফুঁকের অনুমতি দেয়, অগোছালো চিহ্ন ও শিরকি বিশ্বাসযুক্ত তাবিজ নয়। যদি তিনি না মানেন, তবে তার সাথে এ বিষয়ে বিতর্ক না করে নিজেরা সতর্ক থাকবেন।
৩. ওই তাবিজ ও লিখিত কাগজগুলোকে সম্মানের সাথে রেখে (যাতে কুরআনের আয়াত থাকলে অপমান না হয়) ভেঙে ফেলবেন অথবা প্রবাহিত পানিতে ফেলে দেবেন। হানাফি ফিকহে বলা হয়েছে, শিরকি তাবিজ ধ্বংস করা ওয়াজিব। (ইমদাদুল ফাতাওয়া, ৪/২৯৮)
৪. শাশুড়ির জন্য দোয়া করবেন যে আল্লাহ তাকে হিদায়াত দেন। নিজেদের বাড়িতে সুন্নাহ তরিকা অনুসারে দম-দারুদ করবেন (যেমন আয়াতুল কুরসি, সূরা ইখলাস ইত্যাদি ফুঁকে দেওয়া)।
৫. স্বামী-স্ত্রী একে অপরের প্রতি আস্থা রাখবেন, শয়তানের কুমন্ত্রণায় বিশ্বাস করবেন না। তাবিজের প্রভাব আল্লাহর ইচ্ছাধীন, তাই ভয় না করে সোজা আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করবেন।
গুনাহ ও প্রভাব সম্পর্কে:
- শিরকি তাবিজ ব্যবহার করা গুনাহ। তবে যদি কেউ অজ্ঞতাবশত ব্যবহার করে, তওবা করলে আল্লাহ মাফ করবেন।
- শিরকি বস্তুর কার্যকরী প্রভাব আল্লাহ তাঁর ইচ্ছায় কিছু মানুষের জন্য পরীক্ষাস্বরূপ রাখতে পারেন, কিন্তু একজন মুমিনের উচিত এসব থেকে দূরে থাকা।
- ওই বোনের সংসারে যদি কোনো অশান্তি ইতিমধ্যে দেখা দেয়, তাহলে সেটি এর প্রভাব হতে পারে। তবে তওবা ও আল্লাহর ওপর ভরসা করলে আল্লাহ সে প্রভাব দূর করে দেবেন। (সূরা আত-তালাক: ২-৩)
আল্লাহই তাওফিক দাতা।
রেফারেন্স:
- রদ্দুল মুহতার, ৬/৩৬৩ (শিরকি তাবিজের বিধান)
- ফাতাওয়া উসমানি, ১/২৩৪ (কেবল কুরআন-সুন্নাহর ওপর ভিত্তি করে তাবিজ জায়েয)
- ইমদাদুল ফাতাওয়া, ৪/২৯৮ (শিরকি তাবিজ ধ্বংস করা ওয়াজিব)
- বাহিশতি জেওর, ১/৪৫২ (ঝাড়ফুঁকের সঠিক পদ্ধতি)
- ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ৫/৩৫৫ (পানিতে কুরআন লিখা জায়েয, কিন্তু শিরকি অক্ষর নয়)