ওষুধ কোম্পানির চাকরি, ডাক্তারদের ঘুষ ও উপহারের বিধান, তাছাড়া নিজের জন্য উপহারের কোনো অংশ রাখা যাবে কি?
Business and Job · Hanafi
Question
আমার এক আত্মীয় ওষুধের কোম্পানিতে চাকরি করেন।উনাদের কোম্পানির ওষুধ সম্পর্কে ডাক্তারদের বুঝান,আর ফার্মেসিতে কি কি ওষুধ লাগবে তার অর্ডার নেন।
ডাক্তাররা যেনো রোগীদের উনাদের কোম্পানির ওষুধের নাম লিখে দেন তার জন্য কোম্পানি থেকে অনেক উপহার দেওয়া হয় ডাক্তারদের।আবার আমার আত্মীয়ও ডাক্তারদের জন্য অনেক টাকা খরচ করেন।এগুলো কি ঘুষ হিসেবে গণ্য হবে?এই চাকরি কি হালাল?
আর ডাক্তারদের জন্য যেই উপহার কোম্পানি দেয় সেটা থেকে কিছু উপহার আমার আত্মীয় কাউকে না বলে নিজের জন্য রেখে দিলে গুনাহ হবে?অথবা তার বসের কাছে বলে নিতে পারবেন?
আমার আত্মীয়কে এগুলো রাখতে না করলে তিনি বলেন যে প্রতিমাসে ডাক্তারদের জন্য আমার বেতন থেকে অনেক টাকা খরচ করতে হয়।এই টাকা খরচ করতে না হলে আমি রাখতাম না।তাকে বুঝানোর পরও সে রেখে দিলে আমি যেহেতু তার উপর নির্ভরশীল আমি কি এগুলো ব্যবহার করা বা খাওয়ার কিছু হলে সেগুলো খেতে পারবো?
Answer
উত্তর
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রশ্নে উল্লেখিত ওষুধ কোম্পানির চাকরি ও সংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ডগুলো শরী‘আতের দৃষ্টিতে খুবই সতর্কতার সাথে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। নিচে প্রতিটি দিক আলাদাভাবে আলোচনা করা হলো—
১. চাকরিটি কি হালাল?
চাকরির মূল কাজ যদি হয় কোম্পানির ওষুধ সম্পর্কে ডাক্তারদের বুঝানো এবং ফার্মেসি থেকে অর্ডার নেওয়া, তাহলে এ কাজটি নিজে নিজে নিষিদ্ধ নয়। কিন্তু এর সাথে যদি এমন কোনো কাজ যুক্ত থাকে যা হারাম, যেমন—ডাক্তারদের ঘুষ দেওয়া বা ঘুষের মাধ্যমে প্রেসক্রিপশন লিখতে উৎসাহিত করা, তাহলে পুরো চাকরিটি হারাম হয়ে যেতে পারে। কারণ, কোম্পানি ডাক্তারদের উপহার দেয় শর্তে যে তারা যেন তাদের ওষুধ লিখে দেয়—এটা স্পষ্ট ঘুষ।
হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ ﷺ ঘুষদাতা, ঘুষগ্রহীতা এবং উভয়ের মধ্যস্থতাকারীকে অভিশাপ দিয়েছেন। (সুনানে আবু দাউদ, হাদীস: ৩৫৮০; সুনানে তিরমিযী, হাদীস: ১৩৩৭)
এ কারণে আপনার আত্মীয়ের চাকরি যদি সরাসরি ঘুষের লেনদেনের সাথে জড়িত থাকে, তাহলে তা হালাল নয়। অবশ্য তিনি যদি শুধু ওষুধের তথ্য দেওয়ার কাজটি করেন এবং ঘুষ দেওয়ার প্রক্রিয়ায় অংশ না নেন, তবে পৃথক বিবেচনা করতে হবে। কিন্তু প্রশ্ন থেকে বোঝা যায়, তিনি নিজেও ডাক্তারদের জন্য অর্থ খরচ করেন এবং কোম্পানির পক্ষ থেকে উপহার দেওয়ার ব্যবস্থায় জড়িত—সুতরাং তিনি ঘুষের মাধ্যম হতে পারেন।
২. ডাক্তারদের দেওয়া উপহার কি ঘুষ?
হ্যাঁ, যদি উপহার দেওয়ার উদ্দেশ্য হয় ডাক্তার যেন কোম্পানির ওষুধ লিখে দেন, তবে তা নিঃসন্দেহে ঘুষ। এমনকি সেটাকে ‘উপহার’ নামে ডাকলেও প্রকৃতি পরিবর্তন হয় না। ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর মতে, ঘুষের সংজ্ঞায় বিনিময়ের উদ্দেশ্যে প্রদত্ত বাড়তি সুবিধা অন্তর্ভুক্ত। (রদ্দুল মুহতার, ৬/৪২৫)
তবে যদি উপহার কোনো শর্ত ছাড়া দেওয়া হয়, শুধু সদাচারের জন্য, তাহলে ভিন্ন কথা। কিন্তু বাস্তবে তা কদাচিৎ ঘটে।
৩. কোম্পানির দেওয়া উপহার থেকে নিজের জন্য রাখা
এটা স্পষ্ট খিয়ানত (বিশ্বাসভঙ্গ) এবং গুনাহ। কারণ ওই উপহার কোম্পানি ডাক্তারদের উদ্দেশ্যে দিয়েছে, আপনার আত্মীয়ের ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। বসের অনুমতি ছাড়া তা নিজের জন্য রাখা বৈধ নয়। এমনকি বসের কাছে বলে নিলেও, যদি ওই জিনিস ডাক্তারদের জন্যই নির্ধারিত থাকে, তাহলে বসের অনুমতি দিয়ে দেওয়ার এখতিয়ার নেই। তাই বসের অনুমতি নিলেও তা বৈধ হবে না, যদি না কোম্পানির নীতি অনুযায়ী তা কর্মচারীদের জন্য অনুমোদিত হয়।
ইবনে আবেদীন (রহ.) লিখেছেন:
“কোনো কোম্পানির কর্মচারীর জন্য কোম্পানির মাল থেকে নিজে ব্যবহার করা বা অন্যকে দেওয়া জায়েয নয়, যদি না মালিক বা তার প্রতিনিধি স্পষ্টভাবে অনুমতি দেয়।” (রদ্দুল মুহতার, ৫/৫৮)
৪. আত্মীয়ের যুক্তি ও তার দেওয়া জিনিস ব্যবহার
তিনি বলছেন, ডাক্তারদের জন্য নিজের বেতন থেকে খরচ করতে না হলে তিনি রাখতেন না—এটা একটি ভুল যুক্তি। কারণ নিজের অর্থ খরচ করাটাও যদি হারাম কাজে হয় (যেমন ঘুষ দেওয়া), তাহলে সেটা ত্যাগ করা উচিত। হারাম কাজ থেকে বিরত থাকা আবশ্যক, এবং সেই কারণে নিজের জন্য হারাম জিনিস বৈধ হয়ে যায় না।
মহান আল্লাহ বলেন:
“তোমরা একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না।” (সূরা আল-বাকারা: ১৮৮)
সুতরাং আপনি যদি নিশ্চিত হন যে আপনার আত্মীয় যে জিনিস নিজের জন্য রেখেছেন তা হারাম উপায়ে অর্জিত, তাহলে তা খাওয়া বা ব্যবহার করা আপনার জন্যও হারাম। এমনকি তিনি আপনার অভিভাবক বা নির্ভরশীল হলেও, হারাম বস্তু তার অনুমতিতে খাওয়া যায় না। ইমাম নববী (রহ.) বলেন, “হারাম মাল কাউকে দান করলেও তা গ্রহীতা গ্রহণ করতে পারে না, বরং তা ফিরিয়ে দেওয়া বা সদকা করে দেওয়া ওয়াজিব।” (শরহু মুসলিম, ১১/২৪)
৫. সমাধান ও পরামর্শ
- আপনার আত্মীয়ের উচিত—ডাক্তারদের ঘুষ বা প্রভাব বিস্তারের পদ্ধতি ত্যাগ করা।
- তিনি যদি শুধু তথ্য দেওয়ার কাজ সীমাবদ্ধ রাখেন এবং কোম্পানির পক্ষ থেকে কোনো শর্তযুক্ত উপহার বিতরণ না করেন, তাহলে চাকরি হালাল হতে পারে।
- নিজের বেতন থেকে খরচ করে ডাক্তারদের ‘উপহার’ দেওয়াও ঘুষের অন্তর্ভুক্ত—এটা বন্ধ করা জরুরি।
- কোম্পানির উপহার থেকে কিছু নিজে রাখা সম্পূর্ণ হারাম। তিনি যদি তা ফেরত না দিতে পারেন, তবে সেটা সদকা করে দেবেন মালিকের পক্ষ থেকে।
- আপনার জন্য নির্দেশনা: যে জিনিস হারাম বলে জানেন, তা খাওয়া বা ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকুন। আল্লাহ তাআলা হালাল রিজিকের ব্যবস্থা করবেন।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে হালাল উপার্জন ও খাওয়ার তাওফীক দান করুন। আমীন।
রেফারেন্স সমূহ:
- রদ্দুল মুহতার (৬/৪২৫, ৫/৫৮)
- ফাতাওয়া উসমানী (১/৪৫৬)
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (৪/৩৮০)
- বেহেশতি জেওর (বিক্রয়-ক্রয় অধ্যায়)
- সুনানে আবু দাউদ, হাদীস: ৩৫৮০
- কুরআন: সূরা আল-বাকারা ১৮৮