পরী (জিন) ও মানুষের শারীরিক সম্পর্ক ইসলামী দৃষ্টিতে সম্ভব কি না?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
Answer
প্রশ্ন: পরী (জিন) ও পুরুষের শারীরিক সম্পর্ক করা সম্ভব? ইসলামী দৃষ্টিতে এর বিধান কী?
উত্তর:
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম।
আলহামদুলিল্লাহি ওয়াসসালাতু ওয়াসসালামু আলা রাসূলিল্লাহ।
পরী বলতে সাধারণত জিন জাতির নারী সত্ত্বাকে বোঝানো হয়। জিন আল্লাহর সৃষ্ট এক অদৃশ্য সৃষ্টি, যা আগুন থেকে সৃষ্ট। কুরআন ও হাদিসে জিনের অস্তিত্ব ও তাদের সাথে মানুষের সম্পর্কের কথা এসেছে। তবে জিন ও মানুষের মধ্যে শারীরিক সম্পর্ক সম্ভব কি না এবং তার ইসলামী বিধান কী—এ বিষয়ে হানাফি ফিকহের কিতাবাদিতে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে।
১. শারীরিক সম্পর্ক সম্ভব কি না?
হানাফি ফিকহের ইমামগণ ও বড় বড় মুফতিগণ (রহ) এ ব্যাপারে একমত যে, জিন ও মানুষের মধ্যে শারীরিক সম্পর্ক সম্ভব। আল্লাহ তাআলা জিনকে শক্তি ও ক্ষমতা দিয়েছেন, তারা বিভিন্ন রূপ ধারণ করতে পারে। তাই তারা মানুষের আকৃতিতে এসে মানুষের সাথে শারীরিক মিলন ঘটাতে পারে। অনেক সাহাবি, তাবেয়ি ও পরবর্তী আলিমগণ এ ধরনের ঘটনার কথা উল্লেখ করেছেন।
উল্লেখ্য: পবিত্র কুরআনে সূরা আল-জিন ও সূরা আল-হিজরে জিনের কথা এসেছে। তাফসিরবিদগণ লিখেছেন, জিন ও মানুষের মধ্যে বিবাহ বা শারীরিক সম্পর্ক জায়েজ নয়, তবে সম্ভব বলে বর্ণিত আছে। ইমাম আবু হানিফা (রহ) থেকে বর্ণিত, জিন-ইনসানের মধ্যে বিবাহ বৈধ নয়, আর শারীরিক সম্পর্কও নাজায়েজ। কিন্তু বাস্তবে তা ঘটতে পারে। (ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/২৮২; রদ্দুল মুহতার, ৩/৪০৫)
২. ইসলামী বিধান (হানাফি মতে):
- বিবাহ বৈধ নয়: হানাফি মাজহাবের মত অনুযায়ী জিন ও মানুষের মধ্যে বিবাহ সম্পন্ন হয় না। কারণ বিবাহের জন্য পাত্র-পাত্রী উভয়ের সমজাতীয় হওয়া শর্ত নয়, তবে জিন-ইনসানের বিবাহের কোনো বৈধতা ইসলামি শরিয়তে নেই। ইমাম আবু হানিফা (রহ) ও তাঁর প্রধান শিষ্য ইমাম আবু ইউসুফ (রহ) বলেন, জিনের সাথে মানুষের বিবাহ জায়েজ নয়। (বদাইউস সানাই, ২/২৫৬; ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/২৮২)
- অবৈধ সম্পর্ক (যিনা): কোনো পুরুষ যদি পরী (জিন নারী) বা জিন পুরুষের সাথে ব্যভিচার করে, তবে তা সম্পূর্ণ হারাম ও কবিরা গুনাহ। এই কাজকে ইসলামে যিনার অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তাই কোনো উপায়ে তা জায়েজ নয়। (তাকমিলাতু ফাতহিল কাদির, ৩/৩৫৯)
- ক্ষতি ও বিপদ: আলিমগণ সতর্ক করেছেন, জিনের সাথে শারীরিক সম্পর্ক মানুষের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর হতে পারে। জিনের প্রভাবে মানুষ জিনে আক্রান্ত হতে পারে, মানসিক ও শারীরিক রোগে ভুগতে পারে। তাই এ বিষয়ে সম্পূর্ণ বিরত থাকা উচিত।
৩. হানাফি ফিকহের কিতাবের উদ্ধৃতি:
- রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদিন): জিন ও মানুষের মধ্যে শারীরিক সম্পর্কের সম্ভাবনা আছে, কিন্তু তা নাজায়েজ। (৩/৪০৫, বাবুন নিকাহ)
- ফাতাওয়া হিন্দিয়া (আলমগিরি): জিন-ইনসানের বিবাহ বৈধ নয়, তবে যদি কেউ করে তবে তা ফাসেদ। (১/২৮২)
- ফাতাওয়া উসমানী (মুফতি মুহাম্মদ তাকি উসমানি): জিনের সাথে শারীরিক সম্পর্ক সম্ভব হলেও তা সম্পূর্ণ হারাম। (২/৪২৮)
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (মাওলানা আশরাফ আলী থানভী): জিন-ইনসানের সম্পর্কের কথা সহিহ, তবে তা পরিহার করা ওয়াজিব। (৪/২৫৪)
৪. গুরুত্বপূর্ণ নোট:
- কোনো ব্যক্তি যদি দাবি করে যে সে জিনের সাথে সম্পর্ক রেখেছে, তবে তার কথা গ্রহণযোগ্য নয় unless কোনো রোগ বা অস্বাভাবিক আচরণ প্রকাশ পায়। তাহলে তাকে চিকিৎসা ও ইসলামি পরামর্শ নেওয়া উচিত।
- জিনের অস্তিত্ব মানা ফরজ, তবে তাদের নিয়ে অতিরিক্ত কৌতূহল বা ভয় না দেখানোই উত্তম। বরং কুরআন-সুন্নাহ মোতাবেক জীবনযাপন করলে জিনের অনিষ্ট থেকে নিরাপদ থাকা যায়।
সারসংক্ষেপ:
পরী (জিন নারী) ও পুরুষ মানুষের শারীরিক সম্পর্ক সম্ভব বটে, কিন্তু শরিয়তে সম্পূর্ণ হারাম ও নাজায়েজ। এ ধরনের সম্পর্ক যিনার অন্তর্ভুক্ত। তাই মুমিনের উচিত এ থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকা এবং তাওবা করা।
**আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে হারাম কাজ থেকে বাচার তাওফিক দান করুক।আমীন।