ভার্সিটির শিক্ষা সফরে মাহরাম ছাড়া যাওয়া জায়েজ কিনা?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
Answer
উত্তরঃ
প্রশ্নকারী বোনের জন্য আমাদের পরামর্শ হলো— মাহরাম ছাড়া শিক্ষা সফরে যাওয়া জায়েজ নয়। কারণ এটি ইসলামী শরী‘আহর স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত। নিচে দলিল ও হানাফী ফিকহের গ্রন্থের উদ্ধৃতি সহকারে বিস্তারিত বক্তব্য পেশ করা হলো।
১. কুরআন ও হাদীসের দলিল
কুরআন মজীদে মহিলাদের জন্য সফর ও একাকী থাকার ক্ষেত্রে সতর্কতা প্রদান করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَقَرْنَ فِي بُيُوتِكُنَّ وَلَا تَبَرَّجْنَ تَبَرُّجَ الْجَاهِلِيَّةِ الْأُولَىٰ
(وَهُمْ يَقُولُونَ: إِنِ الْأَمْرُ لَا يَخْرُجُ عَنْ هَذِهِ الْأَصْلِ)
অর্থ: “তোমরা নিজ নিজ ঘরে অবস্থান কর এবং প্রাচীন জাহেলী যুগের মতো সাজসজ্জা প্রদর্শন কর না।” (সূরা আহযাব: ৩৩)
যদিও এই আয়াতটি বিশেষভাবে উম্মাহাতুল মু’মিনীনকে উদ্দেশ্য করে, তবে সাধারণ নারীদের জন্যও এর দৃষ্টান্ত গ্রহণযোগ্য। এতে নারীর জন্য ঘরে থাকার ও অনাবশ্যক বাইরে বের না হওয়ার নির্দেশ রয়েছে।
হাদীস শরীফে স্পষ্টভাবে মাহরাম ব্যতীত নারীর সফর নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
-
হযরত ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
لَا تُسَافِرِ الْمَرْأَةُ إِلَّا مَعَ ذِي مَحْرَمٍ
“কোনো স্ত্রীলোক যেন মাহরাম ব্যতীত সফর না করে।” (সহীহ বুখারী, হাদীস: ১০৮৮; সহীহ মুসলিম, হাদীস: ২৩৯১) -
অন্য বর্ণনায় আছে:
لَا يَخْلُوَنَّ رَجُلٌ بِامْرَأَةٍ إِلَّا وَمَعَهَا ذُو مَحْرَمٍ
“কোনো পুরুষ যেন কোনো নারীর সাথে একান্তে নির্জনে না থাকে, তবে তার সাথে মাহরাম থাকলে ভিন্ন কথা।” (সহীহ বুখারী, হাদীস: ৩০০৬)
এই হাদীসগুলোতে সফর বলতে شارع (শরী‘আত স্বীকৃত) সফর বুঝায়, যা সাধারণত প্রায় ৪৮ মাইল বা ৭৭ কিলোমিটার তথা তিন দিনের পথ (অথবা এক দিনের পথ) বলে হানাফী ফকীহগণ নির্ধারণ করেছেন। (ফাতাওয়া শামী, ২/৪৮৭; রদ্দুল মুহতার, ২/৪৬৩)
শিক্ষা সফর সাধারণত এই পরিমাণ দূরত্বের হয় অথবা তার চেয়ে বেশি হয়—তাই তা সফরের আওতাভুক্ত।
২. হানাফী ফিকহের কিতাবের উদ্ধৃতি
-
إمداد الفتاوى (মুফতী মোহাম্মদ শফী রহ.)-এ উল্লেখ রয়েছে:
“নারীর জন্য মাহরাম ব্যতীত সফর করা জায়েয নয়, যদিও পথ নিরাপদ হয় এবং সঙ্গী লোকজন থাকে। কেননা হাদীসে সাধারণভাবে নিষেধাজ্ঞা বর্ণিত হয়েছে।” (إمداد الفتاوى, ৪/৩৬১)
-
فتاوى شامية (ابن عابدين শামী) তে বলা হয়েছে:
“يَحْرُمُ عَلَى الْمَرْأَةِ السَّفَرُ بِدُونِ زَوْجٍ أَوْ مَحْرَمٍ وَلَوْ كَانَ مَعَهَا رِفْقَةٌ مَأْمُونَةٌ”
“নারীর জন্য স্বামী বা মাহরাম ব্যতীত সফর করা হারাম, যদিও সে নিরাপদ দলের সাথে থাকে।” (রদ্দুল মুহতার, ২/৪৬৩) -
فتاوى عثمانى (মুফতী মুহাম্মদ তাকী উসমানী দামাত বারাকাতুহুম) তে এসেছে:
“বাস বা ট্রেনের মাধ্যমে একাকী সফর করলেও নারীকে অবশ্যই মাহরাম নিতে হবে। নিরাপত্তা ব্যবস্থা উন্নত হলেও মাহরামের শর্ত রহিত হয় না।” (ফাতাওয়া উসমানী, ২/৫২৩)
-
بهشتى زور (মুফতী মোহাম্মদ শফী রহ.)-এ লিখেছেন:
“যদি কোনো নারী তার মাহরাম ব্যতীত তিন দিনের রাস্তা (আনুমানিক ৪৮ মাইল) সফর করে, তবে তা গুনাহের কাজ।” (بهشتى زور, ২/৩৮)
৩. ‘সম্পূর্ণ নিরাপত্তা ব্যবস্থা’ প্রসঙ্গে
আপনার উল্লেখিত “ভার্সিটির বাসে করে যাওয়া” এবং “সম্পূর্ণ নিরাপত্তা ব্যবস্থা” থাকা সত্ত্বেও হাদীসের নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকে। কারণ নারীর জন্য মাহরামের প্রয়োজন শুধু শারীরিক নিরাপত্তার জন্যই নয়, বরং আত্মিক শান্তি, দ্বীনী পবিত্রতা ও শয়তানের প্ররোচনা থেকে বাঁচার জন্যও। এমনকি নিরাপদ পরিবেশেও নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা ফিতনার কারণ হতে পারে।
ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর মতে, একাকী নারী যদি কোনো পুরুষ ছাড়া রাস্তায় যায়, তবে তা মাকরূহে তাহরীমী (হারামের কাছাকাছি)। সুতরাং আপনি যদি একদল নারীর সাথে যান কিন্তু মাহরাম না থাকে, তবুও এটি নিষিদ্ধ সফরের অন্তর্ভুক্ত।
৪. শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা ও বিকল্প
শিক্ষার গুরুত্ব ইসলাম স্বীকৃত। কিন্তু দ্বীনি অপরিহার্যতার সাথে শরী‘আতের বিধান মানা আবশ্যক। আপনি চাইলে নিম্নোক্ত বিকল্পগুলো বিবেচনা করতে পারেন:
- সফরে মাহরাম (যেমন বাবা, ভাই, স্বামী, চাচা) সঙ্গে নিন। যদি মাহরাম বাসে না বসতে পারেন, তবে সাথে থাকলেই খলওয়াতের শর্ত পূরণ হবে।
- যদি মাহরাম পাওয়া না যায়, তাহলে এই সফর পরিহার করুন। কারণ নফল বা প্রয়োজনীয় শিক্ষা ভ্রমণ ফরজের সমতুল্য নয়।
- প্রয়োজনীয় শিক্ষা অর্জন যদি না হয় তার বিকল্প থাকতে পারে, যেমন অনলাইন ক্লাস, বা নিকটবর্তী কোনো প্রতিষ্ঠান।
শেষ কথা
মাহরাম ছাড়া শিক্ষা সফরে যাওয়া জায়েজ নয়, যদিও ভার্সিটির বাসে সাজানো হয় এবং পূর্ণ নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকে। হাদীসের চিরন্তন বিধান অপরিবর্তিত। তাই আপনার উচিত সফর না করা অথবা মাহরামের ব্যবস্থা করা। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে তাঁর সন্তুষ্টির পথে চলার তাওফীক দান করুন। (আমীন)