জীবিত নানুর সম্পদ পাওয়ার উপায়, বাবার সাথে দ্বীনি বিতর্কে নরম আচরণ, এবং সঠিক আকীদা (মাতুরিদী) শিক্ষার দিকনির্দেশনা
Family Life · Hanafi
Question
২. আমার বাবা নতুন নতুন ইসলাম নিয়ে স্টাডি করছে।এখন কারো ওয়াজ শুনে তিনি কখনো ডিসকাশন করে, আমাদের প্রশ্ন করে। আমরা মত দিলে আসলে বিশ্বাস করতে পারেন না বা উনি যদি ভূল কিছু শোনেন তাহলে সঠিকটা বললে অনেক তর্কাতর্কি হয়। আমি আসলে বুঝতে পারছিনা আমার কি করা উচিত। আমার কি হক বোঝানোর জন্য কঠিন ভাষা ব্যবহার করা উচিত নাকি তাকে তারমত ছেড়ে দিয়ে চুপ থাকা উচিত যেন বেয়াদবি না হয় সেটা এনশিউর করা উচিত? ইসলাম জানানোটা ফরজ নাকি বেয়াদবি না করে চুপ থাকাটা?
আমি জাহান্নামে যেতে চাই না।
আমার ও মেজাজ উঠে আসে যখন উনি সালাফি এক্সট্রিমিস্ট যারা মানুষকে, হানিফা(রা) ছোট করে বা আশয়ারি মাতুরিদি দের আকিদা ছোট করে অমুসলিম পর্যায়ে চলে যায় তাদের লেকচার শোনেন বা তাদের টোন কথায় চলে আসে। আমি অনেক সালাফি আলেমদের সম্মান করি যারা উগ্র নয়। নিজেদের ই শুধু ঠিক মনে করেন না। ভারসাম্য রক্ষা করেন।
এখন আমার কি করা উচিত যেন আব্বার সাথে বেয়াদবি না করেই হক আদায় করতে পারি। আমার কি এতটুকুতে সন্তুষ্ট থাকা উচিত যে তিনি বেসিক আকিদা ঠিক রেখেছেন?
৩. আকিদার দিক থেকে কোন আকিদা গ্রহণ করা ঠিক? আমি শিক্ষা গ্রহণ করতে চাই,কিছুই জানিনা। অনেক আলেম ভয় দেখান যে এসব ব্যাপারব যেন না ঘাটাঘাটি করি।বিচ্যুতি ঘটতে পাররে।কিন্তু আমি পড়তে চাই।
Answer
প্রশ্নের উত্তর
১. জীবিত নানুর কাছ থেকে সম্পদ গ্রহণ
প্রশ্ন: আমার মা মারা গেছেন, নানু জীবিত। ইসলামী আইনে আমরা (মায়ের সন্তান) নানুর সম্পদের ওয়ারিস নই। এখন আমি যদি নানুর জীবদ্দশায় তার কাছ থেকে কোনোভাবে সম্মতি নিয়ে সম্পদ নেই, তাহলে তা খাওয়া জায়েজ হবে? সরাসরি বললে ভেবে নেবেন যে আমরা তার মৃত্যুর অপেক্ষা করছি—এমন আশংকা থাকলে ঘুরিয়ে বললে কি হবে?
উত্তর:
হানাফী ফিকহ অনুযায়ী, মৃত মায়ের সন্তান (নাতি-নাতনি) জীবিত দাদা-নানার সম্পদের ওয়ারিস নয়। আপনি নানুর সম্পদ শুধু তখনই পেতে পারেন, যদি তিনি নিজ ইচ্ছায় আপনাকে হেবা (উপহার) দেন অথবা কোনো বৈধ চুক্তির মাধ্যমে দেন। ওয়ারিশ হিসেবে দাবি করার কোনো ইসলামী অধিকার নেই।
আপনি যদি নানুকে সরাসরি বলেন, "আমাদের আপনার সম্পদ থেকে কিছু দিন", তাহলে তা হেবার অনুরোধ হবে। তবে যদি এমনভাবে বলেন যে, "আমরা আপনার মৃত্যুর পর ওয়ারিশ হিসেবে পাবো বলে আইনে আছে, আপনি কি আমাদের এখনই দিয়ে দেবেন?"—এতে নানু মনে করতে পারেন আপনি তার মৃত্যু কামনা করছেন, যা নাজায়েজ এবং অশোভন।
নির্দেশিকা:
- নানুর কাছ থেকে সম্পদ নেওয়ার বৈধ পদ্ধতি হলো হেবা (গিফট)। আপনি স্পষ্টভাবে বলতে পারেন: "নানু, আপনি যদি খুশি হয়ে আমাদের কিছু দিতে চান, তাহলে আমরা কৃতজ্ঞ হব।"
- নানুর মৃত্যুর অপেক্ষা করার মতো কোনো ইঙ্গিত বা ভাব প্রকাশ করা থেকে বিরত থাকুন।
- নানু যদি নিজে থেকে দিতে চান, তাহলে তা গ্রহণ করা জায়েজ। কিন্তু আপনি সরাসরি ওয়ারিশ হিসেবে ভাগ চাইতে পারেন না, কারণ আপনি ওয়ারিশ নন।
রেফারেন্স:
- রদ্দুল মুহতার (৫/৬৯৫)
- ফাতাওয়া উসমানী (২/৫১৪)
- বেহেশতী জেওর (উত্তরাধিকার অধ্যায়)
২. বাবার সাথে মতানৈক্য ও দ্বীনি আলোচনা
প্রশ্ন: আমার বাবা নতুন নতুন ইসলাম নিয়ে পড়াশোনা করছেন এবং কখনো সালাফী এক্সট্রিমিস্টদের লেকচার শুনে আমাদের সাথে বিতর্ক করেন। আমি সঠিক কথা বললে তর্কাতর্কি হয়। আমার করণীয় কী? কঠিন ভাষা ব্যবহার করব নাকি চুপ থাকব? ইসলাম জানানো ফরজ, না বেয়াদবি না করে চুপ থাকা?
উত্তর:
পিতা-মাতার সাথে কথায় কঠোরতা বা অশালীনতা ব্যবহার করা হারাম। আল্লাহ বলেন:
"তাদের সাথে সম্মানসূচক নরম কথা বলো।" (সূরা বনী ইসরাঈল: ২৩)
আপনার কর্তব্য হলো:
ক) দ্বীনি জ্ঞান সঠিকভাবে অর্জন করা: আপনি নিজে হানাফী মাতুরিদী আকীদা ও ফিকহের সঠিক জ্ঞান অর্জন করুন, যাতে বাবার ভুল ধারণাগুলো দলীলসহ খণ্ডন করতে পারেন।
খ) নরম পদ্ধতি অবলম্বন করুন: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"নিশ্চয়ই আল্লাহ নম্রতা পছন্দ করেন এবং নম্রতার বিনিময়ে এমন দেন যা কঠোরতায় দেন না।" (মুসলিম: ২৫৯৩)
বাবাকে একান্তে, ভালোবেসে বলুন: "আব্বা, আপনি যদি সালাফী মানহাজের তিক্ত আলোচনা শোনেন, তাহলে দয়া করে তার বিপরীতে হানাফী ইমামদের দলীলও দেখুন। আমি আপনাকে [কোনো বিশুদ্ধ গ্রন্থ] পড়তে দিতে পারি।"
গ) বেয়াদবি না করে চুপ থাকা জায়েজ: যদি বাবা জেদ করেন এবং উত্তেজিত হন, তাহলে চুপ থাকা উত্তম। ইসলামের সঠিক শিক্ষা পৌঁছানো ফরজ হলেও, পিতার অবাধ্য হওয়া বা অসম্মান করা জায়েজ নয়। যখন তিনি প্রশান্ত থাকবেন, তখন আবার আলোচনা করবেন।
ঘ) নিজের মেজাজ নিয়ন্ত্রণ করুন: আপনি যদি রাগান্বিত হয়ে যান, তাহলে যে কোনো প্রতিক্রিয়া ভুল হতে পারে। তাই নিজেকে শান্ত রাখতে ওজু করুন বা স্থান ত্যাগ করুন।
ফাতাওয়া ওসমানী (৫/৪২৭) তে এসেছে:
"পিতার কোনো ভুল থাকলে নরম ভাষায় বুঝাতে হবে। যদি না মানে, তাহলে চুপ থাকা জরুরি। কারণ পিতার সাথে বেয়াদবি বড় গুনাহ।"
সন্তুষ্টির মাপকাঠি: আপনার পিতা যদি মৌলিক আকীদা (আল্লাহর একত্ব, রিসালাত, শেষ দিন) ঠিক রেখে থাকেন, কিন্তু কিছু বিষয়ে বিভ্রান্ত হন, তাহলে তাকে এতটুকুতেই সন্তুষ্ট রাখার চেষ্টা করুন এবং ধীরে ধীরে সংশোধন করুন। তবে যদি তিনি মুসলিম-অমুসলিম পর্যায়ে চলে যান (তাকফির করেন), তাহলে তা তাকে পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দিন যে এটি ভুল, তবে নরম ভাষায়।
৩. আকীদা গ্রহণে করণীয়
প্রশ্ন: আকীদার দিক থেকে কোন আকীদা গ্রহণ করা ঠিক? আমি পড়তে চাই, কিন্তু অনেক আলেম ভয় দেখান যে ঘাটাঘাটি করলে বিচ্যুতি হবে। আমার কী করা উচিত?
উত্তর:
হানাফী মাযহাবের অনুসারীদের জন্য নির্ভরযোগ্য আকীদা হলো মাতুরিদী আকীদা (ইমাম আবু মনসুর মাতুরিদী এর অনুসৃত পথ)। এটি আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আতের দুই প্রধান ধারার একটি (অন্যটি আশ‘আরী)। মাতুরিদী-আশ‘আরী উভয়ই সহীহ এবং হানাফী ফিকহের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ।
আপনার জন্য সুপারিশ:
- প্রথমে সহজ কিতাব পড়ুন: ‘আল-আকীদাহ আত-তাহাবিয়্যাহ’ (ইমাম ত্বহাবী) এবং তার ব্যাখ্যা। এটি হানাফী ও মাতুরিদী আকীদার সারসংক্ষেপ।
- সঠিক শিক্ষকের সন্ধান করুন: কোনো নির্ভরযোগ্য হানাফী আলেমের কাছে আকীদার বই পড়ুন বা অনলাইনে ‘মুফতি তাকী উসমানী’, ‘মুফতি শফী’ প্রমুখের লেখা ও বক্তব্য শুনুন।
- ভয় না পেয়ে সতর্ক থাকুন: আকীদার আলোচনা থেকে দূরে থাকা সমাধান নয়, বরং সঠিক জ্ঞান অর্জন করে বুঝে নেওয়া জরুরি। তবে সন্দেহের ক্ষেত্রে অভিজ্ঞ আলেমের শরণাপন্ন হোন।
- গ্রুপ বা লেকচার যাচাই করুন: ‘একমাত্র আমরাই সঠিক, বাকিরা জাহান্নামী’—এমন উগ্র দৃষ্টিভঙ্গির লেকচার থেকে বিরত থাকুন।
উল্লেখ্য:
ইমাম আবু হানীফা (রহ.) নিজেই আকীদা বিষয়ে ‘আল-ফিকহ আল-আকবর’ গ্রন্থ রচনা করেছেন। আপনার উচিত তার অনুসৃত পথ সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করা।
রেফারেন্স:
- আল-ফিকহ আল-আকবর (ইমাম আবু হানীফা)
- মা‘আরিফুল কুরআন (মুফতি শফী)
- ‘ইসলামী আকীদা’ (মুফতি তাকী উসমানী)