হানাফী ও আহলে হাদীস ফিকহ অনুযায়ী “ডিভোর্স দিবো”, “ছাড়পত্র করে নাও” ও রাগে “এক তালাক” বলার ফলে কয়টি তালাক হয়েছে?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
1.একদিন তর্ক বিতর্ক হচ্ছিল তখন আমি তাকে রেগে বলি আমি তোমাকে ডিভোর্স দিবো । এবং বলি তুমি আমাকে ডিভোর্স দিবা কি?"
এই কথাই কি তালাকের অধিকার পেয়েছে? বা তালাক হবে ?
২. ফোনে একদিন ঝামেলা হচ্ছিলো আমি বলি তোমার আমাকে নিয়ে সমস্যা হলে এক্ষনি ছাড় পত্র করে নাও । কিছুক্ষণ পরে রেগে গিয়ে এক তালাক বলেছিলাম । তাহলে কয়টি তালাক হয়েছে ? এই কথার জন্য কি অতিরিক্ত তালাক হয়েছে?
সমস্ত ঘটনা অনুযায়ী কয়টি তালাক হয়েছে? স্ত্রী কত দিনের জন্য অধিকার পাবে? আহেল হাদীস ও হানাফী মাযহাব অনুযায়ী জানতে চাই।
Answer
উত্তর (বাংলায়)
প্রশ্ন:
- একদিন তর্কের সময় আমি রেগে বলি, “আমি তোমাকে ডিভোর্স দিবো” এবং “তুমি আমাকে ডিভোর্স দিবা কি?” – এই কথার মাধ্যমে কি তালাক হয়েছে?
- ফোনে ঝামেলার সময় বলি, “তোমার আমাকে নিয়ে সমস্যা হলে এখনই ছাড়পত্র করে নাও” – তারপর কিছুক্ষণ পরে রেগে গিয়ে “এক তালাক” বলি। এতে কয়টি তালাক হয়েছে?
মোট কয়টি তালাক? স্ত্রী কত দিনের জন্য অধিকার পাবে? আহলে হাদীস ও হানাফী মাযহাব অনুযায়ী জানতে চাই।
১ম ঘটনা: “ডিভোর্স দিবো” ও “তুমি আমাকে ডিভোর্স দিবা কি?”
-
হানাফী মাযহাব: ভবিষ্যৎ বাচক শব্দ “দিবো” দ্বারা তালাক হয় না, যতক্ষণ না সেটি তালাকের নিয়তে বলা হয় এবং পরে তা কার্যকর করার ইচ্ছা থাকে। কিন্তু এখানে শুধু রাগের মাথায় ভয় দেখানো হয়েছে, তাই কোনো তালাক হয়নি। আর “তুমি আমাকে ডিভোর্স দিবা?” – এটি স্ত্রীর প্রতি প্রশ্ন, স্বামীর পক্ষ থেকে তালাকের ইক্বার নয়। সুতরাং এই ঘটনায় কোনো তালাক হয়নি।
(রদ্দুল মুহতার, ৩/২৩০; ফাতাওয়া হিন্দিয়্যাহ, ১/৩৫২) -
আহলে হাদীস মত: ভবিষ্যৎ বাচক শব্দ দ্বারা তালাক শুধু তখনই হবে যদি তা স্পষ্ট তালাকের নিয়তে বলা হয় এবং পরবর্তীতে সেই মর্মে ইক্বার থাকে। প্রশ্নকারীর বক্তব্য তালাক গণ্য হবে না। (মাজমুউল ফাতাওয়া, ৩৩/১১১; ফিকহুস সুন্নাহ, ২/২২৮)
২য় ঘটনা: “ছাড়পত্র করে নাও” ও পরে “এক তালাক”
-
প্রথম অংশ “ছাড়পত্র করে নাও”: এটি তালাকের ইক্বার নয়, বরং স্ত্রীকে তালাক নেওয়ার পরামর্শ বা আদেশ। এতে কোনো তালাক হয়নি।
(আল-হিদায়া, ২/৩৫০; ফাতাওয়া উসমানী, ২/৪৩২) -
দ্বিতীয় অংশ “এক তালাক”: রাগের মাথায় স্পষ্টভাবে ‘এক তালাক’ বলা হয়েছে। এক্ষেত্রে এক তালাক পতিত হয়েছে। (ইমদাদুল ফাতাওয়া, ২/৪৫০; রদ্দুল মুহতার, ৩/২৬৫)
-
আহলে হাদীস মত: রাগের তালাক সম্পর্কে ভিন্নমত আছে। তবে অধিকাংশ সালাফি আলেমের মতে, রাগের তালাক যদি অত্যন্ত প্রচণ্ড হয় (যাতে বুদ্ধি লোপ পায়), তাহলে তা কার্যকর হবে না। কিন্তু স্বাভাবিক রাগের ক্ষেত্রে তালাক কার্যকর হয়। এখানে স্বাভাবিক রাগ মনে হচ্ছে, তাই এক তালাক গণ্য হবে। (ইবনে তাইমিয়্যার ফতোয়া, ৩২/২৬৫; ফিকহুস সুন্নাহ, ২/২৩০)
মোট তালাকের সংখ্যা
- ১ম ঘটনা: ০ (শূন্য)
- ২য় ঘটনা: ১ (একটি)
মোট = এক তালাক (তালাকে রজ‘ঈ) – এটি প্রথম বা দ্বিতীয় তালাকের মতো পুনরায় গ্রহণযোগ্য।
স্ত্রীর অধিকার ও সময়সীমা
-
ইদ্দত: ৩ হায়েজ (মাসিক) অতিক্রম করতে হবে। যদি হায়েজ না হয় (যেমন: ঋতুবতী নন বা গর্ভবতী নন), তাহলে ৩ মাস। গর্ভবতী হলে সন্তান প্রসব পর্যন্ত।
(সূরা বাকারা: ২২৮, আত-তালাক: ৪) -
ইদ্দতকালীন ভরণপোষণ: স্বামীকে স্ত্রীর খোরপোশ (ভাড়াবাড়ি, খাবার, পোশাক ইত্যাদি) দিতে হবে।
(সূরা আত-তালাক: ৬; রদ্দুল মুহতার, ৩/৫৩২) -
রজ‘আত (পুনরায় গ্রহণ): ইদ্দতের মধ্যে স্বামী চাইলে মৌখিক ভাবে বা দৈহিক মিলনের মাধ্যমে স্ত্রীকে ফিরিয়ে নিতে পারে – এতে নতুন বিয়ে বা মোহরের প্রয়োজন নেই।
(সূরা বাকারা: ২২৮; আল-হিদায়া, ২/৩৬০) -
ইদ্দত শেষে: বিয়ে সম্পূর্ণ ভেঙে যাবে। স্ত্রী অন্যত্র বিয়ে করতে পারবে। পূর্বের সম্পর্ক পুনরায় স্থাপন করতে চাইলে নতুন করে বিয়ে ও মোহর দিতে হবে (স্ত্রীর সম্মতি সাপেক্ষে)।
-
মোহর: যদি মোহর (দেনমোহর) পুরো না দেওয়া থাকে, তাহলে ইদ্দত শেষের আগে তা পুরো আদায় করতে হবে। কারণ তালাকের পর পুরো মোহর ওয়াজিব হয়।
(সূরা বাকারা: ২২৯; ফাতাওয়া হিন্দিয়্যাহ, ১/৪০৫)
সংক্ষিপ্ত সারসংক্ষেপ
| ঘটনা | বক্তব্য | তালাক হয়েছে? | সংখ্যা | |-------|---------|--------------|--------| | ১ম | “ডিভোর্স দিবো” + প্রশ্ন | না | ০ | | ২য় | “ছাড়পত্র করে নাও” | না | ০ | | ২য় | “এক তালাক” (রাগে) | হ্যাঁ | ১ | | মোট | | | ১ তালাক (রজ‘ঈ) |
- স্ত্রী ৩ হায়েজ (বা ৩ মাস) ইদ্দত পালন করবে।
- এই সময়ে স্বামী তাকে ফিরিয়ে নিতে পারবে (ইদ্দতের ভেতর)।
- ইদ্দত শেষে বিয়ে সম্পূর্ণ ভেঙে যাবে।
- ইদ্দতকালীন খোরপোশ ও অপরিশোধিত মোহর স্বামীকে দিতে হবে।
হানাফী মাযহাবের মূল কিতাবের রেফারেন্স
- রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবেদীন): ৩/২৩০, ৩/২৬৫, ৩/৫৩২
- ফাতাওয়া হিন্দিয়্যাহ (আলমগীরী): ১/৩৫২, ১/৪০৫
- আল-হিদায়া (মারগীনানী): ২/৩৫০, ২/৩৬০
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (আশরাফ আলী থানবী): ২/৪৫০
- ফাতাওয়া উসমানী (মুফতি তাকী উসমানী): ২/৪৩২