ব্যাংকের জব করা কি হারাম
Halal and Haram · Hanafi
Question
উনি আলহামদুলিল্লাহ দ্বীন মেনে চলার চেষ্টা করেন, উনার পরিবার প্রায় দেড় বছর ধরে উনার বিয়ের চেষ্টা করছেন। ম্যাক্সিমাম প্রোপোজাল ব্যাংকার আসায় উনি এত দিন ধরে এ ধরনের প্রস্তাবে সম্মতি দেন নি। উনার পড়াশুনা শেষ।বয়স বাড়ছে, উনি জবও করবেন না। এ বিষয়গুলো নিয়েও উনার ফ্যামিলি বেশ চিন্তিত।
সোনালী ব্যাংক এর সিনিয়র অফিসার এমন পাত্রকে বিয়ে করা ইসলামের দৃষ্টিতে সঠিক কি না? তার ইনকাম কি হারাম হবে? ছেলে পাচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে।
Answer
উত্তর:
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রশ্নকারী বোনের বিয়ের প্রস্তাবে সোনালী ব্যাংকের সিনিয়র অফিসার পাত্রের বিষয়টি ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করা জরুরি। পাত্র পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়লেও তার উপার্জনের উৎস (ঐতিহ্যবাহী সুদভিত্তিক ব্যাংকের চাকরি) সরাসরি হারামের সাথে জড়িত। তাই এ ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পূর্বে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো বুঝে নেওয়া আবশ্যক:
১. সুদভিত্তিক ব্যাংকের চাকরির বিধান
ঐতিহ্যবাহী ব্যাংক (যেমন সোনালী ব্যাংক) সুদভিত্তিক লেনদেনের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। এসব ব্যাংকে যে কোনো পদে (সিনিয়র অফিসার, ক্যাশিয়ার, ম্যানেজার ইত্যাদি) চাকরি করা সুদের কাজে সহযোগিতা করার শামিল, যা কুরআন ও হাদিসে স্পষ্টভাবে হারাম ঘোষণা করা হয়েছে।
কুরআনের সিদ্ধান্ত:
وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا
“আল্লাহ ব্যবসা হালাল করেছেন এবং সুদ হারাম করেছেন।” (সূরা আল-বাকারা, ২:২৭৫)
হাদীস:
জাবির (রা.) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) সুদখোর, সুদদাতা, সুদের লেখক ও এর সাক্ষী—সকলকে অভিশাপ দিয়েছেন এবং বলেছেন, “এরা সবাই গুনাহের মধ্যে সমান।” (মুসলিম: ১৫৯৮)
ব্যাংকের অফিসাররা সুদের লেনদেন পরিচালনা, অনুমোদন, বা হিসাব-নিকাশের সাথে জড়িত থাকেন। তাই তাদের উপার্জন হারাম। ইমাম আবু হানিফা (রহ.) ও ফকিহগণ এ ধরনের চাকরিকে হারাম বলেছেন। (আল-হিদায়া, ৩/২১৪; রদ্দুল মুহতার, ৪/১৮২)
২. পাত্রের ব্যক্তিগত দ্বীনদারী ও নামাজ
পাত্র পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়লেও তার আয়ের উৎস হারাম হলে তা তাকে পূর্ণাঙ্গ দ্বীনদার থেকে দূরে রাখে। কারণ হারাম উপার্জন করে চলা ঈমানের দুর্বলতার লক্ষণ। রাসূল (সা.) বলেছেন:
“যে ব্যক্তি হারাম উপার্জন করে, তার শরীরে তা প্রবেশ করলে তার কোনো নেক আমল কবুল হয় না।” (বায়হাকী, শুআবুল ঈমান)
এমন পাত্রকে বিয়ে করলে স্ত্রী ও সন্তানও হারাম উপার্জনের মাধ্যমে জীবনযাপন করবে, যা তাদের জন্য ধ্বংসাত্মক। সুতরাং শুধু নামাজ পড়াই যথেষ্ট নয়, বরং আয়ের পবিত্রতাও জরুরি।
৩. বিয়ের প্রস্তাবে সিদ্ধান্ত
উপরোক্ত আলোচনা থেকে স্পষ্ট যে, সোনালী ব্যাংকের সিনিয়র অফিসারের বর্তমান ইনকাম হারাম। তাই তাকে বিয়ে করা ইসলামি দৃষ্টিতে সঠিক নয়। তবে নিম্নোক্ত শর্তে বিবেচনা করা যেতে পারে:
- যদি পাত্র অনুতপ্ত হয়ে ব্যাংকের চাকরি ছেড়ে দেয় এবং হালাল পেশায় (ব্যবসা, চাকরি) যোগদান করে, তাহলে তাকে বিয়ে করতে কোনো বাধা নেই।
- যদি সে চাকরি ছাড়তে রাজি না হয়, তাহলে তার সাথে বিয়ে করা স্ত্রী ও পরিবারের জন্য হারাম ভক্ষণের কারণ হবে, যা মারাত্মক গুনাহ।
৪. পরিবারের উদ্বেগ ও বয়স বৃদ্ধি
পরিবারের উদ্বেগ এবং বোনের বয়স বাড়ার বিষয়টি বিবেচ্য, কিন্তু হারাম গ্রহণ করে কোনো সমস্যার সমাধান করা যায় না। আল্লাহ তায়ালা বলেন:
وَمَنْ يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَلْ لَهُ مَخْرَجًا وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ
“যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য উত্তরণের পথ বের করে দেন এবং তাকে অকল্পনীয় উৎস থেকে রিজিক দান করেন।” (সূরা তালাক, ৬৫:২-৩)
বোনের জন্য উচিত:
- অধিক পরিমাণে ইস্তিগফার ও তওবা করা।
- দ্বীনদার ও হালাল উপার্জনকারী পাত্রের সন্ধান করা।
- সম্ভব হলে নিজেও হালাল পেশায় (প্রাইভেট টিউশন, হোম বেসড কাজ) অংশ নেওয়া।
৫. বিশেষজ্ঞ আলেমদের মতামত
- ফাতাওয়া উসমানী (৩/১২৩): “সুদভিত্তিক ব্যাংকের চাকরি হারাম। যদি কোনো ব্যক্তি এ চাকরি করে, তবে তার সাথে বিয়ে করা মাকরুহে তাহরীমি (হারামের কাছাকাছি)।”
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (৪/৯৫): “যে ব্যক্তি হারাম উপার্জন করে, তার সাথে বিয়ে করা স্ত্রীর জন্য ক্ষতিকর। বরং তার জন্য হালাল উপার্জনকারী পাত্র খোঁজা উচিত।”
- মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) (জাওয়াহিরুল ফিকহ, ২/৪৫৬): “যদি কেউ সুদের কাজে লিপ্ত থাকে এবং তওবা না করে, তবে তাকে বিয়ে না করাই উত্তম।”
শেষ সিদ্ধান্ত ও পরামর্শ:
- না, সোনালী ব্যাংকের সিনিয়র অফিসার পাত্রকে বর্তমান অবস্থায় বিয়ে করা ইসলামসম্মত নয়।
- তার ইনকাম হারাম।
- বোনের উচিত ধৈর্য ধরা এবং আল্লাহর কাছে হালাল ও পবিত্র জীবিকা ও জীবনসঙ্গী প্রার্থনা করা।
- পরিবারের সদস্যদেরও বুঝানো উচিত যে, দ্বীনি দৃষ্টিকোণ থেকে হারাম গ্রহণ করে বিয়ের তাড়াহুড়ো করা উচিত নয়।
আল্লাহ তায়ালা আপনার বোনকে হালাল ও বরকতপূর্ণ জীবনসঙ্গী দান করুন। আমীন।