ফজরের নামাজের পর সুন্নাহ সম্পর্কে
Sunnah and Bid'ah · Hanafi
Question
প্রশ্ন ঃ
।ফজরের ফরজ নামাযের পর জায়নামাযে বসে থাকা,যিকির আযকার করা সূর্যাদয় পর্যন্ত,এরপর ইশরাক পড়া,এইটা সুন্নাহ এমন না?নাকি ফরজ নামাযের পর সূর্যাদয় পর্যন্ত শুয়ে থাকাই সুন্নাহ?
আমি পড়েছিলাম,ফজরের সময় না ঘুমানো এতে অনেক ফজিলত আছে।
ফজরের পর কি কি করা সুন্নাহ?
Answer
ফজরের পর সুন্নাহ আমল: শুয়ে থাকা নাকি বসে যিকির করা?
আপনার প্রশ্নের সারসংক্ষেপ
আপনি জানতে চেয়েছেন: ১. ফজরের ফরজ নামাজের পর জায়নামাজে বসে যিকির-আযকার করা এবং তারপর ইশরাক পড়া কি সুন্নাহ, নাকি শুধু ডান কাতে শুয়ে থাকাই সুন্নাহ? ২. ফজরের সময় না ঘুমানোর ফজিলত সম্পর্কে কী বলেছেন? ৩. ফজরের পর কী কী করা সুন্নাহ?
উত্তর: উভয় আমলই সুন্নাহ, তবে ভিন্ন প্রসঙ্গে
ইসলামি শরিয়তে ফজরের পর দুটি পৃথক সুন্নাহ আমল প্রমাণিত:
প্রথম: ফজরের সুন্নাত ও ফরজের মধ্যবর্তী সময়ে শুয়ে থাকা
হাদিসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ ﷺ ফজরের সুন্নাত (দুই রাকাত) পড়ার পর ডান কাতে কিছুক্ষণ শুয়ে থাকতেন। তারপর ফরজ নামাজের জন্য উঠতেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১১৫৮; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৭৩৬)
এটি একটি মুস্তাহাব আমল (সুন্নাহ), ওয়াজিব নয়। তবে এটি ফরজ নামাজের আগে করার জন্য সুন্নাহ। ফরজের পরও শুয়ে থাকার কথা কিছু বর্ণনায় এসেছে (আবু দাউদ, হাদিস: ১৩১৪) কিন্তু সেটি বেশি প্রসিদ্ধ নয়।
দ্বিতীয়: ফজরের ফরজের পর বসে যিকির করা ও ইশরাক পড়া
ফজরের ফরজ নামাজ শেষে রাসূলুল্লাহ ﷺ প্রায়শই তাঁর জায়নামাজেই সূর্যোদয় পর্যন্ত বসে যিকির, তাসবিহ, ইস্তিগফার করতে থাকতেন। তারপর ইশরাক (চাশতের দুই রাকাত) পড়তেন।
হাদিসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ ﷺ ফজরের নামাজের পর সূর্যোদয় পর্যন্ত বসে থাকতেন। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৬৭০)
এটিও একটি সুন্নাহ এবং অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ আমল।
তাহলে কোনটি করবেন?
- আপনি চাইলে ফজরের সুন্নাতের পর ডান কাতে কিছুক্ষণ (৫-১০ মিনিট) শুয়ে থাকতে পারেন, তারপর ফরজ পড়তে পারেন। এটি একটি স্বতন্ত্র সুন্নাহ।
- ফরজ পড়ার পর জায়নামাজে বসে যিকির-আযকার করা এবং সূর্যোদয়ের পর দুই রাকাত ইশরাক পড়া আরেকটি সুন্নাহ এবং অধিক ফজিলতপূর্ণ।
উভয় আমলই উত্তম। আপনি একসাথেও করতে পারেন: সুন্নাতের পর শুয়ে থাকুন, তারপর ফরজ পড়ুন, ফরজের পর বসে যিকির করুন ও ইশরাক পড়ুন। অথবা যেকোনো একটি বেছে নিতে পারেন।
ফজরের সময় না ঘুমানোর ফজিলত
ফজরের পর ঘুমানো (বিশেষ করে সূর্যোদয়ের আগে-পরে) মাকরুহ (অপছন্দনীয়) বলে হানাফি ফিকহে গণ্য হয়েছে। কারণ এটি বরকতময় সময়, যাতে ফেরেশতারা নামাজে উপস্থিত থাকেন এবং দোয়া কবুল হয়। এ সময় জাগ্রত থেকে ইবাদত করলে অনেক সওয়াব।
হাদিসে এসেছে: "যে ব্যক্তি ফজরের নামাজ জামাতের সাথে আদায় করে, তারপর সূর্যোদয় পর্যন্ত বসে আল্লাহর যিকির করে, তারপর দুই রাকাত (ইশরাক) পড়ে, সে একটি পূর্ণ হজ ও ওমরার সওয়াব পায়।" (তিরমিজি, হাদিস: ৫৮৬)
ফজরের পর করণীয় সুন্নাহসমূহ (সংক্ষেপে)
- ফজরের সুন্নাত (২ রাকাত) পড়া
- সুন্নাতের পর ডান কাতে শুয়ে থাকা (মুস্তাহাব)
- ফরজ নামাজ পড়া
- ফরজের পর সূর্যোদয় পর্যন্ত বসে যিকির, তাসবিহ, ইস্তিগফার, কুরআন তিলাওয়াত করা
- সূর্যোদয়ের ১৫-২০ মিনিট পর দুই রাকাত ইশরাক (চাশত) পড়া
- নিজের জায়গা থেকে না সরে বসে থাকা উত্তম, তবে প্রয়োজনে উঠা যাবে
- ঘুমানো থেকে বিরত থাকা
উল্লেখযোগ্য ফিকহি গ্রন্থের রেফারেন্স
- রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন): ফজরের সুন্নাতের পর শোয়া মুস্তাহাব, ফরজের পর বসে যিকির করাও মুস্তাহাব। (১/৩৮২)
- ফতোয়া হিন্দিয়া: ফজরের পর সূর্যোদয় পর্যন্ত যিকির ও কুরআন তিলাওয়াত করা মুস্তাহাব। (১/৫৮)
- বেহেশতি জেওর (মাওলানা আশরাফ আলী থানভী): ফজরের পর শোয়া ও বসে যিকির—উভয়ই সুন্নাহ। (নামাজ অধ্যায়)
- ইমদাদুল ফতোয়া: ইশরাকের নামাজ ফজরের পর বসে যিকির করার ফজিলত বর্ণিত। (২/১৩০)
আপনার প্রশ্নের সরাসরি উত্তর
ফজরের ফরজের পর জায়নামাজে বসে যিকির করে ইশরাক পড়া সুন্নাহ। শুধু শুয়ে থাকাটাই সুন্নাহ নয়, বরং বসে যিকির করাও সুন্নাহ। তবে শুয়ে থাকার সুন্নাহ ফরজের আগে (সুন্নাতের পর) বেশি প্রযোজ্য। ফজরের সময় না ঘুমানোর ফজিলত অপরিসীম।
আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে সুন্নাহ অনুযায়ী আমল করার তাওফিক দিন।