২০ বছর বয়সী মেয়ের জন্য ১০ম শ্রেণির ছেলে ও মেয়েকে টিউশনি পড়ানো জায়েজ কি না?
Business and Job · Hanafi
Question
Answer
জায়েজ-নাজায়েজ: ছেলে/মেয়ে উভয়কে টিউশনি পড়ানো
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ
আপনি (২০ বছর বয়সী মেয়ে) একজন ১০ম শ্রেণির ছেলে ও একজন মেয়েকে টিউশনি পড়ানোর প্রস্তাব পেয়েছেন। আপনি প্রথমে না করলেও তারা বিপদের কথা বলে পড়াতে বলছে। আপনি জানতে চান যে, পূর্ণ পর্দা (বোরকা, নিকাব, হাত মোজা, পা মোজা) সহকারে এবং পিতা-মাতার উপস্থিতিতে পড়ালে তা জায়েজ হবে কিনা।
ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে বিস্তারিত বিশ্লেষণ
১. নারী-পুরুষের মধ্যে পর্দার বিধান
কুরআনের নির্দেশনা: আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَقُل لِّلْمُؤْمِنَاتِ يَغْضُضْنَ مِنْ أَبْصَارِهِنَّ وَيَحْفَظْنَ فُرُوجَهُنَّ وَلَا يُبْدِينَ زِينَتَهُنَّ إِلَّا مَا ظَهَرَ مِنْهَا "আর মুমিন নারীদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হিফাযত করে। আর তারা যেন তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে, যা সাধারণত প্রকাশ পায় তা ছাড়া।" (সূরা আন-নূর: ৩১)
অন্য আয়াতে বলা হয়েছে:
يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ قُل لِّأَزْوَاجِكَ وَبَنَاتِكَ وَنِسَاءِ الْمُؤْمِنِينَ يُدْنِينَ عَلَيْهِنَّ مِن جَلَابِيبِهِنَّ "হে নবী! আপনি আপনার স্ত্রীদের, আপনার কন্যাদের ও মুমিনদের নারীদের বলুন, তারা যেন তাদের চাদরের কিছু অংশ নিজেদের উপর টেনে নেয়।" (সূরা আল-আহযাব: ৫৯)
হাদিসের নির্দেশনা: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
«إِيَّاكُمْ وَالدُّخُولَ عَلَى النِّسَاءِ» فَقَالَ رَجُلٌ مِنَ الْأَنْصَارِ: يَا رَسُولَ اللَّهِ، أَفَرَأَيْتَ الْحَمْوَ؟ قَالَ: «الْحَمْوُ الْمَوْتُ» "তোমরা নারীদের কাছে যাওয়া থেকে বিরত থাকো।" এক আনসারী সাহাবী জিজ্ঞেস করলেন, "হে আল্লাহর রাসূল! দেবর (স্বামীর ভাই) সম্পর্কে আপনার মত কী?" তিনি বললেন: "দেবর তো মৃত্যুর সমান।" (সহীহ বুখারী, হাদীস: ৫২৩২)
২. বালেগ ছেলেকে পড়ানোর বিধান
হানাফি ফিকহের দৃষ্টিভঙ্গি:
ক) ইমাম আবু হানিফা (রহ) ও অন্যান্য ইমামগণের মতামত:
১. ইমদাদুল ফাতাওয়া (২/২১৫) গ্রন্থে উল্লেখ আছে:
"অপরিচিত নারীর জন্য অপরিচিত পুরুষের সাথে একান্তে কথা বলা, শিক্ষাদান করা বা শিক্ষাগ্রহণ করা জায়েজ নয়, যদি ফিতনার আশঙ্কা থাকে।"
২. রদ্দুল মুহতার (১/৪০৭)-এ ইবনে আবেদীন (রহ) বলেন:
"একজন নারীর জন্য অপরিচিত পুরুষের সামনে বের হওয়া এবং তার সাথে কথাবার্তা বলা জায়েজ নয়, যদি না শরিয়ত অনুমোদিত কোনো প্রয়োজন থাকে।"
৩. ফাতাওয়া শামী (৬/৩৭১) গ্রন্থে উল্লেখ আছে:
"নারীদের জন্য পুরুষদের শিক্ষাদান জায়েজ নয়, যদি ফিতনার আশঙ্কা থাকে। তবে প্রয়োজনে এবং নিরাপদ পরিবেশে অনুমতি রয়েছে।"
খ) প্রয়োজনীয়তার শর্ত:
হানাফি ফিকহে যখন কোনো কাজ জায়েজ হবে কিনা তা নির্ধারণে কয়েকটি বিষয় বিবেচনা করা হয়:
- প্রয়োজন (দারুরাহ বা হাজত)
- ফিতনার আশঙ্কা
- পর্দার পরিপূর্ণতা
- মাহরামের উপস্থিতি
গ) মোটামুটি সিদ্ধান্ত:
বালেগ (প্রাপ্তবয়স্ক) ছেলেকে পড়ানো মূলত নাজায়েজ, কারণ:
- ছেলেটি বালেগ (১০ম শ্রেণির ছাত্র সাধারণত ১৪-১৬ বছর বয়সী)
- তার সাথে নিয়মিত দেখা-সাক্ষাৎ ও কথা বলতে হবে
- ফিতনার আশঙ্কা বিদ্যমান
৩. পূর্ণ পর্দা ও মাহরামের উপস্থিতির শর্ত
আপনার উল্লেখিত শর্ত: ✓ বোরকা ✓ নিকাব (মুখ ঢাকা) ✓ হাত মোজা ✓ পা মোজা ✓ পিতা বা মাতার উপস্থিতি
হানাফি ফিকহের বিধান:
১. ফাতাওয়া উসমানী (২/৪১২) গ্রন্থে উল্লেখ আছে:
"নারী পুরুষকে পড়ানোর সময় যদি পর্দার পূর্ণ ব্যবস্থা থাকে (পুরো শরীর ঢাকা, মাহরাম উপস্থিত) এবং ফিতনার আশঙ্কা না থাকে, তাহলে প্রয়োজনবোধে জায়েজ হতে পারে। তবে সাধারণভাবে নারী-পুরুষের মেলামেশা থেকে বিরত থাকা উত্তম।"
২. ইমদাদুল ফাতাওয়া (২/২১৮)-এ আশরাফ আলী থানভী (রহ) বলেন:
"অপরিচিত পুরুষের সাথে নারীর কথা বলা বা পড়ানো যদি একান্ত প্রয়োজন হয় এবং পর্দার সম্পূর্ণ ব্যবস্থা থাকে ও মাহরাম উপস্থিত থাকে, তাহলে জায়েজ হতে পারে। কিন্তু তবুও ফিতনার আশঙ্কা থেকে নিরাপদ নয়।"
৩. ফাতাওয়া হিন্দিয়া (৫/৩২১)-এ উল্লেখ আছে:
"নারীদের জন্য অপরিচিত পুরুষদের শিক্ষাদান মাকরূহ, যদি না তীব্র প্রয়োজন হয় এবং পর্দার পূর্ণ ব্যবস্থা থাকে।"
৪. মেয়েকে পড়ানোর বিধান
মেয়ে (নারী) অন্য মেয়েকে পড়ানো সম্পূর্ণ জায়েজ এবং এতে কোনো সমস্যা নেই।
যদি পড়ানো মেয়েটির জন্য - তাহলে এটি জায়েজ। মুখ খোলা রেখেও পড়ানো যাবে, যদিও পর্দা করা উত্তম।
বিঃদ্রঃ আরবীতে "মুখ ডেকে পড়ানো" বলতে বোঝানো হয়েছে মুখ ঢেকে পড়ানো। এটি নারী-পুরুষ উভয়ের জন্যই জায়েজ।
চূড়ান্ত ফতোয়া/সিদ্ধান্ত
ছেলেকে পড়ানোর ক্ষেত্রে:
দৃঢ় মতামত: সাধারণত বালেগ ছেলেকে পড়ানো নাজায়েজ।
শর্তসাপেক্ষে জায়েজ হওয়ার সম্ভাবনা: আপনি যদি নিম্নলিখিত শর্তগুলো পূরণ করেন, তাহলে হানাফি ফিকহের আলোকে তা জায়েজ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে:
- পূর্ণ পর্দা: বোরকা, নিকাব (মুখ ঢাকা), হাত মোজা, পা মোজা পরতে হবে।
- মাহরামের উপস্থিতি: আপনার পিতা বা মাতা (অথবা অবিবাহিত হলে ভাই, অথবা অন্য কোনো মাহরাম) সবসময় উপস্থিত থাকতে হবে। তারা একই কক্ষে থাকবেন অথবা দরজা খোলা অবস্থায় পাশের কক্ষে থাকবেন যাতে যে কোনো সময় দেখতে পারেন।
- একান্ত প্রয়োজন: এটি যদি আপনার জীবিকার জন্য অত্যাবশ্যকীয় হয় অথবা ছেলেটির শিক্ষার জন্য জরুরি হয় এবং বিকল্প কোনো ব্যবস্থা না থাকে।
- ফিতনার নিরাপত্তা: কোনো প্রকার ফিতনার (যেমন- অনুচিত দৃষ্টি, কথাবার্তা, স্পর্শ) আশঙ্কা না থাকে।
বিশেষ বিবেচনা:
- যেহেতু ছেলেটি বালেগ, তাই তার সাথেও পর্দার বিধান প্রযোজ্য।
- কোনো অবস্থাতেই একান্তে (খালওয়াত) পড়ানো যাবে না।
- কেবল প্রয়োজনীয় কথাবার্তা বলা যাবে, অবশ্যকীয় নয় এমন কথা বলা যাবে না।
মেয়েকে পড়ানোর ক্ষেত্রে:
মেয়েকে পড়ানো সম্পূর্ণ জায়েজ। এতে পর্দার কঠোর শর্ত নেই, তবে শালীনতা বজায় রাখা জরুরি।
গুরুত্বপূর্ণ নসিহত
১. সতর্কতা আবশ্যক: পূর্ণ পর্দা ও মাহরাম উপস্থিত থাকলেও শয়তানের প্ররোচনা থেকে নিরাপদ থাকা কঠিন। তাই সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি।
২. নিয়ত পরিশুদ্ধ করুন: যদি পড়ান, তাহলে নিয়ত করুন যে এটি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য এবং দ্বীনি জ্ঞান দানের জন্য।
৩. বিকল্প ব্যবস্থা: সম্ভব হলে একজন মাহরাম মহিলার মাধ্যমে অথবা অন্য কোনো ব্যবস্থা করুন।
৪. দীর্ঘমেয়াদী নয়: এটিকে দীর্ঘমেয়াদী পেশা হিসেবে না নেওয়াই ভালো। অল্প সময়ের জন্য এবং প্রয়োজনীয় সময় পর্যন্ত সীমাবদ্ধ রাখুন।
সর্বোত্তম পন্থা: আপনার ইতস্তততা ও প্রত্যাখ্যান সঠিক ছিল। যেহেতু এটি ফিতনার কারণ হতে পারে, তাই আপনি সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তবে যদি তীব্র প্রয়োজন হয় এবং শর্ত পূরণ হয়, তাহলে জায়েজ হতে পারে।
উপসংহার: আল্লাহই সর্বজ্ঞ। আপনার জন্য উত্তম হলো সেই পথ গ্রহণ করা যা ফিতনা থেকে দূরে রাখে এবং দ্বীনের প্রতি আপনার দৃঢ়তা বজায় রাখে।
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ "যে আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য বের হওয়ার পথ বের করে দেন এবং তাকে এমন জায়গা থেকে রিজিক দেন যা সে কল্পনাও করতে পারে না।" (সূরা আত-তালাক: ২-৩)
তথ্যসূত্র
- কুরআন: সূরা আন-নূর (২৪:৩১), সূরা আল-আহযাব (৩৩:৫৯), সূরা আত-তালাক (৬৫:২-৩)
- হাদিস: সহীহ বুখারী (৫২৩২), সহীহ মুসলিম (২১৭২)
- ফিকহের কিতাব:
- রদ্দুল মুহতার (১/৪০৭)
- ফাতাওয়া শামী (৬/৩৭১)
- ফাতাওয়া হিন্দিয়া (৫/৩২১)
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (২/২১৫-২১৮)
- ফাতাওয়া উসমানী (২/৪১২)
- ইমামগণের মতামত: ইমাম আবু হানিফা, ইমাম আবু ইউসুফ, ইমাম মুহাম্মদ, ইবনে আবেদীন, আশরাফ আলী থানভী, মুফতি মুহাম্মদ শফী, মুফতি তাকী উসমানী