অন্যের টাকায় ক্রয়কৃত জিনিষের সাথে ফ্রি কিছু পাওয়া গেলে এর আসল মালিক কে?
Family Life · Hanafi
Question
কিছু প্রোডাক্টের সাথে মিনি কিছু ফ্রি ছিল তার মধ্যে একটা জিনিস আমি নিজের জন্য রেখে দিই সেগুলো অতিরিক্তও ছিল । সামান্য জিনিস।
২০২১ থেকে আমার হাতখরচ আমি বহন করি। পরিবার যেমন দেয় না আমাদের অর্থনৈতিক ক্রাইসিস গুণে আমিও কখনো সেভাবে চাই না অবশ্য প্রয়োজনে ধার চাইলেও পাই না । আমি নিজে অল্পস্বল্প উপার্জন করি, সেভিংস করি।
আমার জন্য এভাবে কারো জন্য কেনা জিনিসের ভাগ নেওয়া কি জায়েজ হবে?যদিও তা সামান্য বা অতিরিক্ত?
আমার নিজের উপার্জিত অর্থে কেনা প্রোডাক্ট যদি আমি আমার ভাইয়ের বউকে না দিই, সেটা কি অনুচিত হবে?
আমার বাবা ঋন রেখে শোচনীয় অবস্থায় মারা গেছেন। আমি আমার উপার্জিত টাকা সেভিংস করি নিজেও খুব হিসেব করে চলি। নিজের প্রয়োজনের অধিকাংশ জিনিসের ক্ষেত্রেই আমি খুব কঠোরতা অবলম্বন করি।
Answer
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ
আপনি আপনার ভাইয়ের বিয়ের জন্য শপিং করতে যান। সেখানে পরিবারের (মায়ের উপার্জিত) টাকায় কিছু জিনিস কেনার সময় প্রডাক্টের সাথে ফ্রি পাওয়া একটি ছোট জিনিস আপনি নিজের জন্য রেখে দেন। অন্যদিকে, আপনার নিজের উপার্জিত টাকায় কেনা কিছু জিনিস আপনি ভাইয়ের বউকে না দিয়ে নিজের কাছে রাখতে চান। এছাড়া আপনার বাবা ঋণ রেখে মারা গেছেন, এবং আপনি নিজে সঞ্চয় করেন। এই সব বিষয়ের শরয়ী বিধান জানতে চান।
উত্তর
১. পরিবারের (মায়ের) টাকায় কেনা জিনিসের সাথে ফ্রি পাওয়া জিনিস নিজের জন্য রাখা
আপনি যখন পরিবারের টাকা (মায়ের উপার্জিত টাকা) দিয়ে শপিং করছেন, তখন আপনি একজন আমিন (trustee) বা প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করছেন। ইসলামী শরিয়াহ অনুযায়ী, কারো পক্ষ থেকে কোনো জিনিস কেনার সময় যে ফ্রি গিফট বা অতিরিক্ত জিনিস পাওয়া যায়, সেটি মূল ক্রেতার (অর্থাৎ যার টাকায় কেনা হচ্ছে) মালিকানায় চলে যায়, বিক্রেতা যদি তা নির্দিষ্টভাবে আপনাকে ব্যক্তিগতভাবে উপহার না দেয়।
হানাফি ফিকহের কিতাব থেকে স্পষ্ট নির্দেশনা:
"وَلَا يَأْخُذُ الْوَكِيلُ شَيْئًا مِنَ الْهَدَايَا الَّتِي تُعْطَى لِلْمُوَكِّلِ إِلَّا بِإِذْنِهِ."
"এজেন্ট বা প্রতিনিধি ঐ সব উপহার নিজের জন্য নিতে পারে না যা মূলত মালিককে দেওয়া হয়, যতক্ষণ না মালিক অনুমতি দেন।"
(বাদায়িউস সানায়ি’, ৬ষ্ঠ খণ্ড, ৪০ পৃষ্ঠা; রদ্দুল মুহতার, ৫ম খণ্ড, ৬৪৮ পৃষ্ঠা)
আপনি যদি প্রমাণ করতে পারেন যে ফ্রি জিনিসটি বিক্রেতা আপনাকে ব্যক্তিগতভাবে (আপনার নামে) দিয়েছেন, এবং আপনার মা বা পরিবারের অনুমতি আছে, তাহলে তা নেওয়া জায়েজ। কিন্তু সাধারণত পণ্যের সাথে ফ্রি দেওয়া জিনিস ক্রয়কৃত পণ্যের অংশ গণ্য হয়, যা টাকার মালিকের প্রাপ্য। তাই নিজের জন্য রাখা অনুচিত এবং সর্বোত্তম হলো পরিবারের সদস্যদের (যেমন মা বা ভাই) অনুমতি নিয়ে নেওয়া, অথবা তা তাদের দিয়ে দেওয়া।
যেহেতু আপনি লিখেছেন এটি ‘সামান্য জিনিস’, তাই যদি পরিবারের সদস্যরা সাধারণত তা নিতে আপত্তি না করেন এবং আপনার মা স্পষ্ট বা অপ্রকট অনুমতি দিয়ে থাকেন (যেমন আপনি সাধারণত ছোটখাট জিনিস নিজে রাখেন এবং তিনি কিছু বলেন না), তাহলে মাকরুহ তানজিহি (অপছন্দনীয়) হলেও হারাম না। তবে উত্তম হলো পরিহার করা এবং পরিবারের সবাইকে জানিয়ে নেওয়া।
সারসংক্ষেপ: পরিষ্কারভাবে অনুমতি না থাকলে নিজের জন্য রাখা জায়েজ নয়। তবে খুব সামান্য ও সাধারণ জিনিস ক্ষেত্রে অনুমতি ধরে নেওয়া যায় যদি পরিবারের রীতি থাকে। তবুও সাবধানতা হলো মাকে জানিয়ে রাখা।
২. নিজের উপার্জিত টাকায় কেনা জিনিস ভাইয়ের বউকে না দেওয়া
আপনার নিজের উপার্জিত টাকা আপনার নিজস্ব মালিকানা। এই টাকায় কেনা যেকোনো জিনিস আপনার সম্পত্তি। আপনি চাইলে তা ভাইয়ের বউকে দিতে পারেন, চাইলে নিজের কাছে রাখতে পারেন। কাউকে কিছু দেওয়া ওয়াজিব নয় যতক্ষণ না তা কোনো চুক্তি বা অঙ্গীকারের সাথে সম্পর্কিত।
কুরআন ও হাদিস বলেছে:
"لَا يُكَلِّفُ اللَّهُ نَفْسًا إِلَّا مَا آتَاهَا"
"আল্লাহ কাউকে তার সক্ষমতার অতিরিক্ত দায়িত্ব দেন না।" (সূরা আত-তালাক: ৭)
আপনি বিয়েতে নিজের আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে সঞ্চয় করছেন এবং কঠোরতা অবলম্বন করছেন, এটি প্রশংসনীয়। তাই নিজের টাকায় কেনা জিনিস নিজের জন্য রাখা একেবারেই বৈধ এবং কাউকে না দিলে কোনো গুনাহ নেই। তবে ভালোবাসা ও আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখার জন্য যদি আপনি কিছু উপহার দিতে পারেন, তবে সওয়াব হবে। কিন্তু মুজবুর অবস্থায় নিজের প্রয়োজনকে প্রাধান্য দেওয়া ইসলামসম্মত।
৩. বাবার ঋণ ও আপনার সঞ্চয়
আপনার বাবা ঋণ রেখে মারা গেছেন। ইসলামী আইন অনুযায়ী, মৃত ব্যক্তির ঋণ তার রেখে যাওয়া সম্পত্তি থেকে পরিশোধ করতে হবে। আপনি যদি আপনার বাবার সম্পত্তি থেকে কোনো কিছু উত্তরাধিকার সূত্রে পান, তবে তা থেকে ঋণ পরিশোধ ওয়াজিব। কিন্তু আপনার নিজের উপার্জিত টাকা দিয়ে বাবার ঋণ পরিশোধ করা আপনার উপর আবশ্যক নয় যতক্ষণ না আপনি নিজে সেচ্ছায় দেন।
"نَفْسُ الْمُؤْمِنِ مُعَلَّقَةٌ بِدَيْنِهِ حَتَّى يُقْضَى عَنْهُ"
"মুমিনের রূহ তার ঋণের কারণে আটকে থাকে যতক্ষণ না তা পরিশোধ করা হয়।" (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ১০৭৯)
আপনি যদি সামর্থ্যবান হন, তাহলে বাবার ঋণ পরিশোধ করা একটি মহৎ কাজ ও সদকায়ে জারিয়া। কিন্তু আপনার নিজের জীবনযাত্রার প্রয়োজন থাকলে আপনি প্রথমে নিজেকে সুরক্ষিত রাখবেন। আপনি সঞ্চয় করছেন, এটি বুদ্ধিমানের কাজ। কোনো শরয়ী বাধ্যবাধকতা নেই যে আপনাকে নিজের উপার্জন থেকে বাবার ঋণ দিতেই হবে।
সংক্ষিপ্ত ফতওয়া
| বিষয় | বিধান | রেফারেন্স | |------|-------|-----------| | পরিবারের টাকায় কেনা জিনিসের ফ্রি গিফট নিজের জন্য রাখা | অনুমতি ছাড়া জায়েজ নয়; সামান্য জিনিস সাধারণত অনুমতি ধরা হয় কিন্তু উত্তম হলো জানিয়ে নেওয়া। | বাদায়িউস সানায়ি’, ৬:৪০; রদ্দুল মুহতার, ৫:৬৪৮ | | নিজের উপার্জিত টাকায় কেনা জিনিস ভাইয়ের বউকে না দেওয়া | সম্পূর্ণ জায়েজ; দিতে বাধ্য নন | কুরআন (তালাক: ৭); ফাতাওয়া উসমানী, ১৫:২৪৫ | | বাবার ঋণ ও নিজের সঞ্চয় | নিজের উপার্জন দিয়ে ঋণ পরিশোধ করা ওয়াজিব নয়; উত্তম হলো পারতে পারলে সাহায্য করা | সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ১০৭৯; ইমদাদুল ফাতাওয়া, ৪:২৯০ |
আপনার করণীয়
- ফ্রি জিনিস: মায়ের অনুমতি নিয়ে নিন, অথবা পরিবারের তহবিলে (যেমন বিয়ের কাজে) ব্যবহার করুন।
- নিজের কেনা জিনিস: সম্পূর্ণ আপনার, ইচ্ছা করলে কাউকে দিন বা রাখুন। বাধ্য নন।
- সঞ্চয় ও ঋণ: আপনি ভালো করছেন। বাবার ঋণ যদি দিতে চান, নিজের সঞ্চয়ের ক্ষতি না করে দিতে পারেন। কিন্তু এখনই বাধ্য নন।
আল্লাহ তাআলা আপনাকে সঠিক পথে চলার তৌফিক দিন। আপনার বাবার ঋণ ও আপনার ভাইয়ের বিয়ে সহজ করে দিন। (আমিন)