বিয়ের জন্য বাবা-মাকে রাজি করাতে আমল বা তাবিজ করলে তাদের কোনো ক্ষতি হবে কি?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
সবাই বলে ইনকাম জব করো তাহলে হয়ে যাবে বাট ফ্যামিলির সামথ্য আছে
আর আমাদের বাসায় আম্মার কোনো মতামতের গুরুত্ব নেই। আব্বা যা বলেন, সেটাই হয়।
এখন আমি যদি কোনো হুজুরের কাছে গিয়ে এমন কোনো তদবির, আমল বা তাবিজ করাই, যাতে আব্বা-আম্মা রাজি হয়ে যান—তাহলে ভবিষ্যতে কি কোনো সমস্যা হবে? অর্থাৎ, আমার বাবা-মায়ের কোনো ক্ষতি বা অকল্যাণ হবে কি?
তাই জানতে চাই, যদি কোনো হুজুরের মাধ্যমে তাবিজ বা আমল এমন কিছু করা হয় যাতে তারা রাজি হয়ে যান, তাহলে ভবিষ্যতে আমার বাবা-মায়ের কোনো ক্ষতি বা সমস্যা হওয়ার আশঙ্কা আছে কি?
Answer
উত্তর:
প্রথমত, আপনার পিতার অমতে বিবাহ করার জন্য তাবিজ, আমল বা তদবির করা জায়েজ কি না, তা স্পষ্ট হওয়া জরুরি। ইসলামী শরিয়তে বৈধ তাবিজ ও আমল বলতে কুরআন-সুন্নাহ সম্মত দুআ ও আয়াত ব্যবহার করাকে বোঝায়, যা আল্লাহর উপর ভরসা রেখে করা হয়। তবে এর মাধ্যমে কারো ইচ্ছাকে জোর করে পরিবর্তন করা বা ক্ষতি সাধন করা উদ্দেশ্য না থাকলে পিতামাতার কোনো ক্ষতি হবে না, ইনশাআল্লাহ।
তবে এ ব্যাপারে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক বিবেচনা করা প্রয়োজন:
১. পিতার অনুমতি ও শরিয়তের বিধান
ইসলামে বিবাহের জন্য পিতার অনুমতি শর্ত নয়, বিশেষ করে পুত্রের ক্ষেত্রে। তবে পিতার অস্বীকৃতি যদি কোনো শরিয়তসম্মত কারণ ছাড়াই হয়, তাহলে আপনি অন্যান্য পরিবারের সদস্য বা সমাজের বয়োজ্যেষ্ঠদের মাধ্যমে পিতাকে বোঝানোর চেষ্টা করতে পারেন। পিতার কথা চূড়ান্ত বলে মনে করা আপনার পরিবারের একটি সামাজিক রীতি, যা ইসলামী শিক্ষার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। ইসলামে স্ত্রী ও সন্তানদের মতামতেরও গুরুত্ব রয়েছে।
আল-হিদায়া ও ফাতাওয়া আলমগিরি-তে এসেছে, বিবাহের জন্য অভিভাবকের অনুমতি আবশ্যক, কিন্তু অভিভাবক যদি অন্যায়ভাবে বাধা দেন, তবে বিবাহকারী নিজেই বিবাহ সম্পাদন করতে পারেন (যদি কনে শরিয়তের হিফাজতে থাকে)। তবে হানাফি মতে, পিতার অনুমতি ছাড়া পুত্রের বিবাহ সহীহ হলেও মেয়ের বিবাহের জন্য পিতার অনুমতি অধিক গুরুত্বপূর্ণ। (রদ্দুল মুহতার, ৩/৫৫)
২. তাবিজ ও আমলের বৈধতা
হানাফি ফিকহ অনুযায়ী, কুরআনের আয়াত বা আল্লাহর নাম সম্বলিত তাবিজ ও আমল জায়েজ, যদি তাতে শিরক বা কুফরি না থাকে এবং ব্যবহারকারীর বিশ্বাস থাকে যে, প্রকৃত কার্যকরী শুধু আল্লাহ। ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, তাবিজ জায়েজ তবে তা পড়ার সময় মনোযোগ ও নিয়্যতের বিশুদ্ধতা জরুরি। (শরহু মা'আনিল আছার, ৪/২৫৪)
৩. পিতামাতার ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা
আপনি যদি কোনো জায়েজ তাবিজ বা আমল করেন – যেমন সূরা ইয়াসিন পড়া, দান করা, দুআ করা ইত্যাদি – তাহলে তাতে পিতামাতার কোনো ক্ষতি হবে না। বরং এটি আল্লাহর কাছে প্রার্থনা, যা পিতার মন পরিবর্তনের মাধ্যম হতে পারে। কিন্তু যদি কেউ জাদু-টোনা, অশুভ তাবিজ বা শিরকী আমল করে, তাহলে তা হারাম এবং নিজের ও অন্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। ফাতাওয়া উসমানি ও ইমদাদুল ফাতাওয়াতে এসেছে, হারাম তাবিজ ব্যবহার করলে নিজের ঈমানের ক্ষতি হয় এবং আল্লাহর গজব নেমে আসতে পারে। (ইমদাদুল ফাতাওয়া, ৪/২৯২)
৪. বাস্তব সমাধান
- পিতার সাথে সরাসরি বা পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠদের মাধ্যমে বসে আলোচনা করুন। তার অস্বীকৃতির প্রকৃত কারণ বোঝার চেষ্টা করুন।
- প্রয়োজনে স্থানীয় আলেম বা মসজিদের ইমামের মাধ্যমে পিতাকে ইসলামী বিধান সম্পর্কে বোঝান।
- বেশি বেশি দুআ করুন, বিশেষ করে তাহাজ্জুদ নামাজে পিতার হিদায়াত ও বিবাহের সুবিধার্থে প্রার্থনা করুন।
- তাবিজ বা আমলের পরিবর্তে সন্তানের পক্ষ থেকে পিতার সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য সৎ আচরণ ও দোয়াকে প্রাধান্য দিন।
সারসংক্ষেপ
জায়েজ তাবিজ বা আমল করলে আপনার পিতামাতার কোনো ক্ষতি হবে না, বরং এটি আল্লাহর নিকট প্রার্থনা। তবে অবৈধ কোনো পদ্ধতি গ্রহণ করলে নিজের ও পরিবারের অকল্যাণ হতে পারে। তাই সুন্নাহ সম্মত দোয়া ও শুভ বুদ্ধির মাধ্যমেই পিতাকে রাজি করানোই উত্তম। আল্লাহ তাআলা আপনার বিবাহের কাজ সহজ করুন।
রেফারেন্স:
- ফাতাওয়া উসমানি (১/২৮২)
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (৪/২৯২)
- রদ্দুল মুহতার (৩/৫৫)
- বেহেশতি জেওর (বিবাহ অধ্যায়)
- মাআরিফুল কুরআন (সূরা বাকারা: ২৩২)
- আল-হিদায়া (বাবুন নিকাহ)