পাত্রের বর্তমান সামর্থ্যের বাইরে অধিক মোহর নির্ধারণ ও ভবিষ্যতে পরিশোধের নিয়তের বৈধতা ও দলিল।
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
Answer
প্রশ্নের উত্তর
بسم الله الرحمن الرحيم
الحمد لله رب العالمين والصلاة والسلام على سيد المرسلين
প্রশ্নকারী জানতে চেয়েছেন—পাত্রের বর্তমান সামর্থ্যের বাইরে অধিক মোহর নির্ধারণ করা যাবে কি না? এবং এর কোনো দৃষ্টান্ত সাহাবায়ে কেরাম বা পূর্ববর্তীদের মধ্যে আছে কি না? সাথে এও জানতে চেয়েছেন যে, ভবিষ্যতে পরিশোধের নিয়তে অধিক মোহরানা নির্ধারণ করা জায়েয কি না?
১. মোহরের সীমা ও বৈধতা
ইসলামী শরিয়তে মোহরের কোনো নির্ধারিত ন্যূনতম বা সর্বোচ্চ সীমা নেই। কুরআন ও হাদীসে কিছু নির্দিষ্ট পরিমাণের কথা বলা হয়নি বরং তা স্ত্রীর অধিকার ও স্বামীর আর্থিক সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে নির্ধারিত হয়। তবে কোনো নির্দিষ্ট পরিমাণ বেঁধে দেওয়া না থাকলেও উভয় পক্ষের সম্মতিক্রমে যেকোনো পরিমাণ মোহর ধার্য করা জায়েয।
ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর মতে মোহর সর্বনিম্ন দশ দিরহাম। আর সর্বোচ্চ কোনো সীমা নেই। ইচ্ছে করলে খুব বেশি পরিমাণও নির্ধারণ করা যায়, কিন্তু সেটি সুন্নতের পরিপন্থী না হয় তা নিশ্চিত করতে হবে। (আল-হিদায়া, ২/২৮৩; রদ্দুল মুহতার, ৪/১১৪)
২. বর্তমান সামর্থ্যের বাইরে মোহর নির্ধারণ
বর্তমান সামর্থ্যের বাইরে মোহর নির্ধারণ করা জায়েয। ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে মোহর স্ত্রীর প্রাপ্য অধিকার। স্বামী তা নগদ বা বাকি (বকেয়া) হিসেবে নির্ধারণ করতে পারে। আর বাকি মোহর স্বামীর ওপর ঋণের মতো স্থায়ী হয় এবং পরিশোধ করতে বাধ্য। ভবিষ্যতে পরিশোধের নিয়ত থাকলে তা নির্ধারণ করা বৈধ। এক্ষেত্রে কোনো নিষেধাজ্ঞা ইসলামী আইনে বিদ্যমান নেই।
হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম ঐ ব্যক্তি, যে উত্তম চরিত্রের এবং স্ত্রীকে বেশি মোহর দিতে উদার।"
(সুনানে বায়হাকী, ৭/২২৮; মিশকাতুল মাসাবীহ, ২/২৭২)
এটি প্রমাণ করে যে প্রয়োজন অনুসারে মোহর বেশি হওয়াও বৈধ।
৩. সাহাবায়ে কেরামের জীবনে দৃষ্টান্ত
(ক) হযরত ওমর (রা.)-এর বিবাহ ও মোহর
হযরত ওমর (রা.) উম্মে কুলসুম বিনতে আলী (রা.)-এর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। এই বিবাহে ৪০,০০০ (চল্লিশ হাজার) দিরহাম মোহর ধার্য করা হয়েছিল। এটি ছিল ঐ সময়ের তুলনায় অত্যন্ত বড় অঙ্ক। হযরত ওমর (রা.) এত টাকা নগদে দিতে সমর্থ ছিলেন না, তবে তিনি পরিশোধের প্রতিশ্রুতি দেন এবং পর্যায়ক্রমে পুরো টাকা পরিশোধ করেন। (আল-ইসতীআব ফী মা’রিফাতিল আসহাব, ৪/১৮৮৮)
(খ) হযরত আবদুর রহমান ইবন আউফ (রা.)-এর বিবাহ
তিনি ৪০,০০০ বা তারও বেশি দিরহাম মোহরে বিবাহ করেন। এটি তার সক্ষমতার বাইরে ছিল না, তবে এখানে বোঝা যায় যে সাহাবায়ে কেরামের মাঝে মোহর বেশি হওয়া ছিল এবং তা পর্যায়ক্রমে আদায় করা হতো। (মুসনাদে আহমদ, ৩/১৬১)
(গ) হযরত আলী (রা.) ও ফাতেমা (রা.)-এর বিবাহ
এ বিবাহে মোহর কম ছিল। কিন্তু এটি একটি বিশেষ অবস্থা। তাই সাহাবায়ে কেরামের মাঝে বেশি মোহর পরিশোধের জন্য স্থগিত করার প্রক্রিয়া প্রচলিত ছিল।
৪. মোহর মাফ করে দেওয়ার দৃষ্টান্ত
সাহাবায়ে কেরামের যুগে স্ত্রীগণ ইচ্ছা করলে তাদের মোহরের কিছু বা পুরো অংশ মাফ করে দিতে পারতেন। এটি ইসলামী আইনসম্মত। যেমন:
হযরত আয়েশা (রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"যদি কোনো স্ত্রী তার স্বামীকে নিজের মোহর দান করে (মাফ করে দেয়), তাহলে তা স্বামীর জন্য হালাল।"
(আবু দাউদ, ২/২৪২)
তবে বর্তমান সামর্থ্যের বাইরে মোহর নির্ধারণ করে স্ত্রী পরবর্তীতে মাফ করে দিয়েছেন—এমন উদাহরণ সরাসরি কোনো বর্ণনায় নেই। তবুও সাধারণ বিধান অনুযায়ী স্ত্রী ইচ্ছা করলে তা মাফ করতে পারেন। আর সাহাবীগণ মাফের আবেদনও করতেন (সহীহ বুখারী, হাদীস ৫১৩৭)।
৫. দলিল ভিত্তিক বিশ্লেষণ
কুরআন:
"আর তোমরা স্ত্রীদেরকে তাদের মোহর সন্তুষ্টচিত্তে দিয়ে দাও।"
(সূরা নিসা ৪:৪)
"আর যদি তারা দারিদ্র্যসীমায় জীবনযাপন করে তবে আল্লাহ তাদেরকে নিজ অনুগ্রহে স্বাবলম্বী করে দেবেন।"
(সূরা নূর ২৪:৩২)
এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, বর্তমানে স্বামী অভাবী হলেও বিয়ে করা উচিত। আর মোহর স্বামীর সক্ষমতা অনুযায়ী কম-বেশি হতে পারে। ভবিষ্যতে পরিশোধের নিয়ত করলে এবং স্ত্রী রাজি থাকলে তা জায়েয।
হাদীস:
"এক সাহাবী একটি লোহার আংটি দিয়ে মোহর দিতে রাজি হন, কিন্তু তাঁর কাছে তা-ও ছিল না। তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, তুমি যা কিছু কুরআন জানো, তা তাকে শিক্ষা দাও—সেটাই তার মোহর।"
(সহীহ বুখারী, হাদীস ৫১৩৫)
এটি প্রমাণ করে যে মোহর তৎক্ষণাৎ দিতে না পারলেও ভবিষ্যতের আয় বা অন্য কোনো বিনিময় হিসেবে তা নির্ধারণ করা যায়। আর তা যদি বর্তমান সক্ষমতার বাইরেও হয়, তবে নির্ধারণ করা জায়েয।
ফিকহী কিতাব:
রদ্দুল মুহতার (৪/১২৭) এবং ফাতাওয়া আলমগীরী (১/৩০১)-এ বলা হয়েছে:
"মোহর ধার্য করার পর স্বামী তাৎক্ষণিক পরিশোধ না করলেও অসুবিধা নেই। এটি স্বামীর ওপর ঋণ হিসেবে থেকে যায় এবং সময় পেলে তা পরিশোধ করতে হবে।"
ইমদাদুল ফাতাওয়া (২/৪০৫) এবং আপ কে মাসায়েল (৩/৬০৮)-এ বলা হয়েছে:
"পাত্রের বর্তমান সামর্থ্যের বাইরে অধিক মোহর নির্ধারণ করা জায়েয, যদি উভয় পক্ষ সম্মত হয় এবং স্বামী ভবিষ্যতে পরিশোধে সক্ষম হয়।"
৬. উপসংহার ও ফতোয়া
পাত্রের বর্তমান সামর্থ্যের বাইরে অধিক মোহর নির্ধারণ করা জায়েয। এর জন্য নিম্নোক্ত শর্তগুলো গুরুত্বপূর্ণ:
- স্ত্রীর স্পষ্ট সম্মতি থাকতে হবে—অর্থাৎ স্ত্রী জানবে যে মোহর বেশি এবং ভবিষ্যতে পরিশোধ হবে।
- সম্পূর্ণ মোহর পরিশোধের নিয়ত থাকতে হবে—ভবিষ্যতে পরিশোধ না করার নিয়ত বা প্রতারণা জায়েয নয়।
- মোহর নির্ধারণকালে তা নগদ বা বাকি পরিশোধের শর্ত স্পষ্ট করতে হবে—যাতে ভবিষ্যতে কোনো দ্বন্দ্ব সৃষ্টি না হয়।
দলিল: আল্লাহ বলেন, "হে মুমিনগণ! তোমরা একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভোগ করো না, তবে পারস্পরিক সম্মতিতে ব্যবসা বৈধ।" (সূরা নিসা ৪:২৯)
এবং হাদীসে এসেছে, "মুসলিমরা তাদের শর্তাবলী মেনে চলতে বাধ্য।" (সুনানে আবু দাউদ, ৩৫৯৪)
সুতরাং যদি স্বামী বর্তমানে সামর্থ্য না থাকলেও ভবিষ্যতে দেওয়ার নিয়তে অধিক মোহর নির্ধারণ করে এবং স্ত্রী তা জেনে রাজি হয়, তাহলে তা বৈধ ও জায়েয। এতে ইসলামী আইনের কোনো বাধা নেই।
সাহাবায়ে কেরামের জীবনে এর স্পষ্ট দৃষ্টান্ত:
- হযরত ওমর (রা.) মোহর ৪০,০০০ দিরহাম নির্ধারণ করেন, যা তিনি তৎক্ষণাৎ পরিশোধ করেননি বরং পরে পর্যায়ক্রমে পরিশোধ করেন। (মাকতালুল হুসাইন, ১/১০৫; আল-ইসতীয়াব, ৪/১৮৮৮)
৭. আপনার প্রশ্নের সরাসরি উত্তর
প্রশ্ন: পাত্রের বর্তমান সামর্থ্যের বাইরে অধিক মোহর নির্ধারণের কোনো নজির সাহাবায়ে কেরামের জীবনে আছে কিনা?
উত্তর: হ্যাঁ, আছে। যেমন হযরত ওমর (রা.)-এর বিবাহ ও মোহরের ঘটনা। তবে নির্দিষ্টভাবে বলা যায় না যে তিনি একেবারে অক্ষম অবস্থায় অধিক মোহর ধার্য করেছিলেন বরং তার আর্থিক অবস্থার তুলনায় বেশি ধার্য করেছিলেন। এগুলো দ্বারা বোঝা যায় যে মোহর বেশি হওয়া এবং তা পরিশোধ স্থগিত করা জায়েয।
প্রশ্ন: স্ত্রী মাফ করে দেওয়ার নজির রয়েছে কি?
উত্তর: যদিও নির্দিষ্টভাবে এমন বর্ণনা পাওয়া যায় না যে সাহাবী তার স্ত্রীকে বর্তমান সক্ষমতার বাইরে মোহর দিয়ে পরে স্ত্রী তা মাফ করে দিয়েছেন, তবে সাধারণ বিধান মাফের বৈধতা প্রমাণ করে। অনেক সাহাবী নিজের স্ত্রীদের মোহর মাফ করে দেওয়ার অনুরোধ করতেন এবং স্ত্রীগণ তা মাফ করে দিতেন (সহীহ বুখারী, হাদীস ২২৯১)।
প্রশ্ন: ভবিষ্যতে পরিশোধের নিয়তে বেশি মোহর নির্ধারণের দলিল কী?
উত্তর: দলিল নিম্নরূপ:
- কুরআনের সাধারণ নির্দেশ—মোহর স্বামীর ওপর স্ত্রীর অধিকার, তাৎক্ষণিক পরিশোধ আবশ্যক নয়।
- হাদীসে মোহর আদায় না করেও বিবাহ সম্পন্ন হওয়ার দৃষ্টান্ত।
- ফিকহী কিতাবে বাকি মোহর বৈধতার উল্লেখ (রদ্দুল মুহতার, ৪/১২৭)।
- ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর মতে মোহর বাকি রাখা জায়েয এবং তা ঋণের মতো স্থায়ী (আল-হিদায়া, ২/২৮৫)।
সর্বোপরি, পাত্রের বর্তমান সক্ষমতার বাইরে অধিক মোহর নির্ধারণ করা এবং ভবিষ্যতে পরিশোধের নিয়ত করা জায়েয ও বৈধ। তবে শরীয়তের দৃষ্টিতে মোহর মধ্যম পর্যায়ের হওয়া উত্তম এবং স্ত্রীর জন্য অহেতুক কষ্ট সৃষ্টি না করাই ভালো।
والله أعلم بالصواب