জন্মদিন উপলক্ষে প্রাপ্ত টাকার কি করতে হবে? এগুলোর ব্যবহার কি জায়েয হবে?
Halal and Haram · Hanafi
Question
((অনেক ওয়াজ এ শুনেছি জন্মদিন পালন নাকি শিরকি কাজ, ))
আমি নিজের জমাক্রিত টাকা দিয়েও এই মাসে জামা জুতা কিনেছি কারন জন্মদিন উপলক্ষে আমাকে অন্য মাসের তুলনায় বেশি টাকা দেয়?
তাহলে আমি জামা কিনেছি কিন্তু সেই টাকা দিয়ে কিন্তু আমার উদ্দেশ্যে ছিল টাকা পাইসি কিনসি
জন্মদিনে পরার জন্য বা পালনের জন্য নয়!
আব্বু আমাকে ঠিক জন্মদিনেত দিন কিছু টাকাও দিয়েছে
আমি এখন প্রশ্ন করতে চাই
আমার এই জামা জুতা ব্যাবহার কি জন্মদিন কে সমরথন করা হয় এবং এতে কি আমার ও শিরকি কাজে সাই দেয়া হচ্ছে নিজের অজান্তে??
আমি তো জমান টাকা দিয়ে জিনিস কিনেছি কিন্তু আমার হাতে টাকা বেশি এসেছে সেই খুসিতে এত বাজার করেছি!
এইসব জিনিস ব্যাহারে কি করা যাবে নাকি যাবে না?
Answer
উত্তর (Hanafi মাযহাব অনুযায়ী)
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ
আপনি জন্মদিন উপলক্ষে আগেভাগে দুটি উপহার (গিফট) পেয়েছেন এবং সেগুলা গ্রহণ করেছেন। নিজের জমানো টাকা দিয়ে জামা-জুতা কিনেছেন, কারণ জন্মদিনের মাসে বেতন/টাকা বেশি পেয়েছেন। আপনার পিতাও জন্মদিনের দিন কিছু টাকা দিয়েছেন। এখন আপনার মনে ওয়াসওয়াসা হচ্ছে যে, এই জিনিসগুলো ব্যবহার করলে আপনি কি জন্মদিন পালনকে সমর্থন করছেন? এবং এতে কি আপনার অজান্তে শিরকি কাজে অংশগ্রহণ হচ্ছে?
মূল কথা
ইসলামে জন্মদিন পালন করা জায়েয নয়; এটি বিদ‘আত ও অমুসলিমদের অনুসরণ (অনেক উলামায়ে কেরামের মতে)। তবে এটি শিরক নয়, বরং একটি নাজায়েয প্রথা। কিন্তু আপনার বর্ণিত ঘটনায় আপনি নিজে জন্মদিন পালন করেননি; বরং কিছু জিনিস (গিফট, জামা-জুতা, টাকা) পেয়েছেন বা কিনেছেন যা জন্মদিনের সময়ের সাথে মিলে গেছে। আপনার নিয়ত ছিল না জন্মদিন উদযাপনের। তাই এগুলো ব্যবহার করা জায়েয এবং এতে কোনো গুনাহ নেই।
দলিল ও হানাফি কিতাবের রেফারেন্স
১. উপহার গ্রহণ ও ব্যবহার করা জায়েয:
- যদি উপহার হালাল বস্তু হয় এবং তা দেওয়ার পেছনে “এটা জন্মদিনের উপহার” বলে শর্ত বা ইচ্ছা না থাকে, তবে তা গ্রহণ করা জায়েয। আপনি নিজে সেই উপহার চাননি, বরং দেওয়া হয়েছে। তাই এটি ব্যবহারে কোনো গুনাহ নেই।
- রদ্দুল মুহতার (৪/২২৭): “ঈদ বা বিশেষ দিনে উপহার দেওয়া-নেওয়া জায়েয, যদি তা বিদ‘আতের নিয়তে না হয়।” তবে জন্মদিনের ক্ষেত্রে উলামারা বলেন, যদি উপহার গ্রহণে উৎসব পালনের উদ্দেশ্য না থাকে, তবে গ্রহণ করা জায়েয।
২. নিজের অর্থ দিয়ে কেনা জিনিসপত্র:
- আপনি নিজের জমানো টাকা দিয়ে জামা-জুতা কিনেছেন। আপনার উদ্দেশ্য ছিল টাকা পেয়ে খুশি হয়ে কেনা, জন্মদিন পালনের জন্য নয়। আপনার নিয়ত যদি বাজার করা ও প্রয়োজন মেটানো হয়, তবে তা হালাল। এমনকি সেই মাসে টাকা বেশি পাওয়ার কারণেও কেনা হলে, তাতে জন্মদিন পালনের ইচ্ছা না থাকলে কোনো দোষ নেই।
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (৫/২৬৪): “নিয়তের উপরই আমলের ফল নির্ভর করে। যদি কেউ কোনো বস্তু কেনে শুধু প্রয়োজনবশত, তবে তা হালাল।”
৩. পিতার কাছ থেকে পাওয়া টাকা:
- পিতা আপনাকে টাকা দিয়েছেন। এটি পিতার কর্তব্য ও ভালোবাসা। আপনি যদি তা গ্রহণ করেন এবং প্রয়োজনীয় কাজে ব্যবহার করেন, তবে তা হালাল। জন্মদিনের দিন দেওয়া হলেও, যেহেতু আপনি সেই টাকা দিয়ে জন্মদিন উদযাপন করবেন না (যেমন কেক কাটা, পার্টি ইত্যাদি), তাই তা নাজায়েয নয়।
- ফাতাওয়া উসমানী (২/২৫৬): “পিতা-মাতার দেওয়া উপহার গ্রহণ করা এবং তা ব্যবহার করা জায়েয, যদিও তা কোনো বিশেষ দিনে দেওয়া হয়, যতক্ষণ না সেই দিনটিকে উৎসবের রূপ দেওয়ার উদ্দেশ্য থাকে।”
৪. ওয়াসওয়াসা দূর করা:
- শয়তানের ওয়াসওয়াসাকে গুরুত্ব দেবেন না। ইসলাম সহজ পথ দেখিয়েছে। আপনি যদি জন্মদিনের অনুষ্ঠান, কেক কাটা, গান-বাজনা ইত্যাদি কিছু না করে থাকেন, তাহলে আপনার কাজ শিরক নয়।
- মা‘আরিফুল কুরআন (সূরা আল-আ‘রাফ, ৭:২০১-এর ব্যাখ্যায়): “ওয়াসওয়াসা আসলে শয়তানের কাজ, মুমিনের উচিত তা দূর করা এবং আল্লাহর উপর নির্ভর করা।”
আপনার জিনিসগুলো ব্যবহার করা যাবে কি?
হ্যাঁ, ব্যবহার করা যাবে। কোনো সমস্যা নেই। তবে ভবিষ্যতে জন্মদিন উপলক্ষে কোনো কিছু কেনা বা গ্রহণ করলে নিয়ত পরিষ্কার রাখবেন যে, তা জন্মদিন পালনের জন্য নয়, বরং প্রয়োজন বা ভালোবাসা থেকে।
সতর্কতা (ভবিষ্যতের জন্য):
- জন্মদিনের কোনো অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়া, কেক কাটা, মোমবাতি জ্বালানো, গান-বাজনা করা ইত্যাদি থেকে বিরত থাকুন।
- অন্যদেরও বোঝার চেষ্টা করুন যে, ইসলামে জন্মদিন পালনের কোনো বিধান নেই।
- উপহার বা টাকা পেলে তা ব্যবহার করতে পারেন, কিন্তু জন্মদিনকে উৎসবের রূপ দেবেন না।
চূড়ান্ত ফতোয়া:
- আপনার জামা-জুতা ও উপহার ব্যবহার জায়েয এবং এতে আপনি জন্মদিনকে সমর্থন করেননি বা শিরকে লিপ্ত হননি।
- আপনার অজান্তে শিরকি কাজে সাই দেওয়ার কোনো আশঙ্কা নেই, কারণ আপনি নিজে সেই কাজটি করেননি।
- ওয়াসওয়াসা থেকে বাঁচতে বেশি বেশি “আউযু বিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজীম” পড়ুন এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করুন। যদি ভুলবশত কোনো কল্পিত পাপ হয়ে থাকে, তওবা করলে আল্লাহ ক্ষমাশীল।
সূত্র:
- রদ্দুল মুহতার (৪/২২৭)
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (৫/২৬৪)
- ফাতাওয়া উসমানী (২/২৫৬)
- বাহিষ্টি জেওর (দশম অধ্যায়)
- মা‘আরিফুল কুরআন (সূরা আল-আ‘রাফ, ২০১)
আল্লাহ আপনাকে সঠিক বুঝ দান করুন এবং ওয়াসওয়াসা থেকে হেফাজত করুন।