আমি এখন কি করব?
Halal and Haram · Ahle Hadith / Salafi
Question
Answer
উত্তর:
প্রশ্নটির সারমর্ম হলো: আপনার স্বামী আপনার মতামতের বিপরীতে গিয়ে ব্যাংক থেকে সুদী ঋণ (Riba-based loan) নিয়ে আপনার শ্বশুরকে জমি কেনার জন্য দিয়েছেন, এবং আপনাকে সেই ঋণের গ্যারান্টার (Guarantor) বানিয়েছেন। এখন আপনি কী করবেন?
ইসলামের দৃষ্টিতে এখানে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মাসয়ালা জড়িত:
১. সুদ (রিবা) সম্পূর্ণ হারাম
কুরআন ও হাদীসে সুদের ব্যাপারে কঠোর নিষেধাজ্ঞা এসেছে। আল্লাহ বলেন:
"যারা সুদ খায়, তারা কিয়ামতের দিন দাঁড়াবে না, যেভাবে দাঁড়ায় সেই ব্যক্তি যাকে শয়তান স্পর্শ করে পাগল করে দেয়।" (সূরা আল-বাকারা: ২৭৫)
এবং আরো বলেন:
"আর তোমরা যদি তওবা করো, তবে তোমাদের মূলধন নেওয়ার অধিকার আছে। তোমরা অত্যাচার করবে না এবং অত্যাচারিতও হবে না।" (সূরা আল-বাকারা: ২৭৯)
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"সুদ খোর, সুদ দাতা, তার লেখক ও তার সাক্ষী – সকলেই লানতপ্রাপ্ত। " (সহীহ মুসলিম: ১৫৯৮)
সুতরাং কোনো বৈধ প্রয়োজনেই হোক না কেন, সুদভিত্তিক ব্যাংক লোন নেওয়া, দেওয়া, সাক্ষী থাকা বা লিখন – সবই হারাম।
২. গ্যারান্টার হওয়া সুদী লেনদেনের অংশ
যে ব্যক্তি সুদী ঋণের গ্যারান্টার (জামিন) হয়, সে মূলত সেই লেনদেনকে সম্পন্ন করতে সাহায্য করে। শরীআতে জানা কথা: যে কোনো হারাম কাজে সহায়তা করাও হারাম। আল্লাহ বলেন:
"সৎকর্ম ও তাকওয়ায় একে অপরকে সাহায্য করো, আর পাপ ও সীমালঙ্ঘনে একে অপরকে সাহায্য করো না।" (সূরা আল-মায়িদা: ২)
শায়খুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ (রহ.) বলেন:
"সুদী ঋণের গ্যারান্টার হওয়া জায়েয নয়, কারণ এতে সুদের লেনদেনকে শক্তিশালী করা হয়।" (মাজমু’আল ফাতাওয়া: ২৯/৪৪৮)
শায়খ ইবন উসাইমীন (রহ.) বলেছেন:
"যদি কেউ সুদী ঋণের জামিন হয়, তবে সে সুদের সহযোগী হিসেবে গণ্য হবে। তার জন্য ওয়াজিব হলো তওবা করা এবং সেই দায়িত্ব থেকে নিজেকে মুক্ত করার চেষ্টা করা।" (আশ-শারহুল মুমতি’: ৯/৩৪১)
৩. স্ত্রীর মতামতের বিপরীতে গ্যারান্টার করা
ইসলামে স্বামী-স্ত্রী একে অপরের পরামর্শ ও সম্মতি নিয়ে কাজ করবে। স্বামীর জন্য উচিত নয় জোর করে স্ত্রীকে এমন একটি কাজে জড়ানো যা তার ধর্মীয় বিশ্বাসের পরিপন্থী। যদি আপনি ইতিমধ্যেই গ্যারান্টার হয়েছেন, তাহলে আপনি জোরপূর্বক হলেও সেই দায়িত্ব থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করুন।
শায়খ সালেহ আল-ফাওযান (হাফি.) বলেন:
"কাউকে সুদী লেনদেনে জামিন হতে বাধ্য করা যাবে না। বাধ্য করা হলে সেই জামিন বৈধ নয়।" (আল-মুনতাকা মিন ফাতাওয়া আল-ফাওযান: ১০/১৩)
৪. এখন আপনার করণীয়:
ক. তওবা ও ইস্তিগফার
আপনার স্বামী ও শ্বশুরকে নরমভাবে বোঝান যে এটি আল্লাহর নিষিদ্ধ কাজ। নিজেও তওবা করুন, যদিও আপনি বাধ্য হয়েছেন, কিন্তু গ্যারান্টার হওয়ার সময় আপনি হয়তো প্রতিবাদ করতে পারেননি। এখন অন্তর দিয়ে অসন্তুষ্ট থাকুন এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা চান।
খ. গ্যারান্টারি থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করুন
- ব্যাংক বা ঋণদাতাকে জানান যে আপনি এই গ্যারান্টারি থেকে সরে আসতে চান। অনেক ক্ষেত্রে আইনতও সম্ভব, যদি ঋণের চুক্তি এখনও চূড়ান্ত না হয়।
- আপনার স্বামীকে বলুন অন্য কোনো বৈধ উপায়ে জমি কেনার ব্যবস্থা করতে, যেমন সুদমুক্ত ইসলামী ব্যাংক অথবা পরিবারের সদস্যদের থেকে ঋণ।
গ. হারাম কাজে অংশগ্রহণ না করা
যতদিন আপনি গ্যারান্টার থাকবেন, ততদিন আপনি এই ঋণের সাথে সম্পৃক্ত থাকবেন। তাই দ্রুত বের হওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যান। যদি আপনি কোনো স্বাক্ষরাদি দিয়ে থাকেন, তাহলে আল্লাহর কাছে তওবা করুন এবং ভবিষ্যতে আর কখনো সুদী লেনদেনে জড়াবেন না।
ঘ. ধৈর্য ও দোয়া
স্বামী ও শ্বশুরের বিরুদ্ধে কঠোর না হয়ে কুরআন-হাদীসের দলিল দিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করুন। যদি তারা না শোনে, তবে আপনি নিজের দায়িত্ব থেকে মুক্ত থাকার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করুন এবং আল্লাহর কাছে দোয়া করুন।
৫. বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ফতোয়া
শায়খ আব্দুল আজিজ ইবন বায (রহ.) কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল: "এক ব্যক্তি তার স্ত্রীকে সুদী ঋণের গ্যারান্টার বানিয়েছে, স্ত্রী কী করবে?" উত্তরে তিনি বলেন:
"স্ত্রীকে এই গ্যারান্টারি থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করতে হবে। যদি সে চুক্তি না করে বা সাক্ষী না হয়, তবে তার উপর কোনো গুনাহ নেই। কিন্তু যদি সে জেনেশুনে স্বাক্ষর করে, তবে তাকে তওবা করতে হবে এবং ভবিষ্যতে এরূপ কাজ থেকে বিরত থাকতে হবে।" (মাজমু’ ফাতাওয়া ইবন বায: ১৯/২৪৮)
উপসংহার
সংক্ষেপে: আপনার স্বামী ও শ্বশুরের কাজ সুদভিত্তিক হওয়ায় হারাম। আপনাকে জোর করে গ্যারান্টার বানানোও জায়েয নয়। আপনার কর্তব্য হলো:
- তওবা করা ও আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া।
- ব্যাংককে জানিয়ে গ্যারান্টারি থেকে সরে আসার চেষ্টা করা।
- স্বামীকে নরমভাবে বোঝানো যে সুদ হারাম, এবং তিনি যেন বৈধ উপায়ে জমি কেনেন।
- ভবিষ্যতে আর কখনো সুদী লেনদেনে জড়াবেন না, এমনকি গ্যারান্টার হিসেবেও না।
আল্লাহ আপনার তওবা কবুল করুন এবং আপনাকে সঠিক পথ দেখান। আমীন।