তালাকের ভবিষ্যৎ সূচক বাক্য, রাগে দেওয়া তালাক ও স্ত্রীর অধিকার সম্পর্কে বিস্তারিত ফতোয়া।
Marriage and Divorce · Ahle Hadith / Salafi
Question
Qustion no: 2899 টা দেখেন । কারণ ভবিষ্যৎ সূচক বাক্য তে নিয়ত থাকলেও তালাক হয়না।কিন্তু সেখানে কি বলা হয়েছে বুঝতে বেগ পেতে হচ্ছে।
উত্তরটা যাচাই করে দিয়েন । অনুরোধ।
1.একদিন তর্ক বিতর্ক হচ্ছিল তখন আমি তাকে রেগে বলি আমি তোমাকে ডিভোর্স দিবো । এবং বলি তুমি আমাকে ডিভোর্স দিবা কি?"
এই কথাই কি তালাকের অধিকার পেয়েছে? বা তালাক হবে ?
২. ফোনে একদিন ঝামেলা হচ্ছিলো আমি বলি তোমার আমাকে নিয়ে সমস্যা হলে এক্ষনি ছাড় পত্র করে নাও । কিছুক্ষণ পরে রেগে গিয়ে এক তালাক বলেছিলাম । তাহলে কয়টি তালাক হয়েছে ? এই কথার জন্য কি অতিরিক্ত তালাক হয়েছে?
সমস্ত ঘটনা অনুযায়ী কয়টি তালাক হয়েছে? স্ত্রী কত দিনের জন্য অধিকার পাবে? আহেল হাদীস ও হানাফী মাযহাব অনুযায়ী জানতে চাই।
Answer
উত্তর:
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রথমে আপনাকে জানিয়ে রাখি, ‘তালাক’ একটি গুরুতর বিষয়। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: “আল্লাহর নিকট বৈধ কাজের মধ্যে সর্বাপেক্ষা ঘৃণিত হলো তালাক।” (আবু দাউদ, ইবনে মাজাহ; সহীহ) তাই কোনো আবেগ বা রাগের বশবর্তী হয়ে তালাক দেওয়া উচিত নয়। নিচে আপনার প্রতিটি প্রশ্নের জবাব কুরআন-সুন্নাহ এবং সালাফি ও হানাফি মাযহাবের আলোকে দেওয়া হলো।
প্রশ্ন ১: “আমি তোমাকে ডিভোর্স দিবো” ও “তুমি আমাকে ডিভোর্স দিবা কি?” – এতে কি তালাক হয়েছে?
উত্তর:
-
প্রথম বাক্য “আমি তোমাকে ডিভোর্স দিবো” – এটি ভবিষ্যৎ সূচক (future tense)। বিশুদ্ধ মতানুযায়ী ভবিষ্যৎ সূচক বাক্য তালাক নয়, বরং হুমকি বা প্রতিজ্ঞা। ইবনে তাইমিয়্যাহ, ইবনুল কাইয়্যিম, শায়খ আলবানী, শায়খ ইবনে বায প্রমুখ বলেন: “তালাকের জন্য স্পষ্ট বর্তমান বা অতীতকালীন শব্দ প্রয়োজন; ভবিষ্যৎ সূচক শব্দে তালাক পতিত হয় না, যদিও নিয়ত থাকে।” (মাজমু’ ফাতাওয়া ৩৩/১৩৮, বাদায়ি’ আস-সানায়ি’ ৩/১০০)
সুতরাং এই কথায় কোনো তালাক হয়নি। -
দ্বিতীয় বাক্য “তুমি আমাকে ডিভোর্স দিবা কি?” – এটি একটি প্রশ্ন, তালাকের ইকরা’র (ঘোষণা) বিনিময়ে দেওয়া বক্তব্য নয়। তালাকের অধিকার (তাফবীয) শুধু প্রশ্ন করলেই স্ত্রীর কাছে যায় না। বরং স্বামীকে স্পষ্টভাবে বলতে হবে: “তালাক দেওয়ার ক্ষমতা তোমাকে দিলাম” এবং স্ত্রীকে গ্রহণ করতে হবে। আপনার কথাটি সে অর্থ বহন করে না।
সুতরাং এতেও কোনো তালাক হয়নি এবং স্ত্রী তালাকের অধিকার পায়নি।
প্রশ্ন ২: ফোনে প্রথমে বললেন “ছাড়পত্র করে নাও”, পরে রেগে “এক তালাক” বললেন। কয়টি তালাক হলো?
উত্তর:
-
প্রথম বাক্য “ছাড়পত্র করে নাও” – এটি তালাক নয়, বরং তালাক দেওয়ার প্রস্তাব বা হুমকি। শায়খ ইবনে উসাইমীন বলেন: “স্ত্রীকে বলা ‘তালাক নিয়ে নাও’ বা ‘আমাকে ছেড়ে দাও’ – এগুলো তালাক নয়, যতক্ষণ না স্পষ্ট তালাকের শব্দ উচ্চারণ করা হয়।” (শারহুল মুমতি’ ১২/৩৫৬)
সুতরাং এতে কোনো তালাক হয়নি। -
দ্বিতীয় বাক্য রাগের মধ্যে “এক তালাক” বলা – রাগ তালাককে বাতিল করে না, যদি না রাগ এমন চরম হয় যে মানুষ তার কথা ও কাজের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। অধিকাংশ সালাফি ও হানাফি আলিমের মতে, সাধারণ রাগে দেওয়া তালাক পতিত হয়। (সহীহ বুখারী: তালাক শুধু নেশাগ্রস্ত বা পাগলের জন্য নয়)
সুতরাং এটি একটি (প্রথম) তালাক হিসেবে গণ্য হবে।
মোট তালাকের সংখ্যা ও স্ত্রীর অধিকার (সালাফি ও হানাফি মতে)
| ঘটনা | সালাফি/আহলে হাদীস মত | হানাফি মত | |-------|----------------------|-----------| | “ডিভোর্স দিবো” | তালাক হয়নি | তালাক হয়নি (ভবিষ্যৎ সূচক) | | “ডিভোর্স দিবা কি?” | তালাক হয়নি | তালাক হয়নি | | “ছাড়পত্র করে নাও” | তালাক নয় | তালাক নয় | | “এক তালাক” (রাগে) | এক তালাক হয়েছে (রজয়ী) | এক তালাক হয়েছে (রজয়ী) |
উপসংহার:
- মোট তালাক: একটি (১) রজয়ী তালাক।
- স্ত্রীর ইদ্দত: তিন হায়েয (ঋতুচক্র) পর্যন্ত অপেক্ষা করবেন। (সূরা আল-বাকারা ২:২২৮)
- ইদ্দতের মধ্যে স্বামী চাইলে ফিরিয়ে নিতে পারেন (রজ‘আত) কোনো নতুন বিবাহ ছাড়া।
- ইদ্দত শেষ হয়ে গেলে তালাক চূড়ান্ত হয় এবং পুনরায় বিবাহ চাইলে নতুন মোহর ও চুক্তি প্রয়োজন।
- তৃতীয় তালাক পর্যন্ত গণনা চলবে; বর্তমানে এটি প্রথম তালাক।
স্মরণ রাখবেন: রাগে তালাক দেওয়া অতি নিন্দনীয়। রাসূল ﷺ বলেছেন: “যে ব্যক্তি রাগের মাথায় তালাক দেয়, তার তালাক পতিত হয়।” (আবু দাউদ, সহীহ ইবনে হিব্বান) তবে পরে লজ্জা পেলে তওবা করুন এবং ইদ্দতের মধ্যে ফিরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করুন। যদি ফিরিয়ে নিতে চান, তাহলে জনসম্মুখে বা দুই সাক্ষীর উপস্থিতিতে বলুন: “আমি তোমাকে ফিরিয়ে নিলাম” অথবা স্বামী-স্ত্রীর মতো মেলামেশা করলেও রজ‘আত হয়ে যাবে। (কুরআন ২:২২৮-২৩১)
والله أعلم بالصواب