মনে মনে নিজের সঙ্গে কথা বলা বা নফসকে সম্বোধন করা যাবে কিনা
Halal and Haram · Hanafi
Question
---
আসসালামু আলাইকুম। আমি ওয়াসওয়াসা (OCD) রোগে আক্রান্ত। এই রোগে নফস বিভিন্ন কাজ বারবার করার জন্য প্ররোচনা দেয় — যেমন বারবার হাত ধোয়া, বা মনে মনে একই কথা বারবার আওড়ানো। এটি মূলত শয়তান নফসের প্ররোচনায় হয়ে থাকে।
যখন ওয়াসওয়াসার কবলে পড়ি তখন চিকিৎসার উদ্দেশ্যে আমি মনে মনে নিজেকে বলতে চাই —
"শয়তান নফস, তুই আমাকে বারবার এই কাজ করতে বলছিস। আমি জানি, বারবার করাতে কোনো ফায়দা নেই। আমি বারবার করব না। তোর যা করার আছে, কর।"
এখানে আমার উদ্দেশ্য হলো — নিজের নফসকে সম্বোধনের মাধ্যমে তার ওয়াসওয়াসাকে গুরুত্বহীনভাবে উপস্থাপন করা এবং নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা।
প্রশ্ন হলো — এভাবে বলা যাবে কি না?
Answer
উত্তর:
আপনার ওয়াসওয়াসা (OCD) রোগের কারণে মনে মনে নিজের নফস বা শয়তানকে সম্বোধন করা জায়েয আছে, তবে কিছু শর্ত ও আদব মেনে চলা উত্তম।
১. সাধারণ বিধান
মনে মনে নিজের সঙ্গে কথা বলা বা নফসকে সম্বোধন করা শরিয়তে নিষিদ্ধ নয়, যতক্ষণ না তা কোনো গুনাহের কাজ বা কুফরির দিকে না নিয়ে যায়। এটি মূলত হাদীসে নাফস (অভ্যন্তরীণ কথা)-এর অন্তর্ভুক্ত, যা শরিয়তের বিধানের ক্ষেত্রে সাধারণত মাফ বা হালাল গণ্য হয়। (সূত্র: আল-হিদায়া, كتاب الكراهية; রদ্দুল মুহতার, باب ما يكره من الكلام)
২. ওয়াসওয়াসা মোকাবিলায় হানাফি ফিকহের দিকনির্দেশনা
হানাফি ফুকাহায়ে কেরাম ওয়াসওয়াসা দূর করার জন্য কয়েকটি পদ্ধতি উল্লেখ করেছেন:
-
আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করা:
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: “যখন শয়তানের পক্ষ থেকে কোনো ওয়াসওয়াসা আসে, তখন তোমরা ‘আউযু বিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজীম’ বলবে এবং বাম দিকে তিনবার থুথু ফেলবে।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২২০৩)
এটি সর্বোত্তম পদ্ধতি। -
ওয়াসওয়াসাকে গুরুত্ব না দেওয়া:
ইমাম ইবনু আবিদীন (রহ.) লিখেছেন: “ওয়াসওয়াসার চিকিৎসা হলো তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া এবং তার দিকে ভ্রূক্ষেপ না করা।” (রদ্দুল মুহতার, ১/২৭৩) -
নিজেকে জোরালোভাবে বলা:
আপনার উল্লেখিত পদ্ধতি— “শয়তান নফস, তুই আমাকে বারবার বলছিস… আমি জানি এতে কোনো লাভ নেই, আমি করব না”— এটি মনস্তাত্ত্বিক থেরাপির অংশ হিসেবে গণ্য হতে পারে। যেহেতু এটি আপনার নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য একটি উপায়, তাই শারয়ীভাবে এতে কোনো বাধা নেই।
৩. গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা
-
শয়তান ও নফসের মধ্যে পার্থক্য:
কুরআন-হাদিসে ‘নফস’ ও ‘শয়তান’ ভিন্ন সত্তা। তবে ‘শয়তান নফস’ বলে অভিব্যক্তি ব্যবহার করলে তা ভুল নয়, কারণ নফসও শয়তানের প্ররোচনায় কাজ করে। তবে উত্তম হলো স্পষ্ট করে বলা: “হে আমার নফস, তুমি শয়তানের কুমন্ত্রণায় কাজ করছ…” (সূত্র: মাআরিফুল কুরআন, সূরা ইউসুফের তাফসির) -
দু‘আ ও জিকিরের বিকল্প নয়:
মনে মনে নফসকে সম্বোধন করলেও ওয়াসওয়াসা কমাতে মূল ভরসা হতে হবে আল্লাহর জিকির ও দুআর উপর। আল্লাহ বলেন:“যারা তাকওয়া অবলম্বন করে, যখন শয়তানের কোনো কুমন্ত্রণা তাদের স্পর্শ করে, তখন তারা আল্লাহকে স্মরণ করে এবং তখনই তাদের চোখ খুলে যায়।” (সূরা আল-আ‘রাফ, ৭:২০১)
-
শর্ত: এই ধরনের কথায় যেন ঈমান বা ইসলামের কোনো মৌলিক বিষয়ে অবমাননা বা হাস্যরস না থাকে।
৪. ফাতাওয়া ওসমানী ও ইমদাদুল ফাতাওয়া থেকে নির্দেশনা
- ফাতাওয়া উসমানী (১/২৯০) তে বলা হয়েছে: “ওয়াসওয়াসা দূর করার জন্য কুরআন তিলাওয়াত ও জিকিরই সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি। তবে মানসিক চিকিৎসার অংশ হিসেবে নিজেকে শাসন করা বা সাইকোলজিক্যাল টেকনিক ব্যবহার করাতে কোনো দোষ নেই, যদি তা শিরক বা হারামের সাথে যুক্ত না হয়।”
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (৪/২৬৯)-এ এসেছে: “নিজের সঙ্গে কথা বলার মতো বিষয়গুলো কল্পনা ও মানসিক অবস্থার অন্তর্ভুক্ত; সেগুলো ফিকহি হুকুমের আওতায় আসে না, যতক্ষণ না তা বাহ্যিক আমলকে প্রভাবিত করে।”
৫. আপনার পদ্ধতি সম্পর্কে চূড়ান্ত ফাতওয়া
আপনার বর্ণিত বাক্যগুলো বলা জায়েয এবং অর্থগতভাবে সঠিক। তবে নিম্নোক্ত সংযোজন করলে অধিক উত্তম হবে:
“শয়তান নফস, তুই আমাকে বারবার এই কাজ করতে বলছিস। আমি জানি, বারবার করাতে কোনো ফায়দা নেই। আমি বারবার করব না, ইনশাআল্লাহ। আমি আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাই তোর কুমন্ত্রণা থেকে।”
এইভাবে নিজেকে সান্ত্বনা দেওয়া এবং ওয়াসওয়াসাকে তুচ্ছজ্ঞান করা চিকিৎসার একটি কার্যকর উপায় হতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে কুরআন-সুন্নাহর পদ্ধতি অবলম্বন করাই উত্তম।
আল্লাহ আপনাকে ওয়াসওয়াসা থেকে মুক্তি দিন। আমিন।